২০১৮ সালের ১০ জুন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জনের দিন। নারী ক্রিকেট দলের হাত ধরে সেদিন প্রথমবারের মতো কোনো মেজর শিরোপা ঘরে তুলেছিল লাল-সবুজ বাহিনী। ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জয়; দেশজুড়ে আনন্দের জোয়ার। দেশের ক্রিকেটে প্রত্যাশার এক নতুন অধ্যায় শুরু।
বাংলাদেশ নারী দলের ওই এশিয়া কাপ জয়ের প্রায় আট বছর পেরিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভারতের কাছে হেরে আরো একটি এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিল বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মূলত আর কখনো ফাইনালেই উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে কয়েক বছরে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের অবস্থান নিয়ে আবারও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেকেই বলছেন, পুরো বিশ্ব ক্রিকেট অনেকটা এগিয়ে গেলেও আট বছর আগের সেই অবস্থানেই আছেন নিগার সুলতানা জ্যোতিরা। অথবা ফিরে গেছেন আরো পেছনে। আসলেই কি তাই? অঙ্কটা কষে দেখা যাক।
গত পাঁচ বছরে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ৮০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ নারী দল। এতে ৩২ জয়ের বিপরীতে ৪৭টিতে হারের মুখ দেখেছে টাইগ্রেসরা, ১টি ম্যাচ হয়েছে পরিত্যক্ত। উইনিং পার্সেন্টেজের হিসাবে এই পরিসংখ্যানকে তেমন দৃষ্টিকটু বলা যায় না। তবে একটু বিশ্লেষণ করলে দৈন্য চিত্রটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।
গত পাঁচ বছরের ৮০ ম্যাচের মধ্যে ৫৫টি ম্যাচ আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর বিপক্ষে খেলেছে বাংলাদেশ। এই ম্যাচগুলোর মধ্যে তারা জয়ের দেখা পেয়েছে ১০টিতে। এর মধ্যে শুধু আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষেই জিতেছে সাতটি। বাকিদের বিপক্ষে ৪৩ ম্যাচে জয় তিনটি।
গত পাঁচ বছরে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মোট ১৪টি ম্যাচ খেলে একটিতেও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। তবে জয় তো দূরের কথা, এই ১৪ ম্যাচের কোনোটিতেই প্রতিপক্ষকে তেমন চাপেও ফেলতে পারেনি টাইগ্রেসরা। এশিয়ান পরাশক্তি ভারতের বিপক্ষে ১৩ ম্যাচ খেলে ১২টি হারের বিপরীতে ১টি জয়। একমাত্র জয়টিও এসেছে ঘরের মাঠে একটি লো স্কোরিং ম্যাচে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের অতীত পরিসংখ্যান ছিল বেশ আশা জাগানিয়া। তবে গত পাঁচ বছরে পরিষ্কার একটা ব্যবধান গড়ে ফেলেছে লঙ্কানরা। ২০২১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১১ ম্যাচ খেলে ১০টিতে জিতেছে চামারি আতাপাত্তুর দল।
মূলত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশকে কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত এনে দেওয়ার ভারটা বয়ে বেড়াচ্ছে আইসিসির সহযোগী দেশগুলো। তবে পাঁচ বছরে টাইগ্রেসদের ২২ বার জয়ের উপলক্ষ হওয়ার পাশাপাশি এই দলগুলোই নিগারদের লজ্জায় ডুবিয়েছে তিনবার। নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ডের মতো দল, যাদের বেশির ভাগ ক্রিকেটারই পেশাদার নন, তাদের কাছেও চলতি বছর হারের মুখ দেখেছে টাইগ্রেসরা।
২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জিতেছিল বাংলাদেশ। গত বছর সেই ভারত ওয়ানডের বিশ্বকাপ জিতেছে। অথচ ওই টুর্নামেন্টের পর অর্জনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ যেন একই জায়গায় আটকে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোলিং আক্রমণকে শানিত করলেও ব্যাটিং ও ফিল্ডিংয়ে সেই আগের অবস্থানেই আটকে আছে টাইগ্রেসরা। ফলে ছোট দলের বিপক্ষে কম রান ডিফেন্ড কিংবা তাড়া করতে সক্ষম হলেও বড় দলের বিপক্ষে গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ছে দল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইপলাইনে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় না থাকা, ড্রেসিংরুমের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সিনিয়রদের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হওয়া এই অবস্থার পেছনে মূল কারণ।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখার পর থেকেই অনুসরণ করে আসছেন অনলাইন গণমাধ্যম বাংলানিউজের সিনিয়র প্রতিবেদক রবিউল ইসলাম রবি। বাংলাদেশ নারী দলের অবনমনের কারণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘মূল জায়গাটা হলো ক্রিকেটারদের মানসিকতা। মানসিকতাটাই আসলে বদল হয়নি, আসলে ওরা কী করতে চাচ্ছে, কী পরিকল্পনা সেটাই পরিষ্কার না। ড্রেসিংরুমের আবহাওয়াটাও বেশ অস্বস্তিকর। ক্রিকেটাররা একজন আরেকজনের নামে অভিযোগ জানায়। আর এরকম অশান্তি থাকলে তো ভালো করা সম্ভব নয়।’
ব্যাটিং ব্যর্থতার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের এক ‘কঙ্কালময়’ চিত্রণ তুলে ধরেন রবি, ‘আমাদের নারী বয়সভিত্তিক ক্রিকেটাররা অনেকেই শুধু ব্যাট ধরতে পারে এমন। অনেকেরই তেমন স্কিল নেই। ওই দিক থেকে সেরা ১৫ জন খেলোয়াড়কেই নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাটিংয়ে যাদের ওপর আস্থা রাখা হচ্ছে, তারাও আস্থার প্রতিদান দিতে পারছেন না।’
এছাড়া অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির প্রসঙ্গে তার মতামত, ‘এই মুহূর্তেই এই ফরম্যাটের জন্য নিগার ফিট না। খেলোয়াড় হিসেবে তাকে রাখতে চাইলেও অধিনায়ক হিসেবে পরিবর্তন জরুরি। আমি ২০১৮, ১৯, ২০ সালে নিগার সুলতানার খেলা দেখেছি। তিনি তখন যেই ফরম্যাটে ক্রিকেটটা খেলতেন, এখনো একই ধরনের অ্যাপ্রোচে খেলেন। কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে। আর নিগার এখানে পুরোপুরি ব্যর্থ।’
নারী দলে মাঠ এবং মাঠের বাইরে জ্যোতির ‘ক্ষমতা চর্চা’র বিষয়ে গুঞ্জন অনেক। নিজের পছন্দের খেলোয়াড়দের নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি, দল বাছাইয়ে ক্ষমতার ‘অযাচিত’ প্রয়োগসহ ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
লম্বা সময় নারী ক্রিকেট কাভার করে আসা আরেক ক্রীড়া সাংবাদিক সাজ্জাদ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জ্যোতির মধ্যে ক্ষমতা চর্চার বিষয়টা এখন মারাত্মক। সে মনে করে, এটি বাংলাদেশ দল না, তার নিজের দল। অনেকের সঙ্গে তার বাজে ব্যবহারের খবর জেনেছি। জাহানারা অভিযোগ দিল, মুর্শিদার সঙ্গে একবার দেশের বাইরে বাজে ব্যবহার করেছে। এভাবে চললে তো দল ভালো করবে না। কত অভিজ্ঞ খেলোয়াড় জ্যোতির সময়ে হারিয়ে গেছে, কেন হারাল, প্রশ্নগুলো কেন সামনে আসছে না।’
এর বাইরে মানসম্পন্ন কোচ এবং ম্যানেজমেন্ট স্টাফের অভাবও এমন পরিস্থিতির কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অধিনায়কত্বে পরিবর্তন, দ্রুত বিদেশি মানসম্পন্ন কোচ নিয়োগ এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে ম্যানেজমেন্টের আলাদাভাবে বসে তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করা উচিত। এছাড়া পাইপলাইন গঠনে বিসিবিকে এখনই আরো মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। আর এমনটা না করলে অচিরেই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের আরো অবনমন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

