বিশ্বকাপে দলগুলোর প্রথম ম্যাচে একটি ছবি বেশ স্পষ্ট হলো।
লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ম্যাচসেরা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হ্যালান্ড, হ্যারি কেন—প্রজন্মের অন্য সেরা স্ট্রাইকাররাও গোল করে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যেন পুরো ম্যাচজুড়েই ছিলেন নিজের ছায়া।
কিংবদন্তিদের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষের নাম আর কিছু নয়- সময়। সে লড়াইয়ে সবাই একদিন হার মানে। পার্থক্য শুধু কে কখন সেই বাস্তবতাকে মেনে নেয়। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কি সে সত্যটা এখনো মেনে নিতে পারেননি?
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্র শুধু পর্তুগালের জন্য হতাশার নয়, রোনালদোর জন্যও ছিল নির্মম সত্য প্রকাশের এক আয়না। ৪১ বছর বয়সে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে পুরো ৯০ মিনিটে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ, তিনটি শট- তাও আবার টার্গেটে একটিও নয়। অথচ তিনি দলের ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলছেন। পুরো ম্যাচে নিজে কোনো সুযোগ তৈরি করেননি, প্রেসিংয়ে ছিলেন নিষ্ক্রিয়, রক্ষণে অবদান ছিল না বললেই চলে। নিজের অর্ধে পা রেখেছেন মাত্র দুবার! অথচ মাঠে ছিলেন শেষ বাঁশি পর্যন্ত।
প্রশ্ন হলো—কেন?
এই পর্তুগাল কি এখনো রোনালদোকে নিয়ে খেলছে, নাকি রোনালদোর জন্য খেলছে? তিনি দলকে টানছেন, নাকি তিনিই এখন দলের বোঝা, ক্যারিং ব্যাগ!
কঙ্গো ম্যাচে সিআর সেভেনের পারফরম্যান্সের সবচেয়ে হতাশাজনক দিক ছিল চলাফেরা। নির্দিষ্ট একটি জোনের বাইরে তাকে খুব কমই দেখা গেছে। প্রতিপক্ষের বক্সে দাঁড়িয়ে সুযোগের অপেক্ষা করেছেন; কিন্তু নিচে নেমে মিডফিল্ডের সঙ্গে সংযোগ তৈরি, প্রেসিং কিংবা ডিফেন্সকে সহায়তা—আধুনিক স্ট্রাইকারের মৌলিক কাজগুলোর প্রায় কোনোটিই করেননি। বল পেয়েও সহজভাবে দখল হারিয়েছেন, সতীর্থদের তৈরি করা সুযোগ নষ্ট করেছেন। একজন ফরোয়ার্ড প্রতিপক্ষের সীমানায় দাঁড়িয়ে বল ঠিকমতো ট্যাপিংও করতে পারছেন না, এরচেয়ে হতাশার বিষয় আর কি হতে পারে?
ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই যেন রোনালদোকে অকার্যকর অস্ত্র মনে হয়েছে। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে তার সতীর্থরাও ম্যাচে একসময় যেন তাকে ছাড়াই লড়াইয়ের চিন্তায় নামলেন। মনে হয়েছে পর্তুগালের আক্রমণ যেন তাকে ঘিরে নয়, তাকে পাশ কাটিয়েই এগোতে চাইছে। কয়েকটি মুহূর্তে এমন ধারণাও হয়েছে যে, সতীর্থরা নিশ্চিত পাসের বদলে অন্য বিকল্প খুঁজছেন। ব্রুনো ফার্নান্দেজের শরীরী ভাষায় সেটা যেন আরো স্পষ্ট হলো। বাস্তবতা যা-ই হোক, একজন অধিনায়কের জন্য এমন ধারণা যথেষ্ট অস্বস্তিকর।
সব মিলিয়ে দৃশ্যটি এমন ছিল, যেন পর্তুগাল ১০ জন নিয়ে খেলছে। একাদশে রোনালদোর উপস্থিতি ছিল, কিন্তু প্রভাব ছিল না।
রোনালদো একসময় ছিলেন পর্তুগালের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আজ প্রশ্ন উঠছে, সেই অস্ত্রই কি ভোঁতা হয়ে গেছে! আধুনিক ফুটবলে একজন ফরোয়ার্ডের মূল্য শুধু গোলে নয়; প্রেসিং, গতি, স্পেস তৈরি, প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখা—সবকিছু মিলিয়েই তার কার্যকারিতা বিচার হয়। এ জায়গাগুলোতে রোনালদো ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন।
কঠিন হলেও প্রশ্নটা করতেই হয়—এখন কি সময় এসে গেছে নিজেকেই সত্যটা বলার? সব মহান খেলোয়াড়ের জীবনেই এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন বলতে হয় ‘আমি আর আগের মানুষটি নই’। হয়তো রোনালদোরও বলা উচিত ‘দলের স্বার্থটাই আগে। যদি আমি আর সে পর্যায়ে না থাকি, তাহলে অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়াই ভালো।’
হয়তো এখন সময় এসেছে পর্তুগালের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়দের একজনকে সম্মান জানানোর সবচেয়ে ভালো উপায় সব সময় তাকে মাঠে রাখা নয়; বরং দলকে জেতানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর একাদশ বেছে নেওয়া।
এখন সব চোখ কোচ রবার্তো মার্তিনেজের দিকে। পরের ম্যাচেও কি তিনি শুধুই নামের ভারে রোনালদোকে একাদশে রাখবেন, নাকি সাহস দেখিয়ে নতুন কাউকে সুযোগ দেবেন?
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কোচ যেন ভয় পাচ্ছেন রোনালদোকে মাঠ থেকে তুলে নিতে। মনে হচ্ছে যেন মাঠে আসল নিয়ন্ত্রণ কোচের হাতে নেই। ম্যাচ শেষে পর্তুগাল কোচ মার্তিনেজ যদিও যুক্তি দিয়েছেন, যখন দলের গোল প্রয়োজন, তখন বিশ্বের সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তোলার কোনো মানে নেই। কিন্তু পরিসংখ্যান আর পারফরম্যান্স যখন বিপরীত কথা বলে, তখন এ ব্যাখ্যা আশ্বস্ত করতে পারছে না কাউকেই।
চলুন দেখি পরিসংখ্যান কি বলছে?
বিশ্বকাপ, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় টুর্নামেন্টের আসরে পেছনের ১০ ম্যাচে রোনালদোর কোনো গোল নেই। অথচ তিনি খেলেন ফরোয়ার্ড হিসেবে! নামের ভারে হয়তো স্পন্সরের জোগাড় মেলে; কিন্তু মাঠের ম্যাচে জেতা যায় না। ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে পর্তুগালের ম্যাচ সে সত্যই জানান দিল।
পর্তুগাল স্কোয়াডে তরুণ, গতিময় ও ক্ষুধার্ত ফরোয়ার্ডের অভাব নেই। হয়তো তারা রোনালদোর মতো কিংবদন্তি নন; কিন্তু বর্তমান ফুটবলের চাহিদার সঙ্গে তারা অনেক বেশি মানানসই। পিএসজির গনজালো রামোস, আল নাসরের ফরোয়ার্ড জোয়াও ফেলিক্স, এসি মিলানের উইঙ্গার রাফায়েল লেয়াও- এ তিনজনও তো রয়েছেন পর্তুগালের ২৩ জনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। রোনালদো তো এদের জায়গা দখল করে রেখেছেন। কোচ মার্তিনেজ নিশ্চয়ই জানেন, বিশ্বকাপ আবেগের নয়, পারফরম্যান্সের মঞ্চ। ইতিহাস সম্মান পায়, কিন্তু একাদশ নির্ধারিত হয় বর্তমানের সামর্থ্যে।
রোনালদো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা—এ সত্য কখনো বদলাবে না। কিন্তু আরেকটি সত্যও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—কিংবদন্তির মর্যাদা আর বর্তমানের কার্যকারিতা এক জিনিস নয়।
পর্তুগাল যদি সত্যিই বিশ্বকাপে সামনে বাড়তে চায়, তাহলে খুব দ্রুত একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে; আর তা হলো- আসলে তারা কি চায় রোনালদোর ইগো রক্ষা, নাকি বিশ্বকাপে ভালো করার মর্যাদা?
বিশ্বকাপে এখন পর্তুগালের প্রয়োজন গোল, কারো ইগো রক্ষা নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


