আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সঠিক সিদ্ধান্ত, ধন্যবাদ তামিম

এম. এম. কায়সার

সঠিক সিদ্ধান্ত, ধন্যবাদ তামিম

ক্রিকেটে একজন ওপেনার সবচেয়ে বেশি বল খেলার সুযোগ পান। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাট করার সুযোগ কেবল তারই থাকে। নতুন বল সামাল দিতে পারা, বিরুদ্ধ কন্ডিশনেও পারফর্ম করার দক্ষতা, প্রতিপক্ষের সেরা বোলারকে মোকাবিলা করার দৃঢ়তা, দলের ইনিংস ভিত্তিমূল গড়ে দেওয়া; মূলত এমন সব পারঙ্গমতা ও যোগ্যতার জন্যই দলের সেরা ব্যাটসম্যানকে ওপেনার হিসেবে খেলানো হয়। বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচে একজন ওপেনার সব বল খেলেন না। কিছু বল ছেড়ে দেন। তামিম ইকবাল সেই কাজটিই করলেন।

বিসিবি, নির্বাচকমণ্ডলী এমনকি দলের অধিনায়ক সবাই তামিম ইকবালকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে চেয়েছিলেন। তার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন। তামিম ইকবাল ব্যাট তুলে বল ছেড়ে দিলেন। জানিয়ে দিলেন অনেক হয়েছে, আর না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমি আর ফিরছি না। আমাকে এখনও উপযুক্ত মনে করার জন্য ধন্যবাদ সবাইকে।

বিজ্ঞাপন

সার্বিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঝে লম্বা বিরতি, চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, ফিটনেস জটিলতা, বয়স- এসব অনুষঙ্গকে একসঙ্গে রেখে যুক্তি রেখা টানলে বলতেই হবে ক্রিকেটকে বিদায় বলার তামিমের সিদ্ধান্তটি সঠিক। ঠিক যেভাবে একজন দক্ষ ব্যাটসম্যান সব বল না খেলে ছেড়ে দেন, তেমনই সঠিক।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ের রেকর্ড আলোচনায় আনলে সেখানে তামিম ইকবালের নাম আপনাকে নিতেই হবে। সেই আলোচনায় সমালোচনা রয়েছে, ভালোবাসাও আছে অগাধ। দুবাইয়ের মাঠে চোট নিয়ে একহাতে ব্যাট ধরে অবিশ্বাস্য, অচিন্তনীয় কায়দায় দেশের জন্য নিবেদনের ব্যাটিংয়ের সেই দৃশ্যটা ক্রিকেটের প্রতি তার অনুপম ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। আবার মিরপুরে টানা চার ম্যাচে হাফসেঞ্চুরি হাঁকানোর পর বোর্ডের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির দিকে এক দুই তিন করে চার আঙুল দেখানোর সেই দৃশ্য জানাচ্ছে তামিম ইকবাল ‘লড়াই’ জিততে জানেন! জীবনের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ভারতের জহির খানকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কায় মাঠের বাইরে পাঠিয়ে সেদিন তামিম ঘোষণা দিয়েছিলেন সামনের সময়টায় বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের রাজত্ব হবে তার। হয়েছেও ঠিক তাই। লর্ডসের মাঠে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ব্যাট উঁচিয়ে বলেছিলেন, লিখে রাখো আমার নাম অনার্স বোর্ডে।

১৮ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে এমন অনেক কিছুই রেখে গেলেন তামিম।

- রেখে গেলেন?

হ্যাঁ ঠিক তাই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার রান ও পরিসংখ্যানের সংখ্যা আর বাড়বে না। সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিয়েছেন তামিম। এক বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছিলেন না। ইনজুরি সমস্যা তৈরি করেছিল। সতীর্থ, একসময়ের প্রাণের বন্ধু সাকিব আল হাসানের সঙ্গে তার প্রকাশ্য জটিলতা দ্বন্দ্ব তামিমের ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে সংকটে ফেলেছিল। ব্যাটে রান ও সেঞ্চুরির মতো তামিম ইকবালের অভিমানও বুক ভরা। সেই অভিমান এবং অপমানের পরিপ্রেক্ষিতে একসময় আকস্মিক বিদায় বলেছিলেন। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের সেই বিদায়ের ঘোষণায় পরিপক্বতা কম ছিল, অভিমান ছিল বেশি।

একদিনের মধ্যে সেই অভিমান গলে নিজের অবসর প্রত্যাহার করেছিলেন তামিম। তবে সেই ফিরে আসার পর মাত্র একটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। সেটাও আবার ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। মাঝের সময়টায় আর আন্তর্জাতিক মাঠে ফেরা হয়নি তার। এত লম্বা বিরতি সত্ত্বেও বিসিবি এবং নির্বাচকরা তাকে আরেকবার দলে চেয়েছিলেন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে তাকে চেয়ে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও বিবৃতি দিয়েছিলেন। তামিমের জন্যই এই টুর্নামেন্টের দল ঘোষণা পিছিয়ে দিয়েছিলেন নির্বাচকরা। কিন্তু তামিম সব বাস্তবতা মেনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিলেন। অন্য কারও কথা নয়, এবার তিনি শুনলেন নিজের মনের কথা। নিজের আনুষ্ঠানিক বিদায়ের ঘোষণায় তামিম বলেছেন, অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত আন্তরিকভাবেই আমাকে ফেরার জন্য বলেছে। নির্বাচক কমিটির সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। আমাকে এখনও উপযুক্ত মনে করার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তবে আমি নিজের মনের কথা শুনেছি।’

কোনো সন্দেহ নেই মাঠে তামিম ইকবালের ব্যাটিং বাংলাদেশ মিস করবে। তবে যে সময়ে ‘দ্য এন্ড’ বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তামিম সেটা সঠিক, একেবারে পারফেক্ট। একজন ওপেনার ঠিকই জানেন সব বল খেলতে হয় না।

আলো, আলোচনা, সমালোচনা, অর্জন- সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ তামিম!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন