বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

ইসলাম শিশুশ্রম সমর্থন করে না

নূর মুহাম্মদ রাহমানী

ইসলাম শিশুশ্রম সমর্থন করে না
প্রতীকী ছবি

আজ (১২ জুন) জাতীয় শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। ‎উপার্জন করতে গিয়ে শিশুর বিপদ, ঝুঁকি, শোষণ ও বঞ্চনার সম্মুখীন হলে সে কাজকে শিশুশ্রম বলা হয়। ‘‎বাংলাদেশের জাতীয় শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)’ অনুযায়ী, কাজে নিয়োগের সর্বনিম্ন বয়স ১৪ বছর। তবে ১২ থেকে ১৪ বছরের শিশুরা হালকা কাজে নিয়োজিত হতে পারবে, যদি তাদের শিক্ষা ও বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত না হয়। তবে হালকা কাজের সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করা হয়নি। দেশে এ ধরনের আইন থাকার পরও ‘জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২’-এর ফল অনুযায়ী, দেশে এখন ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ জন শিশুশ্রমিক আছে। ২০ লাখ ১০ হাজার শিশুশ্রমিক পারিশ্রমিক পায় না। যারা পারিশ্রমিক পায়, তাদের গড় আয় মাসে ৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। ‎সরকারি হিসাবমতে, বাংলাদেশের এমন ৩৮টি সেক্টর চিহ্নিত, যেখানে প্রায় ১৭ লাখেরও বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত।

‎ইসলামও শিশুশ্রম সমর্থন করে না। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত বাবার ওপর তার সবকিছুর জিম্মাদারি। এ বয়সটাতে সে পরনির্ভরশীল, দায়িত্ববান নয়। ফলে তাকে কোনো কাজ চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা বাকারা : ২৮৬)। বোঝা গেল, শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক মননশীলতা পরিপন্থী কোনো কাজ চাপিয়ে দেওয়া নিতান্তই বাড়াবাড়ি। ‎আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-ও শিশুদের প্রতি কঠোরতার বিরোধিতা করেছেন এবং তাদের প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা শিশুদের স্নেহ করো, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো এবং সদাচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।’ (তিরমিজি)

বিজ্ঞাপন

মহান আল্লাহর দয়া পেতে চাইলেও শিশুদের প্রতি দয়ার বিকল্প নেই। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।’ (বুখারি : ৫৯৯৭)। ছোটদের প্রতি সদয় হয় না, এমন লোক নবীজির উম্মত হতে পারে না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের শ্রদ্ধা করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ : ৪৯৪৩)। শিশুরা হলো পরিবারের সৌন্দর্য। শিশু ছাড়া কোনো পরিবার অন্তঃসারশূন্য। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।’ (সুরা আল-কাহ্ফ : ৪৬)। ‎কাজ করার জন্য তো শক্তি-সামর্থ্যের প্রয়োজন। আর একটি শিশুর তা থাকে না। ‎বলা হয়, ‘আজকের শিশু আনবে আলো, বিশ্বটাকে রাখবে ভালো।’ শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষা না দিয়ে অঙ্কুরেই যদি তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কীভাবে তারা আলো নিয়ে আসবে আমাদের মাঝে। বিষয়টা নবীজির বাণী দ্বারাও প্রমাণিত। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞান দান করো, কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট।’ (মুসলিম)

মনে রাখতে হবে, আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। এজন্য তাদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সঠিক শিক্ষাদীক্ষা জরুরি। তাই প্রয়োজন অনুভূত হলে এবং তার মধ্যে সে যোগ্যতা থাকলে তাকে কোনো শিল্প শেখানো এবং তরবিয়াতের জন্য কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে বসানো ভালো বৈ মন্দ নয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা এতিমের দায়িত্বশীলদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর তোমরা এতিমদের পরীক্ষা কর যতক্ষণ না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। সুতরাং যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্বতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধনসম্পদ তাদের দিয়ে দাও।’ (সুরা নিসা : ৬)

আবার অনেক সময় কতিপয় শিশুর পড়ার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকে না। তখন অভিভাবকরা তাকে শক্ত কোনো কাজে লাগিয়ে দেন, যেন কাজের কষ্ট সইতে না পেরে আবার পড়ার টেবিলে ফিরে আসে। এ ধরনের মহৎ উদ্দেশ্য থাকলে তাদের কোনো পেশা শেখানোর জন্য কারো কাছে কাজে দেওয়ার অনুমতি আছে। তবে এর জন্যও নিম্নোক্ত শর্তগুলো মেনে চলতে হবে—

‎১. শিশুর বয়স এতটুকু হওয়া যাতে তার শরীর এই পেশাটা শেখা এবং কাজ সইতে পারে। বয়সের সীমারেখা শিশুর মেজাজ, অঞ্চল ও কাল হিসেবে ভিন্ন হতে পারে। তাই যে শিশু কাজ করা এবং শ্রম দেওয়ার উপযুক্ত নয়, তাকে দিয়ে কাজ করানো জায়েজ নয়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫৬২) ‎২, শিশুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো পেশা ও কাজে লাগানো যাবে। ছেলেদের জন্য তাদের উপযুক্ত কাজ এবং মেয়েদের জন্য তাদের উপযুক্ত কাজ নির্বাচন করতে হবে। যেমন মেয়েদের জন্য সেলাই কাজ ইত্যাদি কোনো হালকা কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫৬২; রদ্দুল মুহতার : ৩/৬১২) ‎

৩. যেখানে ছেলে কিংবা মেয়েশিশু কাজ করবে, সেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যে জায়গায় কিংবা যে কাজে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকবে, সেখানে তাদের কাজে লাগানো যাবে না। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৫৬৯)

‎৪. শ্রম বিনিয়োগ করে শিশু যে অর্থকড়ি উপার্জন করবে, তা তার ব্যক্তিগত খাতে খরচ করতে হবে। তার প্রয়োজনীয় খাতে খরচের পর অতিরিক্ত টাকা-পয়সা তার বাবা কিংবা তার অভিভাবকের কাছে আমানত থাকবে। গ্রহণযোগ্য অভিভাবক না থাকলে আদালত কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির কাছে তার উপার্জনের টাকা আমানত রাখবে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫৬২)

‎৫. শিশুকে কাজে দেওয়ার কারণে তার শিক্ষাদীক্ষায় ব্যাঘাত না ঘটতে হবে। যদি তাকে কাজে লাগানোর কারণে পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে যায়, কিংবা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তাকে কাজে লাগানো জায়েজ হবে না। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫৬২) ‎

৬. শিশুকে যে কাজে লাগানো হবে, সেটা তার মেধা, চরিত্র ও শারীরিক প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকারক না হতে হবে। ‎

৭. শিশুকে শ্রম দেওয়ার জন্য তার ওলি কিংবা অভিভাবকের সম্মতি জরুরি। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৭৬)। ‎তাই এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, যে সমঝদার কিন্তু পড়াশোনায় আগ্রহী নয়, তাকে অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষে শ্রমের সুযোগ দেওয়া শরিয়তে জায়েজ। কিন্তু যদি শিশু সমঝদার না হয়, কিংবা পড়াশোনায় আগ্রহী এবং অভিভাবকের পড়ানোর সামর্থ্য আছে, তাহলে এমন শিশুদের শ্রমে দেওয়া কিছুতেই উচিত হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন