অতীতের বিভিন্ন গণ-আন্দোলনের অর্জনের ন্যায় চব্বিশটাকেও হারিয়ে দেওয়ার কসরত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি আল্লাহর কসম করে বলেন, জীবন দেব কিন্তু চব্বিশকে হারিয়ে যেতে দেব না।
তিনি বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিউটশন মিলনায়তনে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে
শহীদ আবু সাঈদ সহ সব শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জামায়াত আমির বলেন, এ জাতি ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জীবন দিয়ে লড়াই করে কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই, চব্বিশ-এগুলো আমাদের গর্বের ঠিকানা, ইতিহাসের সোনারী অধ্যায়। কিন্তু প্রতিবারই সাধারণ জনগণ, তরুণ-যুব সমাজ, শ্রমিকরা জীবন দিয়ে এই অর্জন যখন জাতির হাতে তুলে দয়ে, তখন কিছু লুটেরার হাতে এটা হারিয়ে যায়। চব্বিশটাকেও শেষ পর্যন্ত হারিয়ে দেওয়ার কসরত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কি বাকি আছে, এই জাতিতো জীবন দিতে দিতেই এই পর্যায়ে এসেছে। শহীদদের কাছে আমাদের কি জবাব? যারা ভাঙ্গা হাত-পা নিয়ে কষ্টে ঘুমাতে পারেন না, তাদের জবাদ দেব?
তিনি বলেন, বর্তমান সংসদকে চব্বিশের ফসল বলে সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলতে চান চব্বিশ তেমন কিছু না, এর আগের অংশটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো বলছি না- আগের অংশ গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ সেই অংশেই তো আমরা আমাদের মাথার তাজ ১১ জন নেতাকে হারিয়েছি। ঠিক সেই অংশেই তো আমাদের শত শত সহকর্মীকে হারিয়েছি, আমাদের ভাই-বোনেরা আয়নাঘরের সঙ্গী হয়েছে, লাখো লাখো মানুষ কারাগারে গিয়েছে, চাকরি হারিয়েছে, বাড়িঘরে ঘুমাতে পারেনি।
তিনি বলেন, আমরা তো সেই অংশ অস্বীকার করছি না। কিন্তু এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, আমাদের এত আন্দোলন এবং প্রতিরোধ তখন কিছুই কার্যকর হয় নাই। সেটা কার্যকর রূপ পেয়েছে চব্বিশে। এই চব্বিশকে স্বীকার করতে এত হীনম্মন্যতা কেন? এই চব্বিশ না হলে আজকে আমি এখানে বক্তৃতা দিতে পারতাম না, আজকে বিরোধী দল হতে পারতাম না, বিরোধী দলের নেতা হতে পারতাম না, এমপি নির্বাচিত হতে পারতাম না, পার্লামেন্টের মুখ দেখতে পারতাম না। অনুরূপভাবে তারেক সাহেব প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা সবসময় বলে আসছি, আসেন আসনে এগিয়ে যান। যেই অঙ্গীকার নিয়ে চব্বিশ হয়েছে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন বড় কিছু নয়। এই যুবকেরা চেয়েছিল একটা বৈষম্যহীন সমাজ, চেয়েছিল সবার অধিকার নিশ্চিত হোক। তারা চেয়েছিল বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি দূর হোক, তারা চেয়েছিল চাদাবাজদের কবলে পড়ে জাতির যে নাজেহাল অবস্থা এখান থেকে জাতি মুক্তি পাক। তারা চেয়েছিল আদালতে গেলে মানুষ যেন ন্যায়বিচার পায়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল- ফ্যাসিবাদ যাতে বাংলাদেশে আর ফিরে না আসে। এইজন্য সংস্কার সাধন এবং একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা; অতীতের পচা রাজনীতিকে বিদায় জানানো এবং নতুন রাজনীতিকে আলিঙ্গন করা; মানুষকে আশাবাদী করে তোলা- এই জন্যই হয়েছিল গণভোট। সেই গণভোটের ব্যাপারে বলা হয় এটা তো সংবিধানে নাই। আপনারা বুঝাতে চান যে, জ্ঞান বুদ্ধি শুধু আপনাদের আছে, এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের নাই? এত মানুষকে আপনারা অপমান করছেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে তারাও বললেন আমরাও বললাম, সবাই গণভোটে 'হ্যাঁ' বলল। জনগণ ৭০ ভাগের মত 'হ্যাঁ' বলল। এখন তারা বলছেন যে ৫১ শতাংশ মানুষ আমাদেরকে রায় দিয়ে পাঠিয়েছে আমরা এটা মানবো না। ৫১ বড় না ৭০ বড়? আপনাদের দাবি যদি মেনেও নেই, কিভাবে ভোট পেয়েছেন সে বিতর্ক থেকে গেল। সাড়ে তিন ঘণ্টা ব্ল্যাকআউট করে কী করা হয়েছে জনগণ বুঝে। ইতিহাস অবশ্যই এটাকে পর্যালোচনা করবে ইনশাআল্লাহ এবং যার যার পাওনা সবাই সময় মত পেয়েও যাবেন ইনশাল্লাহ।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি নামে কোন কমিটি কোন বিধিতে, কোন সংবিধানে আছে কিনা, যদি না থাকে তো এটা কেন? এটা হচ্ছে জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়া, এটা হচ্ছে গণভোটকে ভুলিয়ে দেওয়া। আমরা পরিষ্কার প্রতিবাদ করে ওয়াক আউট করেছি। আপনারা জনগণের রায়কে অপমান করতে চান করেন, জনগণ সেটা বিচার করবে। আমরা জনগণের সঙ্গে আছি, তাদের রায়ের পক্ষে আছি এবং লড়াই চালিয়ে যাব।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে অনেকে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। আমরাই একমাত্র দল যাদেরকে তারা পছন্দ করে না। তারা বলেছে, বাংলাদেশের সব দলকে ভারতের মাটিতে আমন্ত্রণ, শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীকে লাল কার্ড। আমরা এই লাল কার্ডে গর্বিত। আমরা ভারতের বুকে আশ্রয় নেওয়ার কোনদিন চিন্তাও করি না। এ দেশ আমাদের দেশ, আমাদের আশ্রয়ের জায়গা, ১৮ কোটি মানুষের অন্তর। ইনশাআল্লাহ আমরা তাদের হৃদয়ে আশ্রয় নিতে চাই এবং আমাদের হৃদয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করতে চাই।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী তাদের সঙ্গে আমরা সৎ প্রতিবেশীর আচরণ করতে চাই এবং তারাও আমাদের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশী আচরণ করবে ওটাও দেখতে চাই। এর ভিন্ন কোনো সম্পর্ক কারো সাথেই আমাদের থাকবে না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন। এ দেশ কারো ডিক্টেশনে চলুক এটা আমরা চাই না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শহীদ পরিবারগুলোর নিরাপত্তা আমাদের নিরাপত্তা। আমরা ভয় পাই না, ভয় পাই শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে। আর কাউকে কোনো পাত্তা দেই না, পাত্তা দিবও না ইনশাআল্লাহ। আহতদের জন্য বড় দুঃখ হয়। রাষ্ট্র যদি তাদের বিষয়গুলো সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে না দেখে, তাহলে এই রাষ্ট্র হবে অভিশপ্ত রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্র হবে অকৃতজ্ঞ রাষ্ট্র, নিমকহারাম রাষ্ট্র।
তিনি বলেন, আমরা ইনশাআল্লাহ জীবন থাকতে কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না, সে যত বড় শক্তিই হোক। বাংলাদেশ ভয়কে জয় করেই এখানে এসে উপনীত হয়েছে। আমরা দাবি করছি, শহীদদের এবং আহত যোদ্ধাদের নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন সড়ক এবং স্থাপনার নামকরণ করা হোক। যত তাড়াতাড়ি এটা করা হবে আমরা ধরে নেব সরকার তত বেশি তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ন্যায্য দাবিগুলো অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সংসদের ভিতরে আমাদের লড়াই চলবে ইনশাল্লাহ।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপির সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন-লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন, সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন, জয়নুল আবেদীন এমপি, রাশেদুল ইসলাম এমপি, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত জুলাইযোদ্ধা প্রতিনিধি এবং জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

