মৃত্যু মানুষের চূড়ান্ত নিয়তি। জীবন আছে তো মৃত্যু অবধারিত। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষ আরেক জীবনে পৌঁছে যায়। দুনিয়ার জীবনের পাশাপাশি রয়েছে আরেকটি জীবন, যে জীবনের শুরু আছে, শেষ নেই। আখিরাতের অনন্ত জীবন। অন্তহীন জীবনের সফলতা নির্ভর করে ঈমান ও আমলে সালেহ, তথা নেক বা ভালো কাজের ওপর। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছু আমল জারি থাকে আর এমন কিছু আমল আছে, যা জীবিতরা করলে মৃত মানুষের জন্য উপকারে আসে।
নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে চারটি বিষয়ের সওয়াব মানুষের মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে, তা হলো— ১. আল্লাহর রাস্তায় সীমান্ত পাহারা; ২. ব্যক্তির এমন (মাসনুন) আমল, যা অন্যরাও অনুসরণ করে; ৩. এমন সদকাহ, যা সে স্থায়ীভাবে জারি করে দিয়েছে; ৪. এমন নেক সন্তান রেখে যাওয়া, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহুত তারগিব : ১১৪)
অন্য একটি হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো মানুষ মারা যায়, তখন তার তিনটি আমল ছাড়া সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। ১. সদকাহে জারিয়াহ; ২. উপকারী ইলম এবং ৩. সৎ সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম : ১৬৩১)
এগুলো ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত নিজে জীবদ্দশায় করে যাওয়া আমলের উপকারিতা পাওয়ার আমল। এ ছাড়া ইসলাম মানুষের মৃত্যুর পর এমন কিছু আমলের সুযোগ দিয়েছে, যা মৃতদের পক্ষে নিয়ত করে করলে তার সওয়াব তারা পাবে। সে আমলগুলোর বিবরণ উল্লেখ করছিÑ
১. দোয়া করা
দোয়া মৃত মানুষের জন্য খুবই উপকারী আমল। দোয়া মৃত মানুষের মুক্তি ও মর্যাদাপ্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করে। জীবিতদের ওপর দায়িত্ব হলো মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা। দোয়াকে হাদিসে ইবাদত বলা হয়েছে।
২. সদকাহ বা দান
মৃত বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের দান বা সদকাহ করা খুবই সওয়াবের কাজ। দানের সওয়াব আল্লাহতায়ালা তাদের আমলনামায় যুক্ত করে দেন। সদকাহকারী নিজেও এর সওয়াব লাভ করেন। ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘সা’দ ইবনু ওবাদাহ (রা.)-এর মা মারা গেলে তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমার মা আমার অনুপস্থিতিতে মারা যান। আমি যদি তার পক্ষ থেকে কিছু সদকাহ করি, তাহলে কি তার কোনো উপকারে আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সা’দ (রা.) বললেন, তাহলে আমি আপনাকে সাক্ষী করছি, আমার মিখরাফ নামক বাগানটি তার জন্য সদকাহ করলাম।’ (বুখারি : ২৭৫৬)
সদকাহ একটি ব্যাপক বিষয়। ইসলাম প্রচার, প্রসারের জন্য দান করা, জনকল্যাণমূলক স্থায়ী কিছু করে দেওয়া, গরিব-মিসকিনকে দান করা, মসজিদ নির্মাণ করা, মসজিদ-মাদরাসায় দান করা। দরিদ্র অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা, ঘরহীনকে বাড়ি বানিয়ে দেওয়া, নিরন্ন-ক্ষুধার্তকে খাবার প্রদান ইত্যাদি খাতে সদকাহ করা যেতে পারে। দান করার সামর্থ্য না থাকলে দোয়া করবে। দোয়া তার জন্য যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।
৩. অসিয়ত পালন করা
অসিয়ত হলো কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর কোনো কিছু করার নির্দেশনা প্রদান। আমানত পৌঁছে দেওয়া, সম্পদ দান করা, মেয়ে বিয়ে দেওয়া, মৃতব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ বণ্টন করা ইত্যাদি অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে যে, যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হবে, যদি সে কোনো সম্পদ রেখে যায়, তবে তা অসিয়ত করবে।’ (সুরা আল-বাকারাহ : ১৮০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম ব্যক্তির উচিত নয় যে, তার অসিয়তযোগ্য কিছু রয়েছে আর সে দুরাত কাটাবে অথচ তার কাছে তার অসিয়ত লিখিত থাকবে না।’ (মেশকাত : ৩০৭১) অসিয়ত লিখিত ও মৌখিক দুভাবেই করা যায়।
৪. মানত পূরণ করা
বাবা-মা বা মৃতের কোনো বৈধ মানত থাকলে তা আদায় করা ওয়ারিশদের জন্য আবশ্যক। তারা আদায় করলে মৃত ব্যক্তি দায়মুক্ত হবেন।
৫. কাফফারা আদায় করা
বাবা-মায়ের ওপর কোনো কাফফারা থাকলে সন্তান তা আদায় করবে। সেটা কসমের কাফফারা হোক বা ভুলবশত হত্যার কাফফারা বা যেকোনো ফরজ ইবাদতের কাফফারা হোক। কারণ এগুলো বাবা-মায়ের ঋণের অন্তর্ভুক্ত। আর বাবা-মায়ে ঋণ পরিশোধ করা সন্তানের দায়িত্ব। এতে যেমন বাবা-মা দায়মুক্ত হবেন, তেমনি সওয়াবও পাবেন।
৬. ঋণ শোধ করা
বাবা-মায়ের ঋণ থাকলে সন্তানরা সর্বপ্রথম তাদের ঋণ পরিশোধ করবে। কারণ ঋণ এমন এক বোঝা, যা ঋণদাতা ছাড়া কেউ হালকা করতে পারবে না। সে জন্য বাবা-মায়ের যাবতীয় সম্পদ দ্বারা হলেও তাদের ঋণ পরিশোধ করবে। সামর্থ্য না থাকলে ঋণদাতার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেবে। মাফ না করলে ধনী ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিয়ে হলেও তা পরিশোধ করার চেষ্টা করবে। কারণ ঋণ মাফ হবে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তির রুহ তার ঋণের কারণে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।’ (ইবনে মাজাহ : ২৪১৩)
৭. সিয়াম আদায় করা
মৃত ব্যক্তি ফরজ সিয়াম বাকি থাকলে তা আদায় করা বা ফিদিয়া প্রদান করা ওয়ারিশদের জন্য আবশ্যক। ওয়ারিশরা আদায় করলে মৃতব্যক্তি দায়মুক্ত হবেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সিয়ামের কাজা জিম্মায় রেখে যদি কোনো ব্যক্তি মারা যায়, তাহলে তার নিকটাত্মীয় তার পক্ষ থেকে সিয়াম আদায় করবে।’ (বুখারি : ১৯৫২)
৮. ফরজ হজ
সামর্থ্যবান মৃত ব্যক্তি ফরজ হজ আদায় না করে থাকলে, তা আদায় করা ওয়ারিশদের জন্য আবশ্যক। ওয়ারিশরা আদায় করলে মৃতব্যক্তি দায়মুক্ত হবেন।
৯. কবর জিয়ারত
মৃত মানুষের জন্য কবর জিয়ারত করা যায়। রাসুল (সা.) নিজে বাকি আল-গারকাদ কবরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত করেছেন। তিনি কবর জিয়ারতের দোয়াও শিখিয়েছেন। দোয়াটি এ রকম : আসসালামু ‘আলা আহলিদ দিয়ারি মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিনা ওয়া ইয়ারহামুল্লাহুল মুস্তাক্বদিমিনা মিন্না ওয়াল মুস্তাখিরিনা ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লালাহিকুন। অর্থ : ‘মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীর ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের অগ্রবর্তী ও পরবর্তীদের ওপর আল্লাহ রহম করুন! আল্লাহ চাইলে তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সঙ্গে মিলিত হতে যাচ্ছি।’ (মুসলিম : ৯৭৪)
এছাড়া মৃত মানুষের পক্ষ থেকে নফল নামাজ পড়া ও নফল রোজা রাখা এবং ওমরাহ করা যায়। নবী (সা.) বলেন, ‘সদাচরণ হলো তোমার নামাজের সঙ্গে তাদের পক্ষ থেকে নামাজ পড়া, রোজার সঙ্গে তাদের পক্ষ থেকে রোজা রাখা এবং ওমরাহ করা।’ (ইবনে আবি শাইবা : ১২০৮৪-৮৫)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

