আজ অষ্টম তারাবিতে সূরা তওবার (৯৪-১৯৩) আয়াত এবং সূরা ইউনুস পড়া হবে। পারা হিসেবে আজ তেলাওয়াত হবে ১১তম পারা। আজকের তারাবিতে পঠিতব্য অংশের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হলো।
৯. সূরা তওবা (৯৪-১৯৩) পারার শুরুতে মোনাফেকদের আলোচনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) কে তাবুক থেকে ফেরার পথে জানিয়ে দিয়েছিলেন, মদিনায় পৌঁছার পর মোনাফেকরা বিভিন্ন অজুহাত পেশ করবে। এমনই হয়েছিল, মোনাফেকরা মিথ্যা কসম খেয়ে খেয়ে নিজেদের সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছিল।(৯৪-৯৬)।
অন্যদিকে তিনজন খাঁটি ঈমানদার ছিলেন, যারা অলসতার কারণে যুদ্ধে যেতে পারেননি। তারা কোনো ওজর খোঁজেননি, বরং পরিষ্কার ভাষায় স্বীকার করেছেন, যুদ্ধে না যাওয়ার তেমন কোনো ওজর ছিল না আমাদের, শুধু অলসতার কারণে যুদ্ধে যাইনি। তাদেরকে আলাদা থাকার হুকুম দেওয়া হয়। এমনিক পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত তাদেরকে বয়কট করে রাখা হয়। কিন্তু সত্য বলার কারণে শেষে তারা বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। তাদের তওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ ওহি মারফত জানানো হয়। (১০২-১০৬, ১১৭-১১৮)।
মোনাফেকরা মুসলমানদের ক্ষতিসাধন, কাফেরদের সহযোগিতা ও মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির জন্য ‘মসজিদে জিরার’ তৈরি করেছিল। মুহূর্তের জন্যও এমন স্থানে অবস্থান করতে নিষেধ করা হয়েছে। মসজিদে জিরারের বিপরীতে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত কুবা মসজিদের আলোচনা করে তাকওয়ার গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে।(১০৭-১১০)। এরপর সেই মহান মোমিনদের আলোচনা করা হয়েছে, যারা জান্নাত লাভের আশায় জানমাল সবকিছু আল্লাহর রাহে বিলীন করে দেন। এখানে মোমিনদের কয়েকটি গুণের কথা বলা হয়েছে।
গুণগুলো হলোঃ তওবা, ইবাদত-বন্দেগি, আল্লাহর প্রশংসা, জিহাদ, সিয়াম, রুকু-সিজদা আদায়, নেক কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার সংরক্ষণ। (১০৭-১১২)। গুণগুলো প্রতিটি মোমিন বান্দার অর্জন করা উচিত। মুশরিকদের জন্য ইস্তেগফার করা যাবে না- মর্মে আদেশ দেওয়ার পর মোমিনদেরকে তাকওয়া অবলম্বন, মোনাফেকদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, সত্যাশ্রয়ীদের সংস্পর্শ গ্রহণ এবং সব কিছুর বিনিময়ে হলেও নবীজির অনুসরণ এবং নবীজিকে সব কিছুর উপর প্রাধান্য দানের জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (১১৩-১১৬, ১১৯ -১২১)। সূরার শেষ দিকে ইলম অর্জন ও প্রচারের গুরুত্ব (১২২), জিহাদের কিছু মূলনীতি (১২৩), মোনাফেকদের নিন্দা (১২৫) এবং নবীজির বিশেষ কিছু গুণের (১২৮) প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। ১০. সূরা ইউনুস (মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ১১৯, রুকু ১১) এ সূরায় ঈমানের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস এবং বিশেষত কোরআনুল কারিম সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। সূরার শুরুতে নবী মুহাম্মদের নবুওয়ত লাভ যে কোনো অভিনব বিষয় নয়- এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। (২)। এরপর আল্লাহর ইবাদত করার মূল তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যিনি প্রতিপালক ও স্রষ্টা তারই ইবাদত করতে হবে। (৩-৬)। আল্লাহর কুদরতের দলিল-প্রমাণ দেখা সত্ত্বেও মানুষ দুই দলে বিভক্ত, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী। বিশ্বাসীদের ঠিকানা জান্নাত, আর অবিশ্বাসীদের ঠিকানা জাহান্নাম।(৭-৯)। তাড়াহুড়া ও ত্বরাপ্রবণতার কারণে মানুষ যেভাবে নিজের অমঙ্গল চায় এভাবেই যদি তাদের প্রার্থনা কবুল হয়ে যেত তাহলে পৃথিবীতে কেউ আর বাঁচত না, মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যেত। (১১)। কোরআন আল্লাহর কালাম, কাফেররা সে কথা মানত না। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বানিয়েছেন- মুশরিকরা এমন কথা বলত। উত্তরে বলা হয়েছে, চল্লিশ বছর যিনি প্ররথিবীর কোন সৃষ্টির ব্যাপারেই কোনো ধরনের মিথ্যা বলেননি, তিনি এ বয়সে এসে মহান স্রষ্টা আল্লাহর ব্যাপারে কেন মিথ্যা বলতে যাবেন? তাছাড়া তিনি তো দুনিয়ায় কারও শিষ্যত্ব গ্রহণ করেননি। কাব্য চর্চাও করেননি। এ সত্ত্বেও তিনি এমন অলৌকিক ও অলংকারপূর্ণ কথা নিজ থেকে কীভাবে বলতে পারেন?(১৫-১৭)। কোরআন চিরসত্য, মহান আল্লাহর কালাম- এ কথা বলে চ্যালেঞ্জ ছোড়া হয়েছে, যদি এটা মানুষের কথা হয়ে থাকে তাহলে তোমরাও এর অনুরূপ কোনো সূরা বানিয়ে দেখাও দেখি। এ উদ্দেশ্যে তোমরা আরব-অনারব, মানব-দানব যাকে খুশি ডেকে নিতে পারো।(৩৭-৩৮)।পরবর্তী আয়াতগুলোতে মুশরিকদের মূর্তিপূজার রদ এবং আল্লাহর একত্ববাদের বিভিন্ন দলিল উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কষ্ট ও দুর্যোগের সময় বড় বড় মুশরিকও মিথ্যা উপাস্যদের ভুলে যায়। তখন সে প্রকৃত উপাস্যকে ডাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু বিপদ থেকে মুক্তির পর মুহূর্তেই তারা আবার রবকে ভুলে যায়। (১৮-২২)। অথচ আসমান জমিন থেকে রিজিকের ফয়সালা, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি দান, প্রাণহীন বস্তু থেকে প্রাণপূর্ণ বস্তুকে আর প্রাণপূর্ণ বস্তু থেকে প্রাণহীন বস্তু বের করা- এসব তো আল্লাহ তায়ালাই করেন।(৩১)।
আসলে মানুষের অস্বীকারের মূল কারণ হলো অজ্ঞতা। মানুষের স্বভাব হলো, যা সে জানে না, যে বস্তুর প্রকৃত তত্ত্ব সে অনুধাবন করতে পারে না তা-ই সে অস্বীকার করে বসে। (৩৯)। এরপর উপদেশ লাভের জন্য তিনটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ঘটনা নুহ (আ.) এর। তিনি দীর্ঘকাল জাতিকে দাওয়াত দেন। কিন্তু হতভাগা জাতি নবীর কথা না শুনে ধ্বংস হয়েছে।(৭১-৭২)। দ্বিতীয় ঘটনাটি মুসা (আ.) ও হারুন (আ.) এর। খোদা হওয়ার দাবিদার ফেরাউনের মোকাবিলায় পাঠানো হয়েছিল তাদের। (৭৫-৯৩)। তৃতীয় ঘটনাটি ইউনুস (আ.) এর। তার নামেই এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। নিজ কওমের ঈমান আনার বিষয়ে আশাহত হয়ে এবং আল্লাহর আজাব আপতিত হওয়ার নিশ্চিত অবস্থা দেখে তিনি ‘নিনাওয়া’ নামক স্থান ছেড়ে চলে আসেন। ইউনুস (আ.) চলে যাওয়ার পর তার কওমের লোকেরা ভুল বুঝতে পেরে তওবা, ইস্তেগফার করে। ফলে তাদের থেকে আল্লাহ তায়ালা আজাব সরিয়ে নেন। (৯৮)। সূরার শেষ দিকে মোমিনদেরকে সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া বলেছেন, ‘এটা আমার নিয়ম, সবশেষে আমি মোমিনদেরকেই মুক্তি দেই’ (১০১-১০৩)।সূরা ইউনূসের সূচনা যেভাবে কোরআন হাকিমের আলোচনা দিয়ে হয়েছিল, সমাপ্তিও হয়েছে এই সত্য কিতাবের অনুসরণের হুকুম প্রদানের মাধ্যমে।(১০৮-১০৯)।
লেখক: সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

