নারী ফুটবলে নবজাগরণের ঢেউ

নারী ফুটবলে নবজাগরণের ঢেউ

ঢাকার সকাল। ভোর সাড়ে ৫টা। সবে আলো ফুটতে শুরু করেছে রাজধানীর বুকে। বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার পাশেই এসে থামল একটি বাস। একে একে নামছেন কৈশোরের আভা পেরিয়ে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে জেগে ওঠা একদল মেয়ে। বেণী করে বাঁধা চুল, কাঁধে বুট ঝোলানো আর চোখে-মুখে একরাশ স্বপ্ন। সবাই প্রাণোচ্ছ্বল। ঘুম যেন উবে গেছে। বাংলাদেশের নারী জাতীয় ফুটবল দলের জন্য এমন ঘটনা রুটিন হয়ে গেছে। সকাল সকাল উঠে অনুশীলন। সামনে যে স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাস লেখার সুযোগ, নষ্ট করার মতো সময় নেই। শত আঁধার পেরিয়ে, নবজাগরণের গল্প লিখে ৬৪ হাজার বর্গমাইলের যে মেয়েগুলো প্রথমবার পা রেখেছে এএফসি এশিয়ান কাপের মঞ্চে! ইতিহাস গড়া এই দলটির নেতৃত্বের গৌরব বয়ে বেড়াচ্ছেন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় আফঈদা খন্দকার।

আঠারোয় পা দেওয়া আফঈদা শান্তশিষ্ট এবং সাহসী মনোবলের অধিকারী। তার নেতৃত্বেই এলোমেলো একটি দল নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে এশিয়ার মূল লড়াইয়ে। গর্ব নিয়ে আফঈদা বলেন, ‘আমি চাই আমাদের মেয়েরা তাদের উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি পাক। অবশ্য আমাদের সাম্প্রতিক জয় সেটাই করেছে। কিন্তু আমাদের এই তো কেবল শুরু। আমরা বিশ্বকে দেখাতে চাই- বাংলাদেশ আসলে কী করার সামর্থ্য রাখে।’

বিজ্ঞাপন

২০২৬ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তিন ম্যাচে ১৬ গোল দিয়েছে বাংলাদেশ; বিপরীতে হজম করেছে মাত্র একটি। বাহরাইনকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর শক্তিশালী মিয়ানমারকে ২-১ গোলে এবং তুর্কমেনিস্তানকে ৭-০ গোলের বন্যায় ভাসিয়ে তিন ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষে থেকে বাছাই শেষ করে লাল-সবুজের সারথিরা। আগামী বছর জাপান, চীন ও দ. কোরিয়ার মতো দলের সঙ্গে খেলবে। সেখানে শীর্ষে থাকতে পারলে মেয়েরা বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে, এমনকি অলিম্পিক গেমসে খেলার স্বপ্নও হাতছানি দিচ্ছে আফঈদার দলের সামনে- যা দেশের ফুটবলে হতে পারে বিরাট এক মাইলফলক। ফিফা র‍্যাংকিংয়েও বড় লাফ দিয়েছে বাংলাদেশ। ২৪ ধাপ এগিয়ে এখন অবস্থান করেছে ১০৪ নম্বরে, যা সবশেষ র‍্যাংকিংয়ে সবচেয়ে বড় উন্নতির ছাপ।

এশিয়ান কাপের পর ফিফা র‍্যাংকিংয়ে এমন সাফল্য পেয়ে আফঈদা দেখালেন আশার আলো, ‘এই অর্জন কেবল আমাদের নয়; এটা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মেয়ের, যারা স্বপ্ন দেখার সাহস করে। বিশ্বাস, অধ্যবসায় ও একতা দিয়ে কী অর্জন করা যায়- এটা তারই প্রমাণ। আমরা এখানে থামছি না। পরবর্তী কয়েক মাসের প্রস্তুতি হবে কঠিন; কিন্তু আমরা চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত।’

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা সাতক্ষীরার মেয়ে আফঈদা। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আফঈদার আইডল ছিলেন তার বাবা। তার বাবাও ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন। একসময় জেলা পর্যায়ে খেলতেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও খেলার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা মেনে পরিবারের কষ্ট লাঘব করতে স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে পাড়ি জমান দেশের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে কিছুদিন থেকে ফিরে এসে সঞ্চয় ভেঙে ব্যবসা শুরু করেন এবং স্থানীয় শিশুদের জন্য একটি অপেশাদার ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে আফঈদা এবং তার বড় বোন আফরা ছিলেন বাবার প্রথম শিষ্য।

বাবার স্বপ্ন ও দুই মেয়ের পরিশ্রমের গল্প অবশ্য বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ১১ বছর বয়সে আফঈদা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের জাতীয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের জন্য নির্বাচিত হন। তার বড় বোন আফরা ফুটবল ছেড়ে অবশ্য মনোনিবেশ করেন বক্সিংয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলেছেন আফরা।

আফঈদা ও তার দলের এমন সাফল্যের পেছনের মূল নায়ক পিটার বাটলার। ব্রিটিশ এই কোচ মেয়েদের এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে, তারা আন্তর্জাতিকভাবে সেরা হওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় খেলবে বাংলাদেশ নারী দল। এবার হয়তো কিছু স্বপ্ন তাদের ভাবনার চেয়েও দ্রুত পূরণ হতে চলেছে।

তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন