আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিশ্বনবীর (সা.) যুগে নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি

ধর্ম ডেস্ক

বিশ্বনবীর (সা.) যুগে নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি

নেতৃত্ব শুধু ক্ষমতা নয়—এটি মানুষের ওপর মানুষের দায়িত্ব। ইতিহাসের পাতায় বহু শাসক ও শাসনব্যবস্থার কথা উল্লেখ থাকলেও আদর্শ নেতৃত্বের সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর যুগে নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি ছিল ন্যায়, নৈতিকতা ও আমানতের ওপর প্রতিষ্ঠিত—যা আজও মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।

বর্তমান সময়ে নেতা বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন সাধারণত ভোটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে নবীজি (সা.)-এর যুগে নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতি বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার মতো ছিল না।

বিজ্ঞাপন

মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি নিজেই। তার ইন্তেকালের পর পর্যায়ক্রমে সাহাবায়ে কেরাম মদিনা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকেই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। তার ওফাতের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় তার প্রদর্শিত আদর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। সে যুগে নেতা নির্বাচন হতো মূলত কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা, নৈতিক যোগ্যতা, জনগণের আস্থা এবং পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবের চেয়ে দায়িত্ববোধ ও আমানতের গুরুত্বকেই তখন বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো।

মদিনায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ভিত্তি

হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু ধর্মীয় নেতা হিসেবেই নয়, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর—

১. ওহি ও আল্লাহর নির্দেশনা

২. জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য

৩. ন্যায়বিচার ও আমানতদারিতা

মদিনার আনসার ও মুহাজিরদের বাইয়াতের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

বাইয়াত: নেতৃত্ব গ্রহণের সামাজিক স্বীকৃতি

নবী যুগে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ছিল বাইয়াত। আকাবার বাইয়াতের মাধ্যমে মদিনাবাসী রাসুল (সা.)-কে তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি কোনো জোরপূর্বক শপথ ছিল না; বরং বিশ্বাস, আস্থা ও দায়িত্ববোধ থেকে মদিনার মানুষ স্বেচ্ছায় রাসুল (সা.)-কে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

যোগ্যতা ও চরিত্র ছিল মূল মানদণ্ড

নবী যুগে নেতৃত্ব নির্ধারণে বংশ, সম্পদ কিংবা সামাজিক ক্ষমতাকে মুখ্য করা হতো না। বরং তাকওয়া ও আল্লাহভীতি, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

এই নীতির বাস্তব উদাহরণ হলো— এক সময়ের দাস হজরত বিলাল (রা.)-কে সম্মানজনক দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং অল্প বয়সী হজরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কে সেনাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়।

পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা

রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরআন ও ওহির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে শূরা বা পরামর্শ গ্রহণ করতেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধসহ বিভিন্ন ঘটনায় এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নবী যুগের নেতৃত্ব ছিল অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক।

বিশ্বনবী (সা.)-এর যুগের নেতৃত্বব্যবস্থা আমাদের শেখায়— নেতৃত্ব কোনো ক্ষমতার পদ নয়, বরং এটি একটি মহান আমানত। যোগ্যতা, চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও মানুষের কল্যাণই ছিল নেতা নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড। ক্ষমতার লোভ নয়, বরং আল্লাহভীতি ও জনগণের আস্থাই একজন নেতাকে প্রকৃত অর্থে মর্যাদাবান করে তোলে। আজকের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যদি নবীজি (সা.)-এর প্রদর্শিত এই আদর্শ অনুসরণ করা যায়, তবে নেতৃত্ব ফিরে পেতে পারে তার প্রকৃত মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রূপ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন