কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপিদের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির দাবি জানিয়েছেন। এটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা।
বুধবার (২২ এপ্রিল) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এমপিদের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তাসনিম জারা লেখেন—
এক.
শিক্ষকেরা দিনের পর দিন রাস্তায় বসে থাকেন তাদের ন্যায্য বেতনের দাবিতে। ডাক্তাররা কর্মবিরতিতে যান। নার্সরা আন্দোলন করেন। সরকারি কর্মচারীরা বছরের পর বছর পে-স্কেল সংশোধনের অপেক্ষায়। কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পান না। ছোট ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছেন। দেশ একসঙ্গে কয়েকটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আর এই বাস্তবতায় এমপিরা সংসদে আলোচনায় বসছেন, নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। দাবি উঠলে প্রধানমন্ত্রী তা বিবেচনা করবেন বলে সঙ্গে সঙ্গেই আশ্বাস আসছে। এই এক প্রসঙ্গে সরকার আর বিরোধী দল একমত, হাসিমুখে একই সুরে কথা বলছেন, দ্রুত সমাধানের কথা বলছেন। জনগণের সমস্যায় যে দ্রুততা আর ঐক্য দেখা যায় না, সেটা এখানে তৎক্ষণাৎ হাজির।
এমপিরা সংসদে গিয়েছেন জনগণের সমস্যার সমাধান করতে। নিজেদের প্রাপ্তির হিসাব কষতে না। একজন শিক্ষক যখন ছয় মাস আন্দোলন করেও কোনো সাড়া পান না, আর এমপিরা নিজেদের অফিস, গাড়ির ব্যাপারে কয়েক দিনেই সিদ্ধান্ত টেনে আনতে পারেন, তখন জনগণ বুঝে যায়, এই ব্যবস্থায় কার সুযোগ-সুবিধা আসলে গুরুত্বপূর্ণ।
দুই.
এমপিদের বেতন, ভাতা, সুযোগ-সুবিধা এমপিরা নিজেরা ঠিক করবেন, এটা নীতিগতভাবেই ভুল।
কেন ভুল? পৃথিবীর কোনো পেশায় মানুষ নিজের বেতন নিজে ঠিক করে না। কারণ এটা স্বার্থের সরাসরি সংঘাত। একজন ডাক্তারের বেতন ঠিক করে হাসপাতাল বা সরকার। একজন শিক্ষকের বেতন ঠিক করে শিক্ষা বোর্ড। একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতন ঠিক করে পে কমিশন। এমনকি একটা কোম্পানির সিইওর বেতনও ঠিক করে বোর্ড, তিনি নিজে নন।
এমপিদের বেতন-ভাতা-সুবিধা আসছে জনগণের করের টাকা থেকে। সেই টাকার পরিমাণ তারা নিজেরাই ঠিক করবেন, এটা নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য। এমপিরা জনগণের সেবক। সেবকের বেতন সেবক নিজে ঠিক করেন না, ঠিক করেন যারা তাকে নিয়োগ দিয়েছেন, অথবা তাদের পক্ষে একটা নিরপেক্ষ কাঠামো।
তিন.
তাহলে সমাধান কী?
একটা স্বাধীন কমিটি গঠন করুন, যারা এমপিদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করবে।
এই কমিটি কী করবে? প্রথমত, অন্যান্য পেশার সঙ্গে তুলনা করে দেখবে। একজন এমপির দায়িত্ব কী, সময় কতটুকু দিতে হয়, ঝুঁকি কেমন, যোগ্যতা কী লাগে। এগুলো বিবেচনা করে দেখবে তার প্রাপ্য আসলে কতটুকু হওয়া উচিত। একজন জেলা জজ, একজন সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন হাসপাতালের কনসালট্যান্ট। এদের সঙ্গে তুলনা করে একটা যৌক্তিক অবস্থান বের করা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, কমিটি দেখবে সুযোগ-সুবিধাগুলো আজকের বাস্তবতায় প্রাসঙ্গিক কিনা। অনেক ভাতা বা সুবিধা হয়তো কোনো এক সময়ে যুক্তিসঙ্গত ছিল, কিন্তু আজকের দিনে তার আর কোনো ভিত্তি নেই। আবার কিছু নতুন চাহিদা হয়তো তৈরি হয়েছে, যেগুলো এখনো স্বীকৃত হয়নি।
এই কমিটির কাজ শুধু সুধিবা বাড়ানো বা শুধু সুবিধা কাটছাঁট করা না। হতে পারে কিছু ক্ষেত্রে এমপিদের প্রাপ্যতা আসলেই অপ্রতুল। একজন প্রত্যন্ত এলাকার এমপিকে যে পরিমাণ যাতায়াত করতে হয়, যে পরিমাণ মানুষের সাথে দেখা করতে হয়, সেই হিসেবে তাঁর সহায়তা তহবিল বা অফিস সুবিধা হয়তো বাড়ানো দরকার। আবার কিছু সুবিধা, যেমন শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি, হয়তো আজকের দিনে যৌক্তিকতা হারিয়েছে। সেগুলো ছাঁটাই হোক।
মোদ্দা কথা, কোনটা বাড়বে কোনটা কমবে, সেটা নিরপেক্ষ বিচারে ঠিক হোক। এমপিরা নিজেরা এই সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেবে স্বাধীন কমিটি।
এই কমিটিতে কারা থাকবেন সেটা আলাদা আলোচনার বিষয়, এবং সেই আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে মূল নীতি হচ্ছে বিচারক, অর্থনীতিবিদ, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ, সুশাসন সংস্থার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও থাকতে হবে। একজন সরকারি স্কুলশিক্ষক, একজন নার্স, একজন ছোট ব্যবসায়ী থাকতে পারেন। কারণ এমপিদের সুযোগ-সুবিধা শেষ পর্যন্ত একটা অনুপাতের প্রশ্ন। সাধারণ বাংলাদেশির জীবনমানের সাথে তাঁদের প্রাপ্যতার অনুপাত। সেই অনুপাত বোঝার জন্য টেবিলে এমন মানুষ দরকার, যাঁরা সেই জীবনটা যাপন করেন।
এমপিরা নিজেরাই এই প্রস্তাব দিন। এটা আপনাদের মর্যাদার প্রশ্ন। জাতির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বেতন নিজে ঠিক করা একটা অস্বস্তিকর বিষয়। যেটা থেকে বের হয়ে আসা আপনাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজন।
এমবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

