‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়াননিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাকা।’ তালবিয়ার এই ধ্বনি মুখে সারা পৃথিবী থেকে মক্কা অভিমুখে ছুটে চলেছে আল্লাহর মেহমানদের কাফেলা । সর্বোচ্চ যাত্রী অবতরণ করেন জেদ্দা বিমানবন্দরে। আজ আমরা পাঠকদের জন্য তুলে ধরব এর পরিচিতি।
জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঢাকা থেকে ৫২৬৩ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জেদ্দা। এটা সৌদির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর জেদ্দা শহরের ১৯ কিলোমিটার উত্তরে এর অবস্থান। ১৯৭৪ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে এপ্রিল ১৯৮১-এ আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এর আয়তন প্রায় ১০৫ বর্গকিলোমিটার। সব হজ-ওমরাহকারীরা এই বিমানবন্দর হয়ে মসজিদে হারামে যাতায়াত করেন। যাত্রীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বৃহদাকার চারটি টার্মিনাল আছে। দক্ষিণ টার্মিনাল, উত্তর টার্মিনাল, হজ টার্মিনাল ও সৌদির রাজকীয় টার্মিনাল।
দক্ষিণ টার্মিনাল : সব ধরনের যাত্রীদের জন্য এটি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল। ঘণ্টায় ২৫০০ যাত্রীর সেবার ব্যবস্থা আছে এখানে। এই টার্মিনালের ৪০টি গেট আছে। এখান থেকে মক্কা ও মদিনাগামী হাইওয়ে সবসময় সচল থাকে। উত্তর টার্মিনাল : এটি অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল। তাছাড়া হজের মৌসুমে হজযাত্রীদের সেবায় নিয়োজিত বিমান কর্তৃপক্ষের জরুরি কাজেও ব্যবহৃত হয়। এর ১৪টি গেট রয়েছে।হজ টার্মিনাল : এটা হজ-ওমরাহকারীদের জন্য বিশেষ টার্মিনাল। এর নির্মাণশৈলী কিছুটা ব্যতিক্রম। যেন এটা পাঁচটি তাঁবুর সমন্বয়। ছাদগুলো তৈরি কাচ জাতীয় মজবুত প্লাস্টিক দিয়ে। প্রত্যেকটা ছাদে ১৫টি করে আকর্ষণীয় গম্বুজ আছে। এগুলোর আয়তন ৪৬৫০০০ বর্গমিটার। হজ মৌসুমে প্রতিদিন শুধু এই টার্মিনালে ৫০০০০ হাজিকে অভ্যর্থনার ব্যবস্থা আছে। রাজকীয় টার্মিনাল : বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহ, গণ্যমান্য ব্যক্তি, দেশের শাসকগোষ্ঠী ও বিশেষ মেহমানদের জন্য ব্যবহৃত টার্মিনাল। এছাড়া সৌদিতে অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জন্য ছোট-বড় ৩২টি বিমানবন্দর আছে।
ঐতিহাসিক জেদ্দা নগরী
বন্দরনগরী জেদ্দা থেকে মক্কা ৭২ কিলোমিটার ও মদিনা ৪২০ কিলোমিটার। জেদ্দা শব্দের তিনটি উচ্চারণ আছে। জেদ্দা, জুদ্দা ও জাদ্দা। জেদ্দা ও জুদ্দা অর্থ সমুদ্রসৈকত, জাদ্দা অর্থ দাদি-নানি। বলা হয়, সব মানুষের বাপ-মায়ের মা আদিমাতা হজরত হাওয়া (আ.)-কে জেদ্দা শহরের প্রসিদ্ধ এলাকা আমারিয়ার কবরস্থান ‘মাকবারাতু উম্মিনা হাওয়া’-এ দাফন করা হয়েছে। তাই এ শহরকে জাদ্দা বলা হয়। মক্কার জেদ্দা শহর সৌদির বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক রাজধানী। রিয়াদের পরে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরসহ প্রাচীন বেশ কিছু মসজিদ রয়েছে এখানে। মসজিদে শাফেয়ি, মসজিদে ওসমান বিন আফফান, মসজিদে পাশা, মসজিদে মামার, হানাফি জামে মসজিদ, মসজিদে জাফালি প্রভৃতি অন্যতম।
ইতিহাসের আঁতুড়ঘর হেজাজ
এশিয়া মহাদেশের আরব উপদ্বীপ সাতটি ভূখণ্ডে বিভক্ত। হেজাজ, নাজদ, ওরুজ, ইয়েমেন, তিহামা, ওমান ও আহকাফ। পবিত্র মক্কা নগরির বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর কাবা তিহামা রাজ্যের অন্তর্গত এবং প্রিয়নবী (সা.)-এর হিজরতভূমি মদিনা হেজাজে অবস্থিত। বর্তমানে আরব উপদ্বীপে বড় বড় সাতটি দেশ গড়ে উঠেছে। সৌদি আরব, ইয়েমেন, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এগুলোকে বলা হয় এশীয় মধ্যপ্রাচ্য।
বিশ্ব মুমিনের কেবলা মক্কা মোকাররমা
সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত হেজাজের মক্কা মোকাররমা। এটি মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র তীর্থভূমি। সেখানে আছে মসজিদে হারাম, কোরআন নাজিলের মাঠ-ময়দান-মরু-পাহাড়-গ্রাম। সেখানকার আকাশ-বাতাসে মিশে আছে কাফেরদের নির্যাতনের শিকার সাহাবা কেরামের কান্নাধ্বনি। আছে তাদের রক্তকণিকার টান, রূপ-রস-তকের ঘ্রাণ, হৃদয়ের আহ্বান, মহান প্রভুর হাজারো দান-অবদান। মক্কাকে বলা হয় মসজিদে হারাম, বাক্কা, উম্মুল কুরা, বায়তুল আতিক, মায়াদ, আলবালাদ, আলবালাদুল আমিন, করিয়া, ওদি, তিহামা প্রভৃতি।
নামাজের কেবলা পবিত্র কাবাঘর বায়তুল্লাহ। সেদিকে ফিরে মুসলমানরা নামাজ আদায় করেন। মদিনা মুনাওয়ারা থেকে ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণে মক্কা। তায়েফ থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, সৌদির সবচেয়ে বড় বন্দরনগরী জেদ্দা ও লোহিত সাগর থেকে ৭২ কিলোমিটার পূর্বে এর অবস্থান।
হজরত নুহের মহাপ্লাবনের পর সর্বপ্রথম হজরত ইবরাহিম (আ.) সপরিবারে মক্কায় এসেছিলেন। তখনই সূচিত হয়েছে ইবরাহিমি পরিবারের বসতি। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইয়েমেনের জুরহুম ও আমালেকা সম্প্রদায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭৭ মিটার উচ্চতায় পবিত্র মক্কানগরী। আয়তন প্রায় ৮৫০ বর্গকিলোমিটার। বসবাসযোগ্য ৮৮ বর্গকিলোমিটার, বাকি এলাকা পাহাড়-পর্বত, মরুপ্রান্তর। ছয় বর্গকিলোমিটার আয়তনের মসজিদে হারাম পবিত্র মক্কার প্রাণকেন্দ্র। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নেকির উদ্দেশ্যে পৃথিবীর মোট তিনটি মসজিদ জিয়ারত করা যেতে পারে। মক্কার মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি ও জেরুসালেমের মসজিদে আকসা।’ (বুখারি : ১১৮৯)
লেখক : ইমাম ও খতিব
টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন পুরোনো জামে মসজিদ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

