প্রযুক্তির যুগে ইসলাম প্রচারে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

প্রযুক্তির যুগে ইসলাম প্রচারে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

মদীনার এক অন্ধকার রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি চিঠি লিখিয়েছিলেন, যা উটের পিঠে চড়ে মাসের পর মাস পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিল পারস্যের রাজদরবারে কিংবা রোমের সীমান্তে। সেই চিঠির একটি বাক্যই ছিল গোটা একটি সাম্রাজ্যের বিশ্বাস কাঠামো নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজ সেই একই বার্তা এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে পৌঁছে যেতে পারে পৃথিবীর প্রান্তে থাকা কোটি মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্ক্রিনে। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু দায়িত্ব বদলায়নি; বরং সেই দায়িত্বের পরিধি হয়ে উঠেছে আরো বিশাল, আরো জটিল।

বিজ্ঞাপন

দাওয়াহ ইসলামের কোনো ঐচ্ছিক কার্যক্রম নয়, এটি দ্বীনের হৃৎপিণ্ড। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো।' (সূরা আলে ইমরান: ১১০)। এই আয়াতের মধ্যে কোনো শর্ত নেই যে দাওয়াহ কেবল মসজিদের মিম্বার থেকে কিংবা মুখে মুখে হতে হবে। বরং যুগে যুগে দাওয়াহর মাধ্যম বদলেছে-সাহাবিদের যুগে ছিল মুখের কথা আর চিঠি, তাবেইদের যুগে বই আর গ্রন্থাগার, উসমানীয় যুগে ছাপাখানা, আর আজ আমাদের হাতে আছে এমন এক শক্তি যা কল্পনাতীত।

একটি স্মার্টফোন আজ একইসঙ্গে মসজিদ, লাইব্রেরি, ক্লাসরুম এবং জনসমাবেশের স্থান হয়ে উঠেছে। যে তরুণ কখনো মসজিদমুখী হয়নি, সে হয়তো গভীর রাতে ইউটিউবে ঘুরতে ঘুরতে কোনো আলেমের একটি ভিডিওতে থমকে দাঁড়ায়। যে মেয়েটি পর্দার প্রশ্নে দ্বিধায় ছিল, সে হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টে খুঁজে পায় তার মনের জবাব। আজকের প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস, এমনকি নৈতিকতা গড়ে ওঠে অনেকাংশে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা সময়টুকু দিয়ে। যে দাঈ এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হন, তিনি এমন একজন মানুষের মতো যিনি স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে চান, অথচ নৌকা ব্যবহার করতে রাজি নন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই তার সময়ের সবচেয়ে কার্যকর যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তিনি লেখক নিযুক্ত করেছিলেন, রাষ্ট্রনায়কদের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন, এমনকি যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে যারা লেখাপড়া জানত, তাদের কাছ থেকে মুসলিম শিশুদের লেখা শেখানোর বিনিময়ে মুক্তির ব্যবস্থাও করেছিলেন। এই সবকিছুর মূলে ছিল একটি বার্তা তা হলো সত্য যেভাবেই হোক, যতদূর সম্ভব পৌঁছে দিতে হবে। প্রযুক্তি সেই একই নীতির আধুনিক সম্প্রসারণ মাত্র।

আজকের দাঈর সামনে যে সুযোগ খোলা আছে, তা ইতিহাসের কোনো যুগের দাঈ কল্পনাও করতে পারেননি। একটি ভালো ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, একটি সহজবোধ্য লেখা হাজারো মনে প্রশ্ন জাগাতে পারে। যে ভাষা মানুষ বোঝে না, সেই ভাষায় লেখা বই এখন সেকেন্ডের মধ্যে অনুবাদ হয়ে যায়। যে মানুষটি মসজিদে যাওয়ার সাহস পায় না লজ্জায় বা দ্বিধায়, সে হয়তো অজ্ঞাতনামা পরিচয়ে প্রশ্ন করে তার মনের সবচেয়ে গোপন সংশয়টুকু মিটিয়ে নিতে পারে।

কিন্তু এই বিশাল সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে আছে বিপজ্জনক ঘূর্ণিপাক। প্রযুক্তি যেমন সত্যকে দ্রুত পৌঁছে দেয়, তেমনি মিথ্যাও পৌঁছে দেয় সমান গতিতে; বরং প্রায়ই আরো আকর্ষণীয় মোড়কে। যে ব্যবস্থা মানুষকে সবচেয়ে বেশি সময় স্ক্রিনে আটকে রাখতে চায়, সে সত্যের গভীরতাকে গুরুত্ব দেয় না, গুরুত্ব দেয় উত্তেজনাকে। ফলে ধৈর্যশীল ও চিন্তাশীল আলোচনার চেয়ে চটকদার শিরোনাম আর বিতর্কমূলক বক্তব্য বেশি সেই ছড়িয়ে পড়ে। দাঈর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনপ্রিয়তার লোভে পড়ে বার্তার গভীরতা বিসর্জন না দেওয়া।

দাওয়াহর মূল শর্ত ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। যখন একজন দাঈ ক্যামেরার সামনে কথা বলেন, তখন একটি সংখ্যা তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে- কতজন দেখল, কতজন প্রতিক্রিয়া জানাল, কতজন শেয়ার করল।

এই সংখ্যার প্রতি মোহ অজান্তেই নিয়তকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে আগে যাদের বিচার করা হবে, তাদের মধ্যে একজন হবেন সেই ব্যক্তি, যিনি ইলম শিক্ষা দিয়েছেন এবং কোরআন পাঠ করেছেন শুধু মানুষ তাকে আলেম বলুক এই আশায়-আর তাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে (মুসলিম)। এই হাদিস আজকের দাঈদের জন্য এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন এক ব্যবস্থা, যা প্রতিনিয়ত মানুষের প্রশংসাকে সামনে নিয়ে আসে, আর গোপনে ইখলাস ক্ষয় করতে থাকে। তাই প্রতিটি দাঈর উচিত নিয়মিত নিজের অন্তরের সঙ্গে হিসাব-নিকাশ করা- আমি কি সত্যিই আল্লাহর জন্য বলছি, নাকি মানুষের বাহবা কুড়ানোর জন্য?

আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, 'তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে, আর তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো এমনভারে যা সর্বোত্তম।' (সুরা নাহল : ১২৫)। ডিজিটাল জগতে হিকমাহর অর্থ কেবল মিষ্টি কথা বলা নয়; বরং এর অর্থ হলো শ্রোতার প্রেক্ষাপট বোঝা, তার প্রশ্নের পেছনের যন্ত্রণা অনুধাবন করা এবং এমনভাবে উত্তর দেওয়া, যা তার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, শুধু যুক্তিকে পরাজিত করে না।

দুর্ভাগ্যক্রমে ইন্টারনেটের অসংখ্য কোণে দেখা যায় এমন বিষয়বস্তু, যেখানে ইসলামকে উপস্থাপন করা হয় রাগ আর তাচ্ছিল্যের ভাষায়। অন্য ধর্মের মানুষকে ছোট করে, ভিন্নমতের মুসলিমদের প্রতি কঠোরতা দেখিয়ে, কিংবা প্রশ্নকারীকে বোকা বানিয়ে যে দাওয়াহ দেওয়া হয়, তা প্রকৃতপক্ষে দাওয়াহর বিপরীত কাজ করে। এমন বিষয়বস্তু হয়তো নিজস্ব গোষ্ঠীর মধ্যে বাহবা পায়; কিন্তু যাদের কাছে বার্তা পৌঁছানোর কথা ছিল, তাদের হৃদয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যাকে কোমলতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাকে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত করা হয়।' (মুসলিম)। ডিজিটাল দাওয়াহতেও এই কোমলতা অপরিহার্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিপদ হলো, যে কেউ এখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দ্বীনের মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। জ্ঞান আর মতামতের মধ্যে থাকা সীমারেখা প্রায় মুছে দিয়েছে প্রযুক্তি। ফলে অগভীর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জটিল ফিকহি বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছেন, অথচ প্রকৃত আলেমদের বহু বছরের অধ্যয়ন আর তাজকিয়ার প্রয়োজনীয়তাকে অবহেলা করছেন। তাই প্রতিটি মুসলিমের, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের, শেখা জরুরি কীভাবে উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে হয়। কোনো কথা শুধু আকর্ষণীয়ভাবে বলা হয়েছে বলেই তা সত্য নয়, আর কোনো বক্তা শুধু জনপ্রিয় বলেই নির্ভরযোগ্য নন। প্রকৃত ইলমের সিলসিলা আর ওয়াদের কাছে বসে শেখার গুরুত্ব ডিজিটাল যুগেও ধরে রাখতে হবে।

তবে এতসব সতর্কতার মাঝেও একটি সত্য ভুলে গেলে চলবে না, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের হৃদয়ের স্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। একটি ভিডিও একজন মানুষকে ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে;-কিন্তু তাকে ঈমানের গভীরে নিয়ে যেতে প্রয়োজন হয় একজন জীবন্ত মানুষের সঙ্গ, তার প্রশ্নের ধৈর্যশীল উত্তর এবং তার দুর্বল মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন সহযাত্রী। তাই সবচেয়ে কার্যকর দাওয়াহ মডেল সেটাই, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যম হয় প্রথম দরজা, আর মানবিক সম্পর্ক হয় সেই দরজার পেছনের ঘর।

আজকের দাঈর প্রয়োজন কেবল প্রযুক্তির দক্ষতা নয়; প্রয়োজন, গভীর ইলম, পরিশুদ্ধ নিয়ত, ধৈর্য, আর মানুষের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা। প্রযুক্তি একটি হাতিয়ার মাত্র-সঠিক হাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, ভুল হাতে ধ্বংস ডেকে আনে। এই যুগে দাওয়াহর দায়িত্ব শুধু আলেম আর ইমামদের কাঁধে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিটি মুসলিম যার হাতে একটি স্মার্টফোন আছে, তার সামনেও খোলা আছে এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার। প্রশ্ন শুধু এটুকুই-আমরা কি সেই সুযোগকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করব, নাকি হারিয়ে যাব ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার মরীচিকায়?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, 'আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটিমাত্র আয়াত হয়।' (বুখারি)। আজকের যুগে এই একটি আয়াত পৌছাতে উটের পিঠে চড়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু একটি আন্তরিক হৃদয়, একটি সততাপূর্ণ কণ্ঠ, আর একটি স্ক্রিন। বাকিটা আল্লাহর হাতে-তিনিই হৃদয় পরিবর্তনের প্রকৃত মালিক, আমরা কেবল বার্তাবাহক।

লেখক: শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন