গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ জনগণের দেয়া রায়কে অসম্মান না করে তা মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, জনগণের রায়কে যারাই অপমান করেছে ইতিহাসে তাদের কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। দেরি হয়েছে, অসুবিধা নাই মেনে নেন। এই জনগণকে সম্মান দেখালে জনগণও আপনাদের ধারণ করবে, সম্মান দেখাবে। কিন্তু জনগণের মুখোমুখি হয়ে গেলে, শুধু দলীয়-গোষ্ঠী স্বার্থে যদি রায় অগ্রাহ্য করেন জনগণ অতীতেও কাউকে ছেড়ে কথা বলে নাই আগামীতেও ছেড়ে কথা বলবে না।
বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের মিরপুর অঞ্চল আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ তে ভোট দিতে বলেছিলেন, আমরাও বলেছি। নির্বাচনের পর এখন তারা বলেন- গণভোট অবৈধ। আরে ভাই, গণভোট যদি অবৈধ হয় তাহলে সংসদ নির্বাচনটা বৈধ হয় কিভাবে? গণভোট হারাম হলে সংসদ নির্বাচনও হারাম, আর সংসদ নির্বাচন হারাম হলে এখন এদেশে কোনো সরকার নাই। আগে যারা ছিল তারা পালিয়ে গেছে, আর এখন যারা আছেন তারা তাদের বক্তব্য অনুযায়ী বৈধ নয়। তাহলে দেশটার কি হবে?
তিনি বলেন, আমরা সংসদের ভিতরে লড়াই করে যাচ্ছি এবং বাইরেও লড়াই করে যাচ্ছি। আজকের এই আয়োজন সেই লড়াইয়ের অংশ। আমাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, জনগণের মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, ফ্যাসিবাদের শেষ চিহ্ন বাংলাদেশ থেকে বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত ইনশাল্লাহু আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
জুলাই গণহত্যার বিচার বিলম্ব প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, বিচার এখন দৃশ্যমান নয়, বিচার আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা সরকারি দল ও সরকারকে অনুরোধ করব, মেহেরবানি করে জুলাই কৃতজ্ঞতা আদায় করতে শিখুন। যাদের কারণে আজকের সংসদ, আজকের সরকার, আজকের বিরোধী দল, তাদেরকে অগ্রাহ্য অপমান করবেন না। তাদের আত্মা অভিশাপ দেবে এবং শহীদদের আত্মা যদি অভিশাপ দেয় কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না। অতএব বিচারটা করুন, বিচারের দিকে মনোযোগ দিন।
তিনি বলেন, আপনাদের তো বহু সহকর্মী খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে, ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছে, দফায় দফায় জেলে গিয়েছে। অন্তত নিজেদের কর্মীদের মুখের দিকে তাকাইয়া এবং গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের মুখের দিকে তাকাইয়া আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলি বিচারটা করুন।
তিনি বলেন, যে জাতি শহীদদের সম্মানিত করে, তার যোদ্ধাদেরকে সম্মানিত করে, সেই জাতিকে আল্লাহও সম্মানিত করেন। আর যে জাতি সম্মান করতে জানে না আল্লাহ তাদের অপদস্থ করেন। আমরা কারো কারণে অপদস্থ হতে চাই না, আমরা আল্লাহ তায়ালার রহমত ভিক্ষা চাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শহীদদের শুধু বিচার করলে হবে না, তাদের সোনার অক্ষরে স্মরণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাঠ্য পুস্তক-ইতিহাস সব জায়গায় সম্মানের সঙ্গে তাদের যথাযথ অবদান তুলে ধরতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্মানে তাদেরকে ভূষিত করতে হবে, খেতাবে তাদেরকে ভূষিত করতে হবে।
তিনি বলেন, যারা আহত পঙ্গ হয়েছে তারা জীবন্ত শহীদ, চোখ নাই হাত নাই পা নাই, শরীরের ভিতরে অসংখ্য পিলেট-বুলেট, কারো ঘাড়ে, কারো পিঠে, কারো মেরুদণ্ডে, কারো হাতে, কারো পায়ে। রাত্রে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। অকেজো হয়ে গিয়েছে, রুজি রোজগার করতে পারে না, তাদের যথাযথ তালিকা তৈরি করে সম্মান দেখাতে হবে। সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের চিকিৎসার জন্য সরকারকে এককভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।
তিনি নিজ নির্বাচনি এলাকার যারা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাদের নামে মিরপুরের বিভিন্ন স্থাপনা ও সড়কের নামকরণ করার প্রস্তাব করেন।
এছাড়া মিরপুর এলাকার বিভিন্ন সমস্যা ও মানুষের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে এসব সমস্যার সমাধানে তার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথা জানান। একইসঙ্গে তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানের প্রধান দায়িত্ব সরকারের। তারা সেই দায়িত্ব পালন করলে তাতে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াত আমির।
জনসভায় সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার কোনো ইতিহাস দেশে নাই। এই রায় না মানলে বিএনপিকে বড় খেসারত দিতে হবে। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মত ইচ্ছামতো সংশোধন দেশের মানুষ মেনে নেবে না। এটা জুলাই সংস্কার হবে না। জুলাইয়ের চেতনা অনুযায়ী আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানুষ জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আছে।
ঢাকায় নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে সেলিম উদ্দিন আরো বলেন, ময়লা, দুর্গন্ধ, মাদক, নিরাপত্তাহীনতা, রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থা নিয়ে নগরবাসী খুব কষ্টের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। সিটি করপোরেশনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। তিনি অবিলম্বে সিটি করপোরেশনে নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে জনদুর্ভোগ লাঘব ও উন্নয়নের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেম আরমান সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, সময় থাকতে জনগণের রায় মেনে নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক ডেকে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন। নইলে সরকারকে অনেক মূল্য দিতে হবে।
জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ড. মাহফুজুর রহমান ও ইয়াছিন আরাফাত, প্রচার সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।
জনসভা শেষে একইস্থানে জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিমূলক নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

