পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। (আবু দাউদ : ১১৩৪; নাসায়ি : ১৫৫৬) জিলহজ মাসের ১০ তারিখে সারা বিশ্বের মুসলমানরা মহান আল্লাহর আদেশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর নিজ ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার ইচ্ছা এবং ত্যাগের স্মৃতি স্মরণে পশু কোরবানি করে থাকেন। আল্লাহতায়ালা ইবরাহিম (আ.)-এর আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে ছেলের পরিবর্তে তাকে পশু কোরবানি করার নির্দেশ দেন। (সুরা সাফফাত : ১০৭)
কোরবানির পরিচয় ও ইতিহাস
‘ঈদ’ অর্থ-উৎসব এবং ‘আজহা’ অর্থÑকোরবানি বা উৎসর্গ। পারিভাষিক অর্থে, জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শরয়ি তরিকায় পশু জবাই করাই হলো কোরবানি। মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কোরবানি ছিল হজরত আদম (আ.)-এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের কোরবানি। (সুরা মায়েদাহ : ২৭) হাবিলের নিষ্ঠাপূর্ণ কোরবানি গৃহীত হয়েছিল। কারণ, তিনি ছিলেন মুত্তাকি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওই কোরবানি যাকে আগুন (অদৃশ্য থেকে) গ্রাস করে নেবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮৩) এ পদ্ধতিই প্রাচীন শরিয়তে কবুলিয়তের নিদর্শন ছিল।
আমাদের কোরবানি মূলত ‘সুন্নতে ইবরাহিমি’। মুসলিম জাতির পিতা হিসেবে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছেন। (সুরা হাজ্জ : ৭৮) ৮৬ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর কাছে সৎকর্মশীল ছেলে চেয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীল ছেলের সুসংবাদ দেন। (সুরা সাফফাত : ১০০-১০১)
সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি ছিল স্বপ্নের মাধ্যমে প্রিয় ছেলেকে কোরবানির নির্দেশ। ইবরাহিম (আ.) তাঁর ছেলেকে বললেন, ‘হে আমার ছেলে! আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে আমি জবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কী?’ ইসমাইল (আ.) জবাবে বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে, আপনি তা কার্যকর করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন।’ (সুরা সাফফাত : ১০২) পিতা যখন ছেলেকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন, তখন আল্লাহ ঘোষণা করলেন—‘হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়েছো। আমি সৎকর্মকারীদের এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি।’ (সুরা সাফফাত : ১০৩-১০৯)
কোরআনের আলোকে গুরুত্ব ও লক্ষ্য
কোরবানি শুধু প্রথা নয়, বরং আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন। (সুরা হাজ্জ : ৩৬) আল্লাহতায়ালা প্রতিটি উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান রেখেছিলেন, যেন তারা আল্লাহর দেওয়া পশু জবেহ করার সময় তার নাম স্মরণ করে। (সুরা হাজ্জ : ৩৪) আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো। (সুরা কাওসার : ২)
তবে কোরবানির মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়া। আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন : ‘মনে রেখো, কোরবানির গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের তাকওয়া। (সুরা হাজ্জ : ৩৭)
রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তিনি ঘোষণা করেন—‘আমার নামাজ, আমার ইবাদতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও মৃত্যুÑসবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।’ (সুরা আনআম : ১৬২-১৬৩)
প্রকৃত তাৎপর্য ও শিক্ষা
১. আত্মসমর্পণ : ঈদুল আজহা আমাদের শেখায় কীভাবে আবেগ ও সম্পদের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর নির্দেশের সামনে মাথা নত করতে হয়।
২. পশুত্ব বিসর্জন : কোরবানি শুধু পশু জবেহ নয়, বরং নিজের ক্ষুদ্রতা, নীচতা, স্বার্থপরতা ও আমিত্ব ত্যাগের শপথ।
৩. সামাজিক সাম্য : কোরবানি কোনো লোকদেখানো বা গোশত খাওয়ার উৎসব নয়। নিজের উপার্জিত উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করাই প্রকৃত মুমিনের কাজ। (সুরা বাকারাহ : ২৬৭)
৪. তাকওয়ার পরীক্ষা : যারা অহংকার প্রদর্শনের জন্য বড় পশু কেনেন বা শুধু গোশত খাওয়ার নিয়ত করেন, তাদের কোরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। হালাল উপার্জন এবং ইখলাসই কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত।
উপসংহার : তাকওয়ার কষ্টিপাথরে যাচাই করলে দেখা যায়, কোরবানি হলো আল্লাহর প্রতি পরম প্রেমের চূড়ান্ত পরীক্ষা। ইবরাহিম (আ.) ও তার পরিবারের সেই অবিস্মরণীয় আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জান-মাল ও প্রিয়তম সবকিছু আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কারণ আল্লাহ শুধু মুত্তাকিদের আদর্শকেই উত্তম আদর্শ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। (সুরা মুমতাহিনা : ৪)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

