বজ্রপাত ও ঝড়-তুফানে করণীয় আমল

আব্দুস সাত্তার সুমন

বজ্রপাত ও ঝড়-তুফানে করণীয় আমল

আকাশে হঠাৎ করে বিদ্যুতের ঝলকানি, মেঘের গর্জন আর বজ্রপাত এই দৃশ্য মানুষের হৃদয়ে ভয় ও বিস্ময় জাগায়। আধুনিক বিজ্ঞান এর কারণ ব্যাখ্যা করলেও, একজন মুমিনের কাছে এটি শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং আল্লাহর কুদরত, সতর্কবার্তা এবং রহমতের নিদর্শন। এই ভয়াবহ মুহূর্তগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষ কতটা অসহায় আর আল্লাহ কত মহান।

বজ্রপাত কেন হয়

বিজ্ঞাপন

বৈজ্ঞানিকভাবে মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ জমে গিয়ে হঠাৎ নির্গত হলে বজ্রপাত ঘটে। কিন্তু কোরআন আমাদের এ ঘটনাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়—‘তিনিই তোমাদের বিদ্যুৎ দেখান ভয় ও আশার জন্য এবং তিনি ভারী মেঘ সৃষ্টি করেন।’ (সুরা আর-রুম : ২৪) আরো বলা হয়েছে, ‘বজ্র তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করে এবং ফেরেশতারা তাঁর ভয়ে তাসবিহ করে…।’ (সুরা আর-রাদ : ১৩)

অতএব, বজ্রপাত শুধু প্রকৃতির খেলা নয়, এটি আল্লাহর মহিমা ও ক্ষমতার জীবন্ত প্রকাশ।

ঝড়-তুফান ও বজ্রপাতের সময় করণীয়

ঝড়-তুফান বা বজ্রপাতের সময় রাসুল (সা.) আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল শিখিয়েছেন। যথা—

১. আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা

প্রবল বাতাস বা ঝড় শুরু হলে পড়তে হবে এই দোয়া—আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা, ওয়া-খাইরা মা-ফিহা, ওয়া-খাইরা মা উরসিলাত বিহি। ওয়া আউজু বিকা মিন শাররিহা, ওয়া শাররি মা-ফিহা, ওয়া শাররি মা উরসিলাত বিহি।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এই বাতাসের, এর মধ্যকার সবকিছুর এবং এর সঙ্গে যা পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ চাই। আর আমি আপনার কাছে এর অনিষ্ট, এর মধ্যকার সবকিছুর অনিষ্ট এবং এর সঙ্গে যা পাঠানো হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই। (মুসলিম : ৮৯৯)

২. বজ্রের শব্দ শুনলে দোয়া

উচ্চারণ : সুবহানাল্লাজি ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খিফাতিহি।

অর্থ : পবিত্র সেই সত্তা, যার প্রশংসাসহ বজ্র তাসবিহ পাঠ করে এবং ফেরেশতারা তার ভয়ে তাসবিহ করে। (মুয়াত্তা মালিক : ১৭২২)

৩. ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নামাজ ও তওবা করা

হাদিসে এসেছে, যখন নবী (সা.) ভয়াবহ কিছু দেখতেন, তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। (বুখারি : ১০৩৪; মুসলিম : ৯০১) তাই এই সময় বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার, নফল নামাজ ও দান-সদকা করা উচিত।

বজ্রপাত থেকে বাঁচার বাস্তব উপায়

ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিক নয়, বাস্তব জীবনেও সতর্ক হতে শিক্ষা দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রথমে তোমার উটকে বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (তিরমিজি : ২৫১৭)

সুতরাং করণীয় হলো—

১. খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা পানির কাছ থেকে দূরে থাকা।

২. নিরাপদ ঘরে আশ্রয় নেওয়া।

৩. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকা।

৪. ধাতব বস্তু ব্যবহার এড়িয়ে চলা।

অসহায় মানুষদের রক্ষা করার দায়িত্ব

ঝড়-তুফানে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলাম আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে মানুষের জন্য বেশি উপকারী।’ (মুসনাদ আহমাদ : ২৩৪০৫)

আমাদের দায়িত্ব : ১. আশ্রয়হীনদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া। ২. খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া। ৩. ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহযোগিতা করা।

পশুপাখির প্রতি আমাদের দায়িত্ব : ইসলাম শুধু মানুষের নয়, প্রতিটি জীবের প্রতি দয়া করার শিক্ষা দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জীবের প্রতি দয়া করলে সওয়াব রয়েছে।’ (বুখারি : ৬০০৯; মুসলিম : ২২৪৪)

তাই আমাদের যা করণীয় : ১. গবাদি পশু নিরাপদ স্থানে রাখা। ২. পাখিদের সুরক্ষা দেওয়া। ৩. খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা।

বজ্রপাত ও ঝড়-তুফান আমাদের জন্য শুধু ভয় নয়, এটি ঈমানের পরীক্ষা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ। এ সময় একজন মুমিনের উচিত— ১. আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। ২. সহিহ দোয়া ও আমল করা। ৩. প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ করা এবং ৪. অসহায় মানুষ ও প্রাণীর পাশে দাঁড়ানো। তাহলেই এই দুর্যোগ আমাদের জন্য শাস্তি নয়, বরং রহমতে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন