প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর বার্ষিক উৎসবকেই ঈদ বলে। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ঈদের দিন বললেন, ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ঈদ রয়েছে, আর আজ আমাদের ঈদ’ (বুখারি : ৯৫২; মুসলিম : ৮৯২)। ঈদ আরবি শব্দ। ঈদ মানে ফিরে আসা। যে উৎসব প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসে আরবি ভাষায় তাকে ঈদ বলে। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। ইসলামের রয়েছে দুটি ঈদ : ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা।
ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন সমস্ত উম্মতের জন্য ঈদ ও আনন্দের দিন হওয়ার কারণ হলো, ওইদিন আল্লাহ রোজাদারদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। ফলে যারা গুনাহগার, তারাও নেককারদের দলে শামিল হয়ে যায়। আর ঈদুল আজহার দিন বড় ঈদ হওয়ার কারণ হচ্ছে, এর আগের দিন আরাফার দিন, যেদিন এত বিপুল পরিমাণ লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সারা বছরের আর কোনো দিন এত লোককে মুক্তি দেওয়া হয় না।’ (লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ২৩৭-২৩৮)
ঈদুল ফিতরের আনন্দ মূলত সিয়াম পালনকারীর জন্য। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘রোজাদারের দুটি খুশি : একটি ইফতারের সময়, আরেকটি তার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।’ (বুখারি : ৭৪৯২, মুসলিম : ১১৫১)
ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে সিয়াম পালনকারীর প্রতিশ্রুত প্রতিদান প্রত্যাশার আনন্দ ঈদুল ফিতর– তার পূর্বাপর পাপরাশি ক্ষমা করা হয়েছে, সে রাজাধিরাজ রবের সাক্ষাতে তাঁর কাছ থেকে প্রতিদান গ্রহণ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের জন্য রয়েছে আলাদা তোরণ, ইত্যাদি আরো যেসব প্রতিদানের কথা হাদিস শরিফে ঘোষিত হয়েছে, এক মাস রোজা পালন করে সে এসব কিছু লাভের উপযুক্ত হলো– এই অনুভূতিই মূলত ঈদুল ফিতরের আনন্দের অনুঘটক। কিন্তু মুমিন রোজাদার শাওয়াল মাসের প্রথম দিন যখন এসব অনুভূতি নিয়ে আনন্দ উদযাপন করে তখন হাদিস শরিফে বর্ণিত অন্য একটি সাবধান বাণী তাকে সতর্ক ও শঙ্কিত করে। বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি রমজান পেয়েও তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না সে ধ্বংস হোক।’ (মুস্তাদরাক হাকিম : ৭২৫৬)
রোজাদার একমাস ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে সিয়াম সাধনার তওফিক পেয়েছে। এখন তার মনে প্রতিশ্রুত প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশা– যে রব যথাযথভাবে রমজান পালনের তওফিক দিয়েছেন প্রতিশ্রুত প্রতিদানও তিনি দেবেন! তবু আখিরাতে রবের কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার আশঙ্কা কাটে না– তার সাধনা প্রতিদানের উপযুক্ত হয়েছে তো! রব্বে কারিম তার ইবাদত কবুল করেছেন কি? রোজাদার তাই ঈদ আনন্দে বল্গাহারা হয়ে যেতে পারে না।
এখন আমাদের সমাজে ঈদ উপলক্ষে বল্গাহীন আনন্দে বিজাতীয় অপসংস্কৃতির যে সয়লাব বয়ে যায়, এর মোকাবিলার জন্যই মূলত ঈদ উৎসব। মদিনাবাসীর দুটি আবহমানকালের দেশজ বার্ষিক উৎসব ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতের পর একবার তাদেরকে এ দুটি দিবস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারা বলল, এদিনে আমরা জাহিলিয়াতের সময় থেকে খেলাধুলা, আনন্দ-উৎসব করি। নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের এ দুটির পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন : আজহার দিন ও ফিতরের দিন।’ (আবু দাউদ : ১১৩৪; নাসায়ি : ১৫৫৬)
আখিরাতের অনন্ত জীবনে বিশ্বাসী মুমিনের আর শুধু দুনিয়ার জীবন নিয়ে মজে থাকা অবিশ্বাসীর জীবনাচার, জীবনে আনন্দের উপলক্ষ ও তা প্রকাশের ভাষা এবং পদ্ধতি এক হবে না। মুমিনের প্রকৃত আনন্দের দিন হাশরে আপন রবের কাছ থেকে ডান হাতে আমলনামা প্রাপ্তির দিন, যেদিন সে নিজেকে চিরসফলদের অন্তর্ভুক্ত বলে জেনে নিশ্চিত হবে। তাই আমাদের ঈদ আনন্দ হোক বিশ্বাসী মুমিনের ঈদ আনন্দ, যে আনন্দে খুশি আর সংযম একীভূত থাকে, যে আনন্দে জাতিগত স্বাতন্ত্র্য পরিস্ফুট থাকে।
লেখক : মুহতামিম, দারুস সুন্নাহ একাডেমি আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

