বেলজিয়াম ফুটবলের রূপকথার অবসান

সোনালি প্রজন্মের বিশ্বকাপ স্বপ্নভঙ্গ

নজরুল ইসলাম

সোনালি প্রজন্মের বিশ্বকাপ স্বপ্নভঙ্গ

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মনোমুগ্ধকর ও রোমাঞ্চকর একটি অধ্যায়ে অবশেষে পর্দা নামল। ফিফা বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে ২-১ গোলের কোয়ার্টার ফাইনালে হার কেবলই একটি নকআউট পর্বের বিদায় ছিল না—এটি ছিল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবল ভক্তের মন জয় করা বেলজিয়ামের ‘সোনালি প্রজন্ম’-এর এক আবেগঘন বিদায়।
পোস্টের নিচে থিবো কোর্তোয়ার অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা, কেভিন ডি ব্রুইনার জাদুকরী পাসিং ভিশন, রোমেলু লুকাকুর অক্লান্ত গোল করার ক্ষুধা এবং মাঝমাঠে আক্সেল ভিটসেলের ক্লান্তিহীন উপস্থিতি—বিশ্বকাপের মঞ্চে আর কখনোই দেখা যাবে না। বেলজিয়াম ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই প্রজন্মটি বিদায় নিল সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফিটি ছাড়াই, যার পেছনে তারা বছরের পর বছর ছুটেছিল।
কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে সিংহভাগ সময় স্পেনের বিপক্ষে সমানে সমানে লড়াই করেছে বেলজিয়াম। কিন্তু ম্যাচের ৮৮ মিনিটে বদলি গোলরক্ষক সেনে লামেন্সের একটি মারাত্মক ভুল পুরো ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। বলটি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার পর লামেন্সের কেবল অসহায়ভাবে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না, যখন মিকেল মেরিনো বল জালে জড়িয়ে বেলজিয়ামের সেমিফাইনালের স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন। মাঠের বর্ষীয়ান তারকাদের জন্য এটি ছিল এক হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। ক্যামেরার লেন্স তখন বারবার খুঁজে নিচ্ছিল ইনজুরির কারণে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হওয়া অশ্রুসিক্ত কোর্তোয়াকে। সাইডলাইনে বসে নিজের শেষ বিশ্বকাপের স্বপ্ন এভাবে ধূলিসাৎ হতে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তার।
একটি মাত্র ভুলের কারণে জয়ের এত কাছাকাছি এসে ছিটকে যাওয়াটা ছিল মাঠের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া একঝাঁক খেলোয়াড়ের জন্য বড্ড নিষ্ঠুর এক পরিণতি। ২০১৪ সাল থেকে এই সোনালি প্রজন্মই ছিল বেলজিয়াম ফুটবলের মূল মেরুদণ্ড। ২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করাটাই এই অসামান্য প্রতিভাবান দলটির সেরা সাফল্য হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। একটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে না পারার ব্যর্থতা হয়তো তাদের অর্জনের ওপর কিছুটা ছায়া ফেলবে, তবে ইতিহাস তাদের মনে রাখবে ‘মুকুটহীন সম্রাট’ হিসেবে, যারা বেলজিয়ামকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ আসনে বসিয়েছিলেন।
একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি মানেই আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই হৃদয়ভঙ্গকে আঁকড়ে ধরে না রেখে বেলজিয়াম এখন তাকাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে। বর্তমান স্কোয়াডের ১৩ জন খেলোয়াড়ের বয়সই ২৫ বছরের নিচে, যা প্রমাণ করে যে একই সঙ্গে একটি নতুন অধ্যায় ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। চার্লস ডি কেটেলারে, জেরেমি ডকু এবং আমাদু ওনানা—এই তরুণরা ইতোমধ্যেই চলতি বিশ্বকাপে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং জানান দিয়েছেন যে বেলজিয়ামের পরবর্তী প্রজন্মের ভিত্তি কতটা মজবুত।
প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়া বিশ্বাস করেন, এই টুর্নামেন্ট তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য এক অমূল্য অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে এবং এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়েই দলকে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে হবে। বেলজিয়ামের সমর্থকরা হয়তো তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়ের অবসান নিয়ে ব্যথিত, কিন্তু ভয়হীন এক নতুন প্রজন্মের বুটে ভর করে তারা ইতোমধ্যেই আরেকটি নতুন বিশ্বকাপ যাত্রার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। বিদায় সেই সোনালি মেঘের দল, যারা আকাশজুড়ে গর্জন করলেও বৃষ্টি হয়ে ঝরতে পারল না!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন