আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জ্যোতির্বিজ্ঞান বা হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঈদ উদ্‌যাপন বৈধ নয়

আমার দেশ অনলাইন

জ্যোতির্বিজ্ঞান বা হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঈদ উদ্‌যাপন বৈধ নয়
ছবি: আমার দেশ

বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ বেলা ১১টায় দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশের উদ্যোগে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আজিমপুর ছাপড়া জামে মসজিদ মিলনায়তনে রোজা ও ঈদ পালনের ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞান বা হিজরি ক্যালেন্ডার নয়; বরং চাঁদ দেখে রোজা ও ঈদ পালন করার বিষয়ে সর্বস্তরের মুসলমানদের সতর্ক করার জন্য জরুরি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশের পরিচালক ও আজিমপুর ছাপড়া মসজিদের খতিব মুফতি জুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুস। সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন রহমানিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা শফিকুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

সভার মূল বক্তব্যে মুফতি জুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুস বলেন, পাঁচটি কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানের তৈরি হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোজা-ঈদ পালন করা ইসলামে বৈধ নয়।

এক. জ্যোতির্বিজ্ঞানের তৈরি হিজরি ক্যালেন্ডার কোরআন সুন্নাহে বর্ণিত রোজা ও ঈদ পালনের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, পবিত্র কোরআনে সুরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের মধ্যে যে মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে। কুরআনের ব্যাখ্যায় সহীহ বুখারীর ১৯০৬ নং হাদীস শরীফে নবীজি বলেন, তোমরা চাঁদ না দেখে রোজা রাখবে না এবং চাঁদ না দেখে রোজা ছাড়বে না। যদি মেঘ ইত্যাদির কারণে চাঁদ না দেখা যায়, তাহলে মাস ত্রিশ দিনে পূর্ণ করবে।

এজাতীয় আরো বহু হাদিস রয়েছে, যা দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায়, চর্মচোখে চাঁদ দেখে রোজা ও ঈদ পালন করাই ইসলামের বিধান। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানের তৈরি হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করলে চাঁদ দেখার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকে না। সুতরাং জ্যোতির্বিজ্ঞানের তৈরি হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করা বৈধ নয়।

দুই. কেউ কেউ বলেন, নবীজির যুগে জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল না বিধায় ওজর ও অপারগতার কারণে নবীজি চর্মচোখে চাঁদ দেখার আদেশ দিয়েছিলেন। তাদের এ কথাও সঠিক নয়।

বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারীর ৪/১২৭ রয়েছে, তৎকালীন সময়ের মানুষ জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে খুব কমই জানত।

আল্লামা মুফতি শফী রহি. জাওয়াহিরুল ফিকহ-এর ৩ নং খণ্ডে লেখেন, পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নবীজির জন্মের আগেই পৃথিবীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা ছিল। মিশর, শাম ও হিন্দুস্তানে চন্দ্র পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত ছিল, যেখান থেকে চাঁদ উদয়ের আগাম সংবাদ নিখুঁতভাবে দেওয়া হতো।

তা সত্ত্বেও নবীজি বলেছেন, চাঁদ না দেখা গেলে মাস ৩০ দিনে পূর্ণ করো; কিন্তু নবীজি বলেননি চাঁদ না দেখা গেলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।

তিন. হযরত ওমর অর্ধ পৃথিবীর শাসক ছিলেন। অনেক সংস্কার মূলক কাজ তিনি করেছিলেন। যদি জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে রোজা ঈদ পালন করা ইসলামের বিধান হতো তাহলে তিনি অবশ্যই কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতেন। আর তার পক্ষে এটা সহজ ছিল। কেননা তার শাসন আমলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কেন্দ্রগুলো মুসলমানদের অধীনে এসে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি এবং তার পরবর্তী অন্যান্য খলিফা ও সাহাবা তাবেয়িগণ কেউই এই জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। তাহলে বোঝা গেল জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে রোজা ঈদ পালন করা ইসলামের বিধান নয়।

চার. জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব শতভাগ সঠিক এই কথার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। তাফহীমুল ফালাকিয়্যাত নামক গ্রন্থের ৪০ নং পৃষ্ঠায় আছে, এই শাস্ত্রের বড় বড় পন্ডিতগণ এই ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, এই শাস্ত্রে এমন কোন সার্বজনীন নীতি বা নির্ভুল সূত্র নেই যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে অমুক দিন অমুক জায়গায় চাঁদ দেখা যাবে বরং এটা বলা সম্ভব যে অমুক দিন অমুক জায়গায় চাঁদ দেখার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর দুটি জ্বলন্ত প্রমাণ:

১. চলতি রমজান মাসের শুরুতে আমিরাতের সারজাহ জ্যোতির্বিজ্ঞান একাডেমি বলেছিল, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি বুধবার ২০২৬ রমজানের চাঁদ দেখা অসম্ভব। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও চাঁদের দেখা মিলবে না। অথচ সৌদি আরব ও আফগানিস্তান সহ অনেক দেশে ঐ দিন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা গিয়েছে।

২. জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন ১৯ শে মার্চ বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতরের চাঁদের জন্ম হবে। ২০ শে মার্চ শুক্রবার পৃথিবীতে ঈদ শুরু হবে। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কথার বিপরীতে আফগানিস্তান, নাইজার ও মালির মুসলমানগন চাঁদ দেখে আজ ১৯শে মার্চ বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করছেন। তাহলে বুঝা গেল জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব এবং বাস্তবতার মাঝে কখনো কখনো ব্যবধান হতে পারে। তাই চাঁদ না দেখে কেবলমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে রোজা ঈদ পালন করা ইসলামের বিধান হতে পারে না।

পাঁচ. জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব মোতাবেক রোজা ঈদ পালন করার এ দাবি নতুন নয়। বরং হাজার বছর পূর্বে রাফিজি সম্প্রদায়ের লোকেরা এ দাবি করেছিল। তৎকালীন সময়ের উলামায়ে কেরাম তাদের এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন এটি একটি বাতিল এবং ভ্রান্ত মত। যেমনটি সহিহ বুখারীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারীতে বর্ণিত হয়েছে।

সুতরাং এ সকল কারণে চাঁদ না দেখে শুধুমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানের তৈরি হিজরী ক্যালেন্ডার কিংবা লুনার ক্যালেন্ডার উপর ভিত্তি করে রোজা ঈদ পালন করা বৈধ নয়।

মুফতি জুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুস আরো বলেন-নিজ অঞ্চলে চাঁদ না দেখে সৌদি আরব কিংবা দূরবর্তী ভিন্ন কোন অঞ্চলের চাঁদের সংবাদের ভিত্তিতে রোজা ঈদ পালন করাও ইসলামের বিধান নয়। যেমনটি আফগানিস্তান নাইজার এবং মালির ঈদ উদযাপন করার মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।

কারণ চাঁদ দেখার মাধ্যমে এই তিন দেশের লোকেরাই কেবল আজ ঈদ করছে। সৌদি আরব কিংবা পৃথিবীর অন্য কোন দেশ তাদের সংবাদের ভিত্তিতে ঈদ উদযাপন করছে না। যদি পৃথিবীর কোন এক জায়গায় চাঁদ দেখা গেলে সবার উপর ঈদ পালন করা ইসলামের বিধান হতো তাহলে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব উক্ত তিন দেশের সংবাদের ভিত্তিতে ঈদ উদযাপন করতেন।

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা! এতক্ষণের আলোচনা দ্বারা আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়েছে-রোজা ঈদ পালন করার ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞানের তৈরি লুনার ক্যালেন্ডার বা হিজরী ক্যালেন্ডারকে ভিত্তি বানানো বৈধ নয়। এমনকি সৌদি আরব কিংবা পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলে আগে চাঁদ দেখা যায় তাদের সাথে তাল মিলিয়ে সমগ্র পৃথিবীর সবাইকে একই দিনে রোজা ঈদ উদযাপন করাও ইসলামের বিধান নয়।

প্রিয় মুসলিম দেশবাসী! আমরা যে বিষয়গুলো আপনাদের সামনে উপস্থাপন করেছি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বিজ্ঞ অভিজ্ঞ মুফতিগণ লিখিত আকারে আমাদেরকে এ সকল বিষয়ে ফাতাওয়া প্রদান করেছেন। সুতরাং আপনারা আমাদের কথার উপর আস্থা রাখতে পারেন।

সভার প্রধান অতিথি হিসেবে মাওলানা শফিকুল ইসলাম সাহেব বলেন- জ্যোতির্বিজ্ঞানকে পুঁজি বানিয়ে কিছু লোক মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে চলছে। আমি একটি প্রশ্ন করি, বলুন তো মানুষের বয়স কখন থেকে গণনা করা হয়, মায়ের পেট থেকে নাকি জন্মের দিন থেকে? তাহলে চাঁদের বয়সতো তখন থেকেই গণনা করা হবে যখন চাঁদ দৃশ্যমান হয়। এটাই তো ইসলামের বিধান। এই লোক গুলো বিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের নামে মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। ইসলাম যেখানে পরিষ্কারভাবে চাঁদ দেখার কথা বলে দিয়েছে সেখানে বিজ্ঞান আর জ্যোতির্বিজ্ঞান কে আনার কি প্রয়োজন? আল্লাহতালা এদের হাত থেকে আমাদের সকল মুসলমানকে রক্ষা করেন।

উক্ত সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি বাইজিদ বিন আনাস, মুফতি ইউশা শফিকী ও মুফতি মহিউদ্দিন। আরো উপস্থিত ছিলেন দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আলহাজ জাফর আহমদ, আলহাজ্ব আনোয়ার পারভেজ, আলহাজ মাহে আলম, আলহাজ লিয়াকত আলী দেওয়ান আরো অনেক সদস্যবৃন্দ।

সর্বশেষ দেশ ও জাতির কল্যাণ কামন করে দোয়ার মাধ্যমে সভা পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন