ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসংহত জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা বান্দার সুবিধার্থে সব ইবাদতকে সমানভাবে বাধ্যতামূলক না করে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করেছেন, যার মধ্যে ফরজ ও নফল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পর্যাপ্ত দ্বীনি জ্ঞানের অভাবে আমরা অনেক সময় ফরজের তুলনায় নফলকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তাই ইবাদতের সঠিক ক্রম ও মর্যাদা সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ফরজ ইবাদত বলতে সেসব আবশ্যক আমলকে বোঝানো হয়, যা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব ইবাদত পালন না করলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করলে তা মারাত্মক গোনাহের কারণ হয়। ফরজ ইবাদতের মধ্যে রয়েছে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত, রমজান মাসের রোজা, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে জাকাত আদায় এবং সামর্থ্য থাকলে জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা। এগুলো ইসলামের মূল ভিত্তির অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর ওপর একজন মুসলিমের ঈমানি ও আমলি জীবন দাঁড়িয়ে থাকে।
অন্যদিকে নফল ইবাদত হলো সেই সব আমল, যা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় আদায় করা হয়। এগুলো পালন করলে সওয়াব পাওয়া যায়, কিন্তু না করলে গোনাহ হয় না। নফল সালাতের মধ্যে তাহাজ্জুদ, ইশরাক, আওয়াবিন, সালাতুত তাসবিহ ইত্যাদি রয়েছে। নফল রোজার মধ্যে আরাফার দিনের রোজা, আশুরার রোজা, শাবান মাসের রোজা এবং সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া কোরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা ও দান-সাদকা করাও গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
নফল ইবাদতের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই; বরং নফল ইবাদতের মাধ্যমেই একজন বান্দা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নৈকট্য অর্জন করে। যেমন হাদিসে এসেছে— রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা ফরজ আমল দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে। এরপর সে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার আরো কাছাকাছি হয়, এমনকি আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে; চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে; পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে যদি কিছু চায়, আমি তা দান করি। যদি আশ্রয় চায়, আমি তা প্রদান করি।’ (বুখারি : ৬৫০২)
কিন্তু এই হাদিসকে কেন্দ্র করেই আমাদের সমাজে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন, ফরজ আদায় না করলেও বেশি বেশি নফল ইবাদত করলে আল্লাহ তা ফরজের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করে নেবেন। বাস্তবে এই ধারণার কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই।
উদাহরণস্বরূপ, অনেককে দেখা যায় ফরজ নামাজে অবহেলা করে শবে বরাত বা শবে কদরের রাতের নফল নামাজে বিশেষ আগ্রহ দেখাতে। আবার কেউ রমজানের ফরজ রোজা পূর্ণ না রেখে শাওয়ালের নফল রোজা পালন করেন। জাকাতের ক্ষেত্রে ফরজ হিসাব না করে দান-সাদকা দিয়ে দায় সেরে নেওয়ার প্রবণতাও ব্যাপক। এমনকি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফরজ হজ আদায় না করে বারবার ওমরাহ পালন করাকেও কেউ কেউ যথেষ্ট মনে করেন। অথচ ওমরাহ একটি নফল ইবাদত হলেও সামর্থ্যবানদের জন্য জীবনে একবার হলেও হজ করা ফরজ। আর এটি কোনোভাবেই নফল দ্বারা প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়।
ইসলামের শিক্ষা হলো— প্রথমে ফরজ আদায়, এরপর নফল। ফরজ আমলে কোনো ত্রুটি বা ঘাটতি থাকলে আল্লাহ তাআলা তার অনুগ্রহে নফল আমলের মাধ্যমে তা পূর্ণ করে দিতে পারেন। কিন্তু ফরজই যদি আদায় না করা হয়, তাহলে নফলের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরা যাক কোনো পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর ১০০। কেউ যদি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৮০ নম্বর পায়, বাকি ২০ নম্বর বাড়তি কাজ দেখে দেওয়া হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি পরীক্ষাতেই অংশ নেয়নি, তার অতিরিক্ত কাজের কোনো মূল্যায়নই হবে না। ফরজ ও নফল ইবাদতের সম্পর্কও ঠিক তেমনই।
তাই ফরজ পরিত্যাগ করে নফল আদায় করা উচিত নয়, কারণ রাসুল (সা.)-এর বাণী— ‘তুমি স্বেচ্ছায় ফরজ নামাজ ত্যাগ কোরো না। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করে, তার থেকে আল্লাহর জিম্মাদারি উঠে যায়।’ (ইবনু মাজাহ : ৪০৩৪)। অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমাদের ও কাফেরদের মধ্যে ব্যবধান শুধু নামাজের। যে নামাজ ত্যাগ করল, সে কাফের হয়ে গেল।’ (তিরমিজি : ২৬২১)
এখানে মূলত ফরজ নামাজের কথা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ফরজ নামাজ ত্যাগ করল, তাকে কুফরির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। অথচ নফল দ্বারা এমন ফরজ আমরা পরিপূর্ণ করতে চাই। অতএব, একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো আল্লাহ তাআলার বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা, ফরজ ও নফল ইবাদতের পার্থক্য অনুধাবন করা এবং আমলের ক্ষেত্রে সঠিক অগ্রাধিকার বজায় রাখা। নিজে জানার পাশাপাশি অন্যদেরও এই ভুল ধারণা থেকে সংশোধন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

