বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দূরদূরান্ত থেকে আসা হাজারো মুসলিম মেয়ের আবাসস্থল হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় হল, মেস বা হোস্টেল। যদিও খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঢাকায় আত্মীয়স্বজন থাকার কারণে একটি নিরাপদ বিকল্প তৈরি হয়, অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই বাধ্যতামূলকভাবে হলে থাকা শুরু করতে হয়।
পর্দা মেনে চলতে চাওয়া মেয়েদের জন্য এই হলজীবন প্রায় দুঃস্বপ্নের মতো। পরিবার, পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপরিচিত মানুষের মধ্যে একই ছাদের নিচে বসবাস করতে হয়। এই পরিবর্তন শুধু সামাজিক নয়, বরং পর্দাশীল মুসলিম নারীর জন্য ঈমানের একটি বড় পরীক্ষা।
ইসলামে পর্দা কোনো ঐচ্ছিক সংস্কৃতি নয়, বরং কোরআন ও হাদিসে প্রমাণিত ফরজ ইবাদত। আল্লাহ বলেন, ‘তারা (নারীরা) যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা স্বতঃসিদ্ধ।’ (সুরা নুর : ৩১) হাদিসে এসেছে, ‘নারীকে আবৃত থাকতে হবে; বাইরে গেলে শয়তান তাকে লক্ষ করে।’ (তাবারানি)
হলজীবনে পর্দা রক্ষা করা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। একটি বড় সমস্যা হলো পুরুষ কর্মচারীদের অবাধ প্রবেশ। প্রতিটি তলায়, প্রতিটি দরজায় থাকে পুরুষ কর্মচারীদের অবাধ প্রবেশাধিকার; তাদের মুখোমুখি হতে হয় দিনের বিভিন্ন সময়, কখনোই নিশ্চিন্তে থাকা যায় না। সকাল, দুপুর বা রাতে পুরুষ ক্লিনার, মিস্ত্রি বা দারোয়ানরা হলে প্রবেশ করেন, যা শরিয়তের বিধানের পরিপন্থী।
আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলোআইডি কার্ড বাধ্যতামূলক আর সেখানে ছবি না থাকলে প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু নিকাবসহ ছবি গ্রহণযোগ্য নয় প্রশাসনের কাছে। ফলে নারীর পর্দা রক্ষার মৌলিক অধিকার এখানেও ক্ষুণ্ণ হয় আর সেই ছবি দেখে হলে প্রবেশের অনুমতি দেয় যে পুরুষ নিরাপত্তাকর্মী, তাকেও এড়ানো যায় না। পর্দাশীল নারীদের জন্য ছবি তোলা এবং তা পুরুষকর্মীদের হাতে দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে সংবেদনশীল।
অপ্রকাশ্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো কক্ষে অমুসলিম রুমমেটের উপস্থিতি। শরিয়তে অমুসলিম নারীর সঙ্গেও ন্যূনতম পর্দার বিধান রয়েছে, বিশেষত যদি তিনি এমন আচরণে অভ্যস্ত হন, যা ইসলামবিরোধী সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। একই রুমে বসবাস তো বটেই, এমনকি একই বিছানাও শেয়ার করতে হয় অনেক সময়, যা সরাসরি ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। এতে মুসলিম নারীর ঈমান, চরিত্র, এমনকি মানসিক প্রশান্তিও হুমকির মুখে পড়ে। নিজের মতো করে চলার অধিকার হারিয়ে ফেলে অনেক শিক্ষার্থী।
ইসলাম নারীশিক্ষাকে উৎসাহিত করে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞানার্জন ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ : ২২৪) আয়েশা (রা.)-এর মতো নারী সাহাবিরা এর উদাহরণ। কিন্তু সহশিক্ষা ব্যবস্থা, গায়রে মাহরাম শিক্ষকদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা এবং হলের পরিবেশ প্রায়ই পর্দার বিধানের বিপরীত।
যখন ইসলাম সহশিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করেছে, নারীর হিজাব, পর্দা, গায়র মাহরাম পুরুষ থেকে দূরত্ব—সবকিছুকে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হিসেবে বিবেচনা করেছে; তখন এ ব্যবস্থাপনা আমাদের জন্য কতটা শরয়ি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। হাদিসে এসেছে, ‘আমি পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বড় ফিতনা রেখে যাইনি।’ (বোখারি : ৫০৯৬) এই ফিতনা এড়াতে শিক্ষার পরিবেশে পর্দা ও লিঙ্গ-বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা জরুরি।
একজন মুসলিম মেয়ের পক্ষে যখন তার দ্বীন ঠিক রেখে উচ্চশিক্ষার পথে চলা সম্ভব হয় না, তখন সেই শিক্ষার ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। সমাধান শুধু ব্যক্তিগত ঈমানদারিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোটা মুসলিম সমাজকেই এ বিষয়ে দায় নিতে হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধানে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন। নারীদের জন্য আলাদা ক্যাম্পাস ও হল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। প্রশাসন ও নিরাপত্তায় হিজাবি নারীদের নিয়োগ করা হলে পর্দাশীল পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
আইডি যাচাইয়ের জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বা নারী কর্মী দ্বারা পরিচালিত প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে। এছাড়া, রুমমেট নির্বাচনে ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্বাধীনতা দেওয়া উচিত, যাতে মুসলিম নারীরা তাদের ঈমান ও জীবনাচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সঙ্গী পান।
লেখক : শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

