নতুন ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মেয়েরা। এএফসি নারী এশিয়ান কাপে অভিষেক হতে যাচ্ছে আফঈদা-ঋতুপর্ণাদের। মহাদেশীয় এ টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো খেলতে যাচ্ছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। রোদ, বৃষ্টি আর তাপদাহ- মাঠের বাইরের এসব প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটু একটু করে নিজেদের প্রস্তুত করেছেন দেশের মেয়েরা। লক্ষ্য একটাই- নারী এশিয়ান ফুটবল মঞ্চে দারুণ কিছু উপহার দেওয়া এবং মাঠের লড়াইয়ে দ্যুতি ছড়িয়ে নিজেদের মেলে ধরা। অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগেও প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল দেশের নারী ফুটবলারদের।
সিডনিতে প্রকৃতির খাপখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে লড়াই করেও নিজেদের সেই ঘাটতি অনেকটা কমিয়ে এনেছেন। জায়ান্ট টিমদের বিপক্ষে সমান তালে লড়ার জন্য নিজেদের ঝালাই করে নিয়েছেন। আবহাওয়া ও কন্ডিশনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। কিন্তু মাঠের বাইরের চ্যালেঞ্জের পর এবার মাঠের চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করার পালা। আগামীকাল সিডনির ওয়েস্টার্ন স্টেডিয়ামে নারী এশিয়ান কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ আর কেউ নয়, ৯ বারের এশিয়ান শিরোপাজয়ী চীন। মাঠের প্রতিপক্ষ হিমালয়সম হলেও ভালো খেলার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী দেশের কন্যারা। এশিয়ান এই টুর্নামেন্টে নিজেদের জাত চেনাতে পারলে বৈশ্বিক ফুটবলে ডাক এসে পড়বে মেয়েদের কাছে- মনে-প্রাণে এমনটাই বিশ্বাস করেন গোলরক্ষক কোচ মাসুদ আহমেদ।
গতকাল অনুশীলন শেষে সাংবাদিকদের বিশ্ব নারী ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েদের পদচারণের স্বপ্ন দেখিয়ে মাসুদ আহমেদ বলেন, ‘ভয় নয়, বরং মেয়েরা উজ্জীবিত হয়ে আছে। আমরা এই মঞ্চে এসেছি, এখন আমাদের নিজেদের প্রমাণ করার সময়। এখানে এশিয়ার মঞ্চে ভালো কিছু করতে পারলে ওদের সামনে বিশ্বের অনেক জায়গার দরজা খুলে যাবে। তাই মেয়েরা সবকিছু ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে। ওরা চাপ মনে করছে না। যেটা আমাদের খুব আশা দেখাচ্ছে।’
প্রতিপক্ষ চীন ও উত্তর কোরিয়া থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা। শক্তি-সামর্থ্য, অতীত সাফল্য ও অভিজ্ঞতার বিচারে যেটা চরম সত্য। এ কারণে মাঠের শত্রুদের রুখে দিতে পারাটাই বাংলাদেশের জন্য দারুণ সাফল্য। একইসঙ্গে অঘটন আর চমক হিসেবে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশের মেয়েদের গোলরক্ষক কোচ মাসুদ অবশ্য চীনের শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন। সাবেক চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে স্নায়ুচাপ সামলে মাঠে আলো ছড়ানোর প্রত্যয় ঝরল কোচের কণ্ঠে, ‘এমন আসরে বড় বা ছোট দল বলতে কিছু নেই। টেকনিক্যালি যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হই বাংলাদেশের মেয়েদের নিয়ে, সেগুলোর ওপর জোর দিচ্ছি। ওরা যদি মূল বিষয়গুলো ঠিক রাখে, তাহলে মিস করার চান্স কম। সারা বছর ধরে আমরা যে বিষয়গুলো শিখেছি, তা যদি মাঠে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে আমাদের ভুলভ্রান্তি কম হবে। আর ভুলভ্রান্তি কম হলে গোল খাওয়ার শঙ্কাও কমে আসবে।’
বাংলাদেশের অর্ধে তেড়ে-ফুঁড়ে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করবে চীন- এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাদের আক্রমণ সামলানোটা বেশ কঠিনই হবে। এটা মানছে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টও। তবে প্রতিপক্ষদের রুখতে ছক কষে যাচ্ছেন কোচরা। মাসুদ বলেন, ‘আমরা যখন এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে কোয়ালিফাই করেছি, যখন গ্রুপিং হয়েছে, তখন থেকেই চীন, উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তান নিয়ে আমাদের কাজ হচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমরা তাদের ম্যাচ দেখছি, ওদের শক্তি-দুর্বল দিকগুলো নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি।’
চীনের বিপক্ষে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে গোলবারের অতন্দ্র প্রহরীদের। মূল গোলরক্ষক রুপনা চাকমা গ্লাভস হাতে দাঁড়াবেন পোস্টের নিচে। দূরপাল্লার শট ঠেকিয়ে দিতে বীরত্ব দেখাতে হবে অন্যদেরও। এ নিয়ে কোচের ভাষ্য, ‘দূরপাল্লার শটের প্র্যাকটিসটি অনেক আগে থেকে করছি। গ্রুপিং হওয়ার পর থেকে দেখেছি চীন কোথা থেকে অন টার্গেট শুটিং করে বা কোন কোন এঙ্গেল থেকে কীভাবে ফিনিশিং টাচগুলো করে। তাই সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। ভালো কাজও হয়েছে। দূরপাল্লার শটে আমার মনে হয় না খুব একটা সমস্যা হবে।’
চীনের বিপক্ষে দুবারের সাফজয়ী কন্যাদের কাছ থেকে চমক জাগানিয়া পারফরম্যান্সই প্রত্যাশা করছেন গোলরক্ষক কোচ, ‘আমাদের মেয়েগুলোকে নিয়ে অনুমান করা খুবই কঠিন। আপনারা চিন্তাও করতে পারবেন না ওরা কার সঙ্গে কী করে ফেলবে। আমি যতটুকু দেখছি, এই অনুশীলন সেশনগুলোয় ওরা খুবই ইতিবাচক। ওদের মনে ভয় কাজ করে না।’
জায়ান্ট চীনের বিপক্ষে ম্যাচটিকে দেশের মেয়েদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন কোচ, ‘আসলে এ মঞ্চে আমরা সমস্যার মুখোমুখি হব- এটা মাথায় নিয়েই এখানে এসেছি। এখন এ পর্যায়ে যদি সমস্যার মুখোমুখি হই, এটা নিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করার সুযোগ পাব। এ মঞ্চে আসতে না পারলে তো সমস্যাটা বুঝতে পারব না। ওটা ইতিবাচকভাবে নিচ্ছি এবং মেয়েরাও ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে।’
সিডনির জুবলি স্টেডিয়ামে নিবিড় অনুশীলন শেষে মনিকা চাকমা বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি অনেক দিন হয়েছে। এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছি। এখানে ভালো অনুশীলন হচ্ছে। প্রতিদিনই আমাদের উন্নতি হচ্ছে। সব মিলিয়ে দিন ভালোই যাচ্ছে। আমরা সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। ফল যা-ই হোক, আমরা আমাদের সেরাটা দেব।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

