মতপার্থক্য ও ভিন্নমতের আদব

মতপার্থক্য ও ভিন্নমতের আদব

মানুষের চিন্তা, উপলব্ধি ও বিচারশক্তির ভিন্নতার কারণে মতের পার্থক্য হওয়া একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি; বরং এর জন্য একটি সুন্দর নীতিমালা ও শিষ্টাচার নির্ধারণ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন এবং পরবর্তী যুগের মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যেও বহু বিষয়ে মতভেদ ছিল। কিন্তু সেই মতভেদ কখনো তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও ভ্রাতৃত্বকে বিনষ্ট করেনি। আজকের দিনে যখন সামান্য মতপার্থক্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা জনপরিসরে তীব্র বিতর্ক, বিদ্বেষ ও বিভক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন ইসলামের শেখানো মতভেদের আদব নতুন করে স্মরণ করা জরুরি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩) এই আয়াত আমাদের শেখায়, উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা একটি মৌলিক দায়িত্ব। তবে ঐক্য মানে সব বিষয়ে একই মত পোষণ করা নয়। বরং কোরআন-সুন্নাহর মৌলিক নীতির ওপর ঐক্যবদ্ধ থেকে ইজতিহাদি বিষয়ে মতভেদকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করাই ইসলামের শিক্ষা।

বিজ্ঞাপন

মতভিন্নতা স্বাভাবিক বিষয়

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই আমরা মতভেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। বনু কুরাইজার অভিযানের সময় তিনি সাহাবাদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বনু কুরাইজায় পৌঁছানোর আগে আসরের সালাত আদায় না করে।’ একদল সাহাবি নির্দেশের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করে গন্তব্যে পৌঁছে সালাত আদায় করেন। অন্য দল বুঝেছিলেন, রাসুল (সা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত পৌঁছানো; তাই তারা পথেই সময়মতো সালাত আদায় করেন। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি কোনো পক্ষকেই দোষারোপ করেননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তরিক ইজতিহাদের ভিত্তিতে মতভেদ হলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

চার মাজহাবের ইমামদের জীবনও মতভেদের আদবের উজ্জ্বল উদাহরণ অনেক। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.) বহু মাসআলায় ভিন্নমত পোষণ করেছেন। কিন্তু তারা কখনো একে অন্যকে অপমান করেননি বা শত্রু মনে করেননি। বরং তারা পরস্পরের জ্ঞান, তাকওয়া ও আন্তরিকতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি হলো, ‘আমার মত সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে ভুলও হতে পারে; আর অন্যের মত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে সঠিকও হতে পারে।’ এই বক্তব্য একজন আলিমের বিনয়, উদারতা ও সত্যের প্রতি নিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত।

সুন্দর ভাষা ও উত্তম আচরণ

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা আল-বাকারা : ৮৩) মতভেদ থাকলেও কটূক্তি, বিদ্রুপ, অপবাদ বা গালাগাল একজন মুসলিমের চরিত্র হতে পারে না। ইসলামে যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তিগত আক্রমণ দিয়ে নয়।

সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা

কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে মতভেদ থাকলেও তাদের প্রতি সুবিচার করতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা আল-মায়িদা : ৮) তাই প্রতিপক্ষের বক্তব্য বিকৃত করা, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অযথা সন্দেহ করা বা ভালো দিকগুলো গোপন করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

ইলম ও দলিলের অনুসরণ

কোরআন-সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলিমদের ব্যাখ্যার আলোকে মতপ্রকাশ করতে হবে। অল্প জ্ঞান নিয়ে শরয়ি বিষয়ে মন্তব্য করা বা অন্যকে পথভ্রষ্ট বলে ঘোষণা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া মতামত প্রচার করা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, ইসলামের মৌলিক আকিদা ও ফরজ বিধান এক বিষয় আর ইজতিহাদি ফিকহি মতপার্থক্য আরেক বিষয়। এ দুটিকে এক করে দেখলে অযথা বিভেদ সৃষ্টি হয়। 

বর্তমান বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ব। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন বিদ্বেষ, অপবাদ বা বিভক্তির কারণ না হয়। বরং তা যেন জ্ঞানের বিকাশ, সত্যের অনুসন্ধান এবং পারস্পরিক শিক্ষালাভের মাধ্যম হয়।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মতপার্থক্য যদি কোরআন-সুন্নাহর সীমার মধ্য থেকে আদব, ন্যায়বোধ ও তাকওয়ার সঙ্গে পরিচালিত হয়, তবে তা দুর্বলতার নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির পরিচয়। তাই ব্যক্তি বা দলের অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং দলিলের প্রতি আনুগত্য, বিনয়, সহনশীলতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে মতভেদ পরিচালনা করাই একজন সচেতন মুসলিমের কর্তব্য। এ পথেই উম্মাহর ঐক্য সুদৃঢ় হবে এবং ইসলামের সৌন্দর্য আরো উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন