খেলার মাঠে কুৎসিত দৃশ্য

খেলার মাঠে কুৎসিত দৃশ্য

প্রবাসী খেলোয়াড়দের আগমনে ফুটবলে যখন জোয়ার উঠেছে, তখন খেলার মাঠে দেখা যাচ্ছে কুৎসিত সব দৃশ্য। দিন দিন বাড়ছে সহিংসতার ঘটনা। খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, রেফারি, দর্শক-সমর্থকদের মধ্যে মারামারি, ধরাধরি, হামলা বিশৃঙ্খলাই যেন এখন মাঠের নিয়মিত ঘটনা! বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ কিংবা বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ- ফুটবলের দুই শীর্ষ স্তর- উভয় লিগের ম্যাচে মাঠে মেজাজ হারাচ্ছেন খেলোয়াড়, সংগঠক, দর্শক-সমর্থকরা। এতে ক্রীড়াঙ্গনে আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি নেতিবাচক এক আবহ তৈরি হচ্ছে।

সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের ম্যাচে সিদ্ধান্ত বিপক্ষে যাওয়ায় রেফারিকে মারধরের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার পূর্বাচলের জলসিঁড়ি প্রকল্পের ফর্টিস মাঠে সিটি ক্লাব ও বাফুফে এলিট একাডেমির ম্যাচে মারধরের শিকার হন সাবেক ফিফা রেফারি জিএম চৌধুরী নয়ন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, খেলার মাঠে প্রবেশ করে রেফারিকে মারধর করেন একদল মানুষ। অসহায় রেফারিতে বাঁচানোর চেষ্টা করেন তার সহকারী। এ ঘটনায় ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। জানা যায়, সিটি ক্লাবের বিপক্ষে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেওয়ার কারণেই রেফারিকে বেধড়ক-মারধর করা হয়। রেফারি নয়ন দাবি করেন, তার দেওয়া সিদ্ধান্তটি শতভাগ সঠিক ছিল। পেনাল্টি থেকে গোল করে ম্যাচটিতে ১-১ ব্যবধানে ড্র করে বাফুফে এলিট একাডেমি। নয়ন জানান, ১৮ বছর ধরে ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু এমন বাজে অভিজ্ঞতার শিকার কখনো হননি। এই ঘটনায় সঠিক বিচার চান এই রেফারি। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল চ্যাম্পিয়নশিপ লিগেই পিডব্লিউডি ও ওয়ারী ক্লাবের ম্যাচেও আক্রমণের শিকার হন রেফারিরা। এক রেফারির হাত থেকে পতাকা কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ ছাড়া একই লিগে পিডব্লিউডি ও ফরাশগঞ্জের ম্যাচেও পেনাল্টির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রেফারির প্রতি চড়াও হয়েছেন ক্লাব কর্মকর্তা ও সমর্থকরা। শুধু তাই নয়, মাঠে অশোভন আচরণ, তেড়ে যাওয়া, বোতল ছুড়ে মারা, জুতা নিক্ষেপসহ যেসব ঘটনা ঘটছে, এই অনাচারের শেষ কোথায়?

বিজ্ঞাপন

শুধু চ্যাম্পিয়নশিপ লিগেই নয়, সম্প্রতি প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচেও অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। গত ১২ এপ্রিল বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় বসুন্ধরা কিংস ও মোহামেডান ম্যাচে খেলোয়াড়, স্টাফ ও দর্শকদের মধ্যে মারামারি ও হাতাহাতির হয়েছে। এই ঘটনার জেরে জরিমানার মুখে পড়ে ক্লাব দুটি। গত ২৬ এপ্রিল কুমিল্লা ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত স্টেডিয়ামে আবাহনী ও মোহামেডানের ম্যাচেও গন্ডগোল হয়েছে। একই ভেন্যুতে গত ২ মে মোহামেডান ও বাংলাদেশ পুলিশ এফসি ম্যাচে মাঠে আওলাদ হোসেন নামের এক সমর্থককে অবৈধভাবে প্রবেশ করে খেলোয়াড়কে ধাক্কা ও মারতে তেড়ে যাওয়া মতো ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাফুফে ডিসিপ্লিনারি কমিটি। বাফুফে সূত্রে জানা যায়, এবার রেফারির সঙ্গে ঘটে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত সিটি ক্লাবকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের মাঠে নিষিদ্ধ অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। বাফুফে ডিসিপ্লিনারি কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন আমার দেশকে বলেন, ‘এর মধ্যে আইনগত ব্যবস্থার প্রসেস হয়ে গেছে। ম্যাচ কমিশনারের রিপোর্ট অনুযায়ী ডিসিপ্লিনারি কমিটি ব্যবস্থা নিচ্ছে। শিগগিরই আপনারা জানতে পারবেন। শাস্তি হবেই। কঠিন শাস্তি হবে।’ জাকির হোসেন জানান, গত প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচের জন্যও ডিসিপ্লিনারি কমিটি কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সামনে বাফুফে আরো কঠোর অবস্থানে যাবে।

জনপ্রিয় খেলা ফুটবলেই নয়, অন্যসব খেলাতেও মাঠের পরিবেশ ভালো নেই। মিরপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে ২৯তম জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ দিন (রোববার) অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। ম্যাটের বাইরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দলের কোচ, কর্মকর্তা ও সমর্থকরা। তাদের মধ্যে কিল-ঘুষি, লাথিতে চলে সমানে। এজন্য খেলা বন্ধ থাকে দীর্ঘ সময়। অথচ এদিন সকালে কিছু ইভেন্টের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ক্রীড়া উপদেষ্টার উপস্থিতির দিন কারাতে বিব্রতকর আর লজ্জার ঘটনা ঘটেছে। কারাতে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন সেন্টু আমার দেশকে বলেন, ‘এখানে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কিছু হয়নি। অন্য দলের কোচ, ম্যানেজার, দর্শকদের সঙ্গে গন্ডগোল হয়েছে। আমরা অভিযোগ পেয়েছি। খেলা মাত্র শেষ হয়েছে। আমরা দ্রুতই সভা ডেকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তদন্ত কমিটি করব, কেন এই ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে।’ জানা যায়, মারধরের শিকার হওয়ায় ঝালকাঠির জেলার কোচ মাসুম কারাতে ফেডারেশনে অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, -৬৭ কেজি ওজন শ্রেণির খেলা চলাকালীন, সেনাবাহিনী দলের খেলোয়াড়রা রেফারির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়। প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের সমর্থন করা দর্শকদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হামলা চালায়। সাবেক কারাতে জাতীয় দলের খেলোয়াড় রেজাউল করিম মাসুম, সৈয়দ রোকনুজ্জামান রনি ও বিল্লাহ হোসেন গুরুতর আহত হন। তবে ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ম্যাটের মধ্যে খেলোয়াড়, অফিসিয়ালরা একে অপরের ওপর সহিংসতায় জড়ায়। কারাতে ছাড়াও ক্রিকেট মাঠে উত্তপ্ত পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান ক্রিকেটাররা। যে কারণে একজন ক্রিকেটার নিষেধাজ্ঞার কবলেও পড়েছেন। ফুটবল, ক্রিকেট, কারাতেসহ দেশের জনপ্রিয় খেলায় যে হারে সহিংসতা বাড়ছে- মাঠের এসব কুৎসিত দৃশ্যের প্রদর্শনী বন্ধ হবে কবে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন