জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিপুল সংখ্যক আসামি, বিশাল ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার, ভিডিও ফুটেজ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং প্রত্যেকের পৃথক ভূমিকা যাচাই—সব মিলিয়ে তদন্ত কার্যক্রমকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে নয়; ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ মিলিয়ে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জুলাই-সংশ্লিষ্ট মামলার অগ্রগতি তুলে ধরতে গিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বর্তমানে জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত ৫৯টি মামলা ডিবি তদন্ত করছে। প্রতিটি মামলায় আসামির সংখ্যা অনেক হওয়ায় তদন্ত স্বাভাবিকভাবেই সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, কে কোথায় অবস্থান করেছিলেন, কার বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে—এসব বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপাত্ত মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ডিবি প্রধান জানান, জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০ জিবি ডিজিটাল তথ্য তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে রয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার ধারাবাহিকতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান এবং প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নির্ধারণের কাজ চলছে। তদন্তে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া না করে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন ভুলভাবে অভিযুক্ত না হন, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভুয়া বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, জুলাই-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এগুলোর ওপর একাধিক পর্যায়ে নজরদারি রয়েছে। ডিএমপিতে একটি মনিটরিং সেল নিয়মিত মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে। প্রায় প্রতি ১৫ দিন পরপর তদন্তের অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি পুলিশ সদরদপ্তরেও পৃথক মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, যদি কেউ ভিন্ন উদ্দেশ্যে বা অসৎ অভিপ্রায়ে মামলা করে থাকেন, তবে সেটি তদন্তে উঠে আসবে এবং এমন অভিযোগকে কোনোভাবেই সমর্থন করা হবে না। তদন্ত শেষে শুধুমাত্র যাদের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
তদন্তের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং অসংখ্য আসামির পৃথক ভূমিকা নির্ধারণ করা। বিভিন্ন ঘটনায় আসামির তালিকা, অভিযোগের ধরন এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ায় প্রতিটি মামলাই আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয় তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের ভিডিও, স্থিরচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কনটেন্ট, কল রেকর্ড, অবস্থানসংক্রান্ত প্রযুক্তিগত তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া তা তদন্তের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত এসব মামলার তদন্তে প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ সংগ্রহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, বড় পরিসরের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণকারীদের আলাদা করা এবং প্রত্যেকের দায় নির্ধারণে ডিজিটাল তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বহুল আলোচিত মামলাগুলোর তদন্তে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই তদন্তের প্রতিটি ধাপ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সম্পন্ন হলে বিচারিক প্রক্রিয়াও আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে রক্ষা করা—উভয় লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব হবে।
ডিবি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ চলবে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সাক্ষ্য, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষাও সম্পন্ন করা হবে। তদন্তের প্রতিটি ধাপ আইনের বিধান অনুসরণ করেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

