আরাফা দিবসের মর্যাদা ও করণীয়

নাজমুল হুদা
নাজমুল হুদা

আরাফা দিবসের মর্যাদা ও করণীয়

আল্লাহতায়ালা মুমিনদের বিবিধ হিসাবনিকাশের জন্য বারো মাসে একটি বছরের রূপ দান করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় আসমানগুলো ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই মাস বারোটি, এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত (নিষিদ্ধ বা হারাম মাস)। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন।’ (সুরা তাওবা : ৩৫) এই চারটি মাসের একটি হলো, জিলহজ মাস। এই মাসটি পবিত্র হজ পালনের মাস। ইসলামের পঞ্চ রুকনের মধ্যে অন্যতম একটি হলো হজ আদায়। অন্যদিকে হজের মধ্যকার অন্যতম রোকন হলো আরাফায় অবস্থান। মহিমাঘেরা এই দিবসের তাৎপর্য, মহত্ত্ব চির উদ্ভাসিত।

বছরের শ্রেষ্ঠতম দিন আরাফার দিবস

বিজ্ঞাপন

সুরা আল-ফজরের দ্বিতীয় আয়াতে জিলহজের প্রথম দশকের কসম করে আল্লাহতায়ালা আয়াত নাজিল করেন, যা এই রাত্রিগুলোর অন্যতম মহিমার বহিঃপ্রকাশই মাত্র। এদিকে জিলহজের প্রথম দশকের নবম দিন আরাফার দিন। মহান যে দিবস নিয়ে আল্লাহতায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘এবং (শপথ) সেই দিবসের, যে উপস্থিত হয় এবং যাতে উপস্থিত হয়।’ (সুরা বুরুজ : ০৩) এই আয়াতের তাফসিরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ইয়াওমে মাশহুদ তথা যাতে উপস্থিত হয় দ্বারা আরাফার দিবস উদ্দেশ্য।’ (তিরমিজি : ৩৩৩৯)

আরাফার দিবসেই ইসলামের পূর্ণতা ঘোষণা

আরাফার ন্যায় মর্যাদাপূর্ণ দিবসে আল্লাহতায়ালা ইসলামের পূ্র্ণতার ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা আরাফা দিবসের শেষ ভাগে কোরআনের সেই মহান ও তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত অবতীর্ণ করেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ (সুরা মায়িদা : ০৩)

জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি লাভের দিন

একজন বান্দা মাত্রই আল্লাহর সমীপে ক্ষমাপ্রত্যাশী। ক্ষমা লাভের সুসংবাদ থেকে শ্রেষ্ঠ কোনো অর্জন বান্দার জন্য আর হতে পারে না। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আরাফা দিবসের তুলনায় এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহতায়ালা সর্বাধিক লোককে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন। আল্লাহতায়ালা নিকটবর্তী হন, অতঃপর বান্দাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের সামনে গৌরব করেন এবং বলেন, তারা কী উদ্দেশে সমবেত হয়েছে (বা তারা কী চায়)?’ (মুসলিম : ৩১৭৯)

ফেরেশতাদের সঙ্গে আল্লাহর গর্ব প্রকাশ

আমর বিন আস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা আরাফায় অবস্থানরত লোকদের নিয়ে আসমানের ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করে বলেন, দেখো! আমার বান্দাদের দেখো, তারা এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় আমার কাছে এসেছে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৮০৪৭)

আরাফাবাসীদের ক্ষমার ঘোষণা

আরাফার এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যঘেরা স্থানে যে বান্দাই আল্লাহর সমীপে নিজের প্রয়োজন পেশ করে, আল্লাহতায়ালা তা অবশ্যই পূরণ করেন। আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের বলেন, আচ্ছা! (আরাফাবাসী) এরা আমার কাছে কী চায়? এরপর আল্লাহ বলেন, হে আমার ফেরশেতারা! তোমরা সাক্ষী থেকো, আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম।’ (মুসলিম : ১৩৪৮)

আরাফা দিবসের দোয়ার শ্রেষ্ঠত্ব

দোয়া ও মোনাজাতের জন্য বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আরাফার দোয়া শ্রেষ্ঠতর দোয়া।’ (তিরমিজি : ৩৫৮৫)

সুতরাং এই দিবসটিকে হজ ও হজের বাইরের সব মুসলিমের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগানো। তাই জেনে নিন আরাফার দিবসে কী কী করণীয় আছে।

আরাফায় অবস্থান করা

হজের মধ্যকার অন্যতম রুকন হলো, আরাফায় অবস্থান। নবীজি বলেন, ‘আরাফায় অবস্থানই হজ।’ (তিরমিজি : ৮৮৯) তাই এই দিবসে হাজিরা আরাফায় সমবেত অবস্থান করবেন।

আরাফা দিবসের রোজায় দুই বছরের গুনাহ মাফ

আরাফার দিবসের মতো শ্রেষ্ঠতর দিনে আল্লাহতায়ালা বান্দার পক্ষ থেকে সেরা সব আমলের নজরানা পছন্দ করেন। এর মধ্যে একটি হলো, যারা হজে যাননি, তারা নিজ স্থানে থেকে রোজা পালন করা সুন্নতসম্মত একটি বিধান। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আর আরাফার দিবসের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তাতে পূর্ববর্তী বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’ (মুসলিম : ২৬৩৬)

অধিক পরিমাণে দোয়া ও ইস্তেগফার

এই দিনে অধিক পরিমাণে দোয়া করা। বিশেষত, এই দোয়াটি অধিক পরিমাণে করা; সেটি হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদুহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ইউহয়ী ওয়া ইউমিতু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়্যিন ক্বাদির। মোটকথা, এদিনে আমাদের কর্তব্য হবে ক্ষমা প্রার্থনা এবং রোনাজারির মাধ্যমে পাপমুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা করা।

কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির করা

এই দিবসে কিছু পরিমাণ সময় কোরআন তিলাওয়াতের জন্য নির্দিষ্ট করা। হৃদয়ে প্রশান্তি অর্জনে কোরআন তিলাওয়াতের এবং হৃদয়ে সজীবতা আনতে জিকিরের তথা আল্লাহর অধিক স্মরণের বিকল্প নেই।

দান-সদকা করা

মহান এই দিনে সাধ্যমতো দান-সদকা ইত্যাদিতে নিজের জন্য একটি অংশ হলেও রাখা। আল্লাহতায়ালা দান-সদকাকারীদের ভালোবাসেন। সদকার মাধ্যমে আল্লাহর ক্রোধ ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচা যায়। সদকার সুবাদে যেকোনো আমল কবুলের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

লেখক : অধ্যয়নরত, মাস্টার্স (তাফসির), উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় মক্কা, সৌদি আরব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন