কৃষক লীগ নেতার নেতৃত্বে সিন্ডিকেট

হবিগঞ্জ সীমান্তে ভারতীয় জিরার জমজমাট বাণিজ্য

হবিগঞ্জ সীমান্তে ভারতীয় জিরার জমজমাট বাণিজ্য

হবিগঞ্জ সীমান্তপথে আসা ভারতীয় চোরাইপণ্যের ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে স্থানীয় এক কৃষক লীগ নেতার নেতৃত্বে এ সিন্ডিকেটের তৎপরতা জোরদার হয়ে উঠেছে। এ চক্রের তৎপরতায় হবিগঞ্জ সীমান্তে এখন জিরাবাণিজ্য জমজমাট হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, হবিগঞ্জ সীমান্তপথে চোরাইপণ্য হিসেবে অবাধে আসছে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় জিরা ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকের পর জিরা সিন্ডিকেটচক্র তা নিজেদের দখলে নিতে তৎপর হয়ে উঠে। এ সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জব্দ করা জিরা তাদের জিম্মায় নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। জব্দ পণ্যের প্রকৃত মালিক না হয়েও ভুয়া এলসি, ভাউচার, নিলামের কাগজ, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথি ব্যবহার করে ‘বৈধ মালিক’ সেজে আদালত থেকে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জিরা জিম্মায় নিয়েছে চক্রটি। সংঘবদ্ধ এ চক্রটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন হবিগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের নেতা সুলতান মাহমুদ আরজু নামের এক ব্যক্তি।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতীয় অবৈধ পণ্য হবিগঞ্জ জেলায় আটকের পর মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চক্রটির সদস্যরা জিম্মায় নিতে শুরু করেন তোড়জোড়। অভিযোগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা মামলা হওয়া মাত্রই মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য সিন্ডিকেটের সদস্যদের হাতে তুলে দেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সুলতানের ভাই আব্দুল হাসান রাজুর মাধ্যমে চক্রের সদস্যরা এলসি, নিলাম-সংক্রান্ত কাগজ, ভাউচার, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথি তৈরি করে জব্দ পণ্যের মালিকানা দাবি করে আদালতে জিম্মার আবেদন করেন। নিম্ন আদালতে আবেদন নামঞ্জুর করার পর উচ্চ আদালত থেকে নিয়ে আসা হয় আদেশ। সেই আদেশের বলে নিজেদের জিম্মায় নেয় প্রতারকচক্র অথচ জিম্মায় নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা প্রায় সব ডকুমেন্টসই থাকে ভুয়া, একই কাগজ ব্যবহার করা হয় একাধিকবার।

অন্তত ২০টি জিম্মা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় এ ধরনের একাধিক ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নথির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জব্দ পণ্যের মূল্য হিসাব করলে গত দুই বছরে অন্তত ২০ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য জিম্মায় নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় জিরা দেশে প্রবেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চালান জব্দ ও মামলা হলে শুরু হয় কথিত ‘মালিকানা প্রতিষ্ঠার’ প্রক্রিয়া। জব্দ হওয়ার সময় যারা আটক বা মালিকানা দাবি করেন কিংবা চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউই আদালতে যান না, তাদের পরিবর্তে সুলতান চক্রের সদস্যরা আদালতে এসে জব্দ পণ্যের মালিকানা দাবি করেন। এ সময় তারা আদালতে জমা দেন আমদানি বা নিলামের বিভিন্ন কাগজপত্র। এসব নথির মধ্যে রয়েছে এলসি, ভাউচার, নিলামের কাগজ, ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কাগজপত্র যা সিলেটের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সংগ্রহ করে কারসাজি করেন সুলতান মাহমুদ আরজু ও তার ভাই আব্দুল হাসান রাজু।

গত ৩০ জুলাই হবিগঞ্জের মাধবপুর থানায় আটক হওয়া ছয় হাজার কেজি জিরা জিম্মায় নেন সুজন মিয়া নামে এক ব্যক্তি। যার মূল্য ৪২ লাখ টাকা অথচ সুজন শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার স্কয়ার কোম্পানিতে ১২ হাজার টাকা বেতনে শ্রমিকের কাজ করেন। মেসার্স মদিনা স্টোর নামে যে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে তিনি জিরা নিয়েছেন সেই প্রতিষ্ঠানের নেই কোনো অস্তিত্ব। সুজন দাবি করেন, তিনি সরকারকে কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করছেন। এক পর্যায়ে অবশ্য স্বীকারও করেন তার কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য সাদেক তালুকদার জানান, সুজন নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, সে স্কয়ার কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করার পাশাপাশি এলাকায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করে। তার কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কখনোই ছিল না বলে জানান তিনি।

ছয় হাজার ৬০০ কেজি জিরা জিম্মায় নেওয়া যুবলীগ নেতা মুক্তার হোসেন এলাকায় দাদন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। হবিগঞ্জ জেলা কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান সেলিমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে দাদন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। প্রতিষ্ঠান এবং ভ্যাট-ট্যাক্স সনদ না থাকলেও শুধু ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে জিম্মায় নিয়েছেন ৪৬ লাখ টাকার জিরা।

অন্যদিকে কৃষক লীগ নেতা মোতাব্বির হোসেন কাজল বৈষম্যবিরোধী মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে বর্তমানে জামিনে আছেন। গত ৩ মার্চ জেলা ডিবি পুলিশের কাছ থেকে অস্তিত্বহীন হুর ট্রেডার্সের অনুকূলে তিন হাজার ৬০০ কেজি জিরা জিম্মায় নিতে তিনি ব্যবহার করেছেন ভুয়া এনআইডি। তার প্রকৃত এনআইডিতে নাম কাজল মিয়া হলেও আদালতের নথিপত্রে মোতাব্বির হোসেন ব্যবহার করা হয়েছে। সেই জিরার জিম্মানামার সাক্ষী ও উচ্চ আদালতে তদবিরকারক ছিলেন চক্রের অন্যতম হোতা আব্দুল হাসান রাজু। এই রাজু ভুয়া নথি সৃজন, জিম্মার আবেদন, নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত কার্যক্রম তদারকি ও তদবিরের দায়িত্বে রয়েছেন। নিজেকে শিক্ষানবিশ আইনজীবী পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়ান আদালতপাড়ায়।

যদিও রাজুর দাবি, তিনি সরকারকে বছরে কোটি কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে পণ্য আমদানি করেন। তবে তার নামে টিন না থাকলেও ফরিদ এন্টারপ্রাইজ নামে তাদের পারিবারিক মুদি মালের একটি দোকান ছিল, দুবছর ধরে সেটিও বন্ধ রয়েছে।

এদিকে মোতাব্বির হোসেন কাজল নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তার কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। তার দাবি, কৃষক লীগ নেতা সুলতান মাহমুদ আরজুর হয়ে তিনি ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের জিরা জিম্মায় নিয়েছেন। এর বাইরে অন্তত এক ডজন ব্যক্তি এ চক্রের হয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতারণা করে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য।

অভিযোগের বিষয়ে কৃষক লীগ নেতা ও চক্রের মূল হোতা সুলতান মাহমুদ আরজু দাবি করেন, তিনি সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে এসব ভারতীয় পণ্য ক্রয় করেন।

এসব পণ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে জিম্মায় নেন। এ সময় তিনি মোতাব্বির হোসেন কাজলের মাধ্যমে তিন হাজার ৬০০ কেজি জিরা জিম্মায় নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। বৈধ ব্যবসায়ী হিসেবে যদি নিজেই পণ্য ক্রয় করে থাকেন, তাহলে নিজের নামে সরাসরি জিম্মায় না নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে জব্দ পণ্য জিম্মায় নেওয়ার প্রয়োজন কেন হলো? এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে উচ্চ আদালত থেকে চোরাচালানি পণ্য জিম্মায় নেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির বলেন, আমাদের কাগজপত্র যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। সম্প্রতি জাল কাগজ দিয়ে একটি ব্লাংকেটের চালান জিম্মায় নেওয়ার বিষয়ে আমরা আপিল বিভাগে আবেদন করি, আদালত সেটি স্থগিত করেন।

একই বিষয়ে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, বিষয়টি এই মাত্র অবগত হয়েছি। আমরা আদালতের নির্দেশ মোতাবেক পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন