আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ক্রীড়ায় রমজান

শান্তির ধর্মেই বেনজেমার মনের প্রশান্তি

নজরুল ইসলাম

শান্তির ধর্মেই বেনজেমার মনের প্রশান্তি
করিম বেনজেমা

ইউরোপের জাঁকজমক জীবন খুব একটা কাছে টানেনি করিম বেনজেমাকে। তাইতো স্পেন ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন সৌদি আরবে, বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে সম্পর্কোচ্ছেদ করে। নাম লেখান সৌদি প্রো লিগের অখ্যাত ক্লাব আল-ইত্তিহাদে। কিন্তু কেন? অনেকে এর পেছনে আর্থিক কারণই দেখছেন। কম তো নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে যে তার বার্ষিক আয় এখন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইউরো। কিন্তু ক্লাব আল-ইত্তিহাদের মিডিয়া চ্যানেলে বেনজেমা যেটা বলেছেন, তাতে সবার চোখ চড়কগাছ হতে বাধ্য। সৌদি আরবের প্রস্তাব কেন বেছে নিলেন? উত্তরে রিয়ালের সাবেক এ তারকা ফরোয়ার্ড সামনে এনেছেন ইসলামকে। অর্থকড়ি নয়, শান্তির ধর্মের টানেই মরুভূমির দেশে ঘাঁটি গেড়েছেন। এ নিয়ে বেনজেমা বলেন, ‘কারণটা হলো আমি একজন মুসলিম। সৌদি আরব একটি মুসলিম রাষ্ট্র। আমি সব সময়ই এ দেশে থাকার স্বপ্ন দেখতাম।’ আল-ইত্তিহাদে যোগ দিয়ে নিজের পুরোনো সেই ইচ্ছেই পূরণ করেন বেনজেমা।

সৌদি আরবে পা রেখে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন ফ্রান্সের হয়ে ৯৭ ম্যাচে ৩৭ গোল পাওয়া বেনজেমা। মুসলিম দেশে একজন মুসলিম হিসেবে ভালোবাসা পাওয়া আর মসজিদুল হারামকে কাছে থেকে দেখার অনুভূতি জানান ঠিক এভাবে, ‘একজন মুসলিম হিসেবে মক্কায় থেকে মানসিক প্রশান্তি অনুভব করি। এটি একটি ব্যতিক্রমী স্থান। ফুটবল আমার জীবন, কিন্তু আল্লাহকে কাছাকাছি পাওয়া আর মক্কার পাশে থাকা অন্যরকম কিছু।’


ধর্মপ্রাণ মুসলিম বেনজেমা মেনে চলেন ইসলামি অনুশাসন। নামাজ আদায় করেন। নিয়মিত যান মসজিদে। বিশ্বের যেখানেই যান, খুঁজে নেন আল্লাহর ঘর। একবার সিঙ্গাপুরের এক মসজিদেও দেখা গেছে এ স্টার ফুটবলারকে। নিয়েছেন কোরআনের শিক্ষা। পবিত্র এ ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াতেও দেন সময়। পালন করেছেন হজ। রোজা রেখে অনুশীলন আর মাঠের খেলা- দুটোই সেরে নেন বেনজেমা।

বিজ্ঞাপন


সিয়াম সাধনা করলেও বেনজেমার পারফরম্যান্সে কখনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং উপহার দিয়েছেন আরও দুর্দান্ত ফুটবল। ২০২৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি গায়ে সাত মিনিটের ব্যবধানে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক পারফরম্যান্সের ঝলকে ফুটবল অনুরাগীদের মুগ্ধ করেন আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত এ তারকা প্লেমেকার। রোজা রেখেও কীভাবে মাঠের লড়াইয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন? রোজা রাখলে কি ফিটনেসে সমস্যা হয়? এমনটি জিজ্ঞাসা করতেই বেনজেমার কণ্ঠে ঝরে রমজানের মাহাত্ম্য, ‘অনুশীলন ও ম্যাচে রোজা কোনো প্রভাব ফেলে না আমার ওপর। এটা অসাধারণ এক অনুভূতি। এটা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং রোজা রাখলে আমি খুব ভালো বোধ করি। রমজান আমার জীবনের অংশ, যা ধর্ম আমার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে।’


মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। বেনজেমার চাচা আলজেরিয়ার ছোট্ট এক গ্রামের মসজিদের ইমাম। তার দাদা সেখান থেকে অভিবাসী হন ফ্রান্সের লিঁওতে। তাইতো ইসলামি রীতিনীতি ও বিধিনিষেধের শিক্ষা পরিবার থেকেই পেয়েছেন। এ কারণে বেশ ভালোভাবেই জানেন, মুসলমানদের জন্য রমজান স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা আর আনুগত্য প্রকাশের উপযুক্ত সময়। ‘কিং করিম বেনজেমা’ও মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কৃতজ্ঞ, ‘আমি সুস্থ থাকার জন্য কৃতজ্ঞ।’


জীবনের প্রথম রোজা পালনের স্মৃতি আজও অমলীন বেনজেমার হৃদয়পটে। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে বেনজেমা বলেন, ‘পাঁচ বছর বয়সে আমি প্রথম রোজা পালন করেছিলাম। তা এখনো আমার মনে আছে। আমার চাচি আমাকে ফুলের মালা ও প্রচুর চকলেট দিয়ে উপলক্ষটি উদযাপন করেছিলেন। এটি আজও আমার সবচেয়ে পুরোনো ও সবচেয়ে সুখের স্মৃতিগুলোর একটি।’


ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী জনতার পাশে সব সময় ছিলেন বেনজেমা। এখনো রয়েছেন। ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, ‘আমাদের সব প্রার্থনা গাজার বাসিন্দাদের জন্য, যারা আবারও এই অন্যায় বোমা হামলার শিকার হচ্ছে, যেখানে কোনো নারী বা শিশুই রেহাই পাচ্ছে না।’ মধ্যপ্রাচ্যের নিপীড়িত মুসলিমদের নিয়ে এই টুইটের জন্য জন্মভূমি ফ্রান্সে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে বেনজেমাকে। মিসরের নিষিদ্ধ সংগঠন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে বেনজেমার সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনেছিলেন তৎকালীন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন। বেনজেমার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের জার্সিতে খেলার সময় জাতীয় সংগীত না গাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মান্তরকরণ প্রচেষ্টার অভিযোগও এনেছিলেন তিনি।


দারমানিন অভিযোগ করতেই আইনজীবীর মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানান জিনেদিন জিদানের পর দ্বিতীয় মুসলিম ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জেতা বেনজেমা। পরে হাঁটেন আইনি পথে। ২০২৪ সালে মামলা ঠুকে দিয়ে বেনজেমা বলেন, ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পৃক্ততাও কখনো ছিল না, এমনকি সংগঠনটির সদস্য দাবিদার কারো সম্পর্কে কোনো ধারণাও নেই আমার।’


নিজে অন্তঃপ্রান্ত মুসলিম। তাই করিম বেনজেমা নিজের জীবনসঙ্গীকে নিয়ে এসেছেন ইসলামের পতাকাতলে। সৌদি আরবে যাওয়ার আগেই মার্কিন মডেল জর্ডান ওজুনা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম বনে যান। নিজের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের স্মৃতিচারণ করে ওজুনা বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল মাদ্রিদের মসজিদে। কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছিল। এটা ছিল একটি ছোট এবং অন্তরঙ্গ অনুষ্ঠান। আমি শিশুর মতো কেঁদেছিলাম। আমি খুবই আবেগপ্রবণ। আমি ইসলাম ধর্ম নিয়ে অনেক গবেষণা করেছি এবং আমার কাছে এটি সুন্দর মনে হয়েছে।’


বিশ্বের সেরা ধর্ম ইসলাম নিয়ে আরো যোগ করেন ওজুনা, ‘ইসলাম সম্পর্কে যা কিছু পড়েছি, তা আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। রমজান মাসে কোরআন পড়েছি এবং তাতে আমার চোখে পানি চলে এসেছে। খ্রিষ্টান থেকে মুসলিম হতে ‘দ্য হোলি পাথ টু ইসলাম’ও পড়েছি। এটি সত্যিই মূল্যবান একটি বই।’ যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে জন্ম ওজুনার। তবুও এশিয়ান দেশ সৌদি আরবের পোশাকের নিয়ম-কানুন ঠিকই মেনে চলছেন। পর্দা করা নিয়ে ওজুনা বলেন, ‘আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। এটি একটি মূল্যবান সংস্কৃতি। আমি এই অভিযানে আনন্দিত।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন