শেষ হয়েছে অ্যাশেজের মহারণ। একতরফা লড়াইয়ে ৪-১ ব্যবধানে জিতে পোড়া ছাইয়ের দখল নিজেদের কাছেই রেখে দিল অস্ট্রেলিয়া। আসর শেষে চলছে হিসাব-নিকাশ। কেউ আলো ছড়িয়েছেন ব্যাট হাতে, কেউ বল হাতে গড়েছেন কীর্তি। রেকর্ড বইয়ের পাতায় আলোড়ন তোলা আসরের সেরা পাঁচের দিকে আলোকপাত করা যাক :
মিচেল স্টার্কের মাইলফলক
অ্যাশেজের এবারের আসরজুড়ে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন মিচেল স্টার্ক। সিরিজ শুরুর আগে দুই গুরুত্বপূর্ণ পেসার প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজেলউড ছিটকে গেলে দুশ্চিন্তায় পড়ে অস্ট্রেলিয়া। বল হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সব দুশ্চিন্তা উড়িয়ে দেন স্টার্ক। পুরো সিরিজে রেকর্ডের মালা গাঁথা স্টার্ক সিডনিতে শেষ টেস্টেও রেকর্ড ছুঁয়ে সেরা একটি অ্যাশেজ কাটিয়েছেন। সিরিজ সেরাও হয়েছেন অজি গতি তারকা। টেস্টে এখন তার উইকেট সংখ্যা ৪৩৩, যা টেস্টে বাঁ-হাতি বোলারদের মধ্যে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। তার সঙ্গে এ তালিকায় আছেন সাবেক শ্রীলঙ্কান তারকা স্পিনার রঙ্গনা হেরাথ।
এর আগে ওয়াসিম আকরামকে (৪১৪) ছাড়িয়ে টেস্টে বাঁ-হাতি পেসার হিসেবে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড গড়েন স্টার্ক। সিরিজে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকও স্টার্ক। পাঁচ টেস্টে তার শিকার ৩১ উইকেট। সে সঙ্গে ৪০ বছর পর দুই ফিফটিতে ১৫৬ রান করে কোনো টেস্ট সিরিজে ৩০+ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি দুই বা ততোধিক ৫০+ ইনিংস খেলার নজির গড়লেন স্টার্ক। এর আগে ১৯৮৫ সালের অ্যাশেজে সবশেষ এমন নজির গড়েন বোথাম। পাঁচ বা তার কম ম্যাচের টেস্ট সিরিজে মাত্র চারজন খেলোয়াড় এই ডাবলের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
ট্রাভিস হেডের রানবন্যা
স্বপ্নের মতো একটি আসর কাটিয়েছেন ট্রাভিস হেড। আসরজুড়ে বোলারদের জুজুর ভয় দূরে ঠেলে হেড পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করেছেন। কখনো একা হাতে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন, কখনো গড়ে দিয়েছেন জয়ের ভিত। সিরিজজুড়ে ব্যাট চালিয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের সঙ্গে সিডনি টেস্টের সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছেন অজি ওপেনার। করেছেন ৬২৯ রান। গেল ছয় বছরের মধ্যে অ্যাশেজে ৬০০+ রান করা একমাত্র ব্যাটার হেড। ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে ৬০০+ রান করেছিলেন স্টিভ স্মিথ।
ওপেনার হিসেবে এবারের অ্যাশেজে হেড করেছেন ৬০৮ রান। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার হিসেবে গত ৩০ বছরের মধ্যে কোনো টেস্ট সিরিজে হেড ছাড়া আর কেউ ৬০০+ রান করতে পারেননি। এর আগে সবশেষ ১৯৯৪-৯৫ অ্যাশেজে মাইকেল স্লেটার করেছিলেন ৬২৩ রান। আর অ্যাশেজের হিসাবে গত ১৫ বছরে হেডই প্রথম। অ্যাশেজে সবশেষ ২০১০-১১ সালে ওপেনার হিসেবে ৬০০+ রান (পাঁচ ম্যাচে সাত ইনিংসে ৭৬৬) করেন ইংল্যান্ডের অ্যালিস্টার কুক।
অজিভূমে ফ্লপ ‘বাজবল’
ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ইংল্যান্ডের কোচ হওয়ার পর টেস্ট ক্রিকেটেও ধুন্ধুমার মারকাটারি ব্যাটিংয়ের ঝলক দেখিয়ে প্রবর্তন করেছিলেন ‘বাজবল’ থিওরি। টেস্ট ক্রিকেট খেলতে হবে ব্যাকরণ মেনে- এই ধারার বাইরে গিয়ে ইংলিশরা খেলা শুরু করে টি-টোয়েন্টি স্টাইলে। তাতে পাঁচদিনের ম্যাচেও দেখা যায় রানবন্যা। তবে অ্যাশেজে বাজবল থিওরি ধোপে টিকল না। এক কথায় বলা যায় ‘ব্যর্থ’! অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন আর স্টার্কদের সঙ্গে পেরে ওঠেননি বেন ডাকেটরা। সিডনিতে হেরে ইংলিশ দলপতি স্টোকসও স্বীকার করলেন বাজবল ব্যর্থ হয়েছে। স্টোকসের অধিনায়কত্ব শুরুর সময়ই ‘বাজবল’ বিখ্যাত হয়ে ওঠে। স্টোকস স্বীকার করলেন, এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষরা কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলেছে, ‘প্রথমদিকে দলগুলো বুঝতেই পারত না কীভাবে আমাদের মোকাবিলা করবে। এখন তারা স্পষ্ট জবাব নিয়েই মাঠে নামছে। কিছু মুহূর্তে আমরা ঝুঁকি নিয়ে লাভবান হয়েছি ঠিকই; কিন্তু অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদেরই ক্ষতি করেছি।’
স্টিভেন স্মিথের তুখোড় নেতৃত্ব
এবারে অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ জয়ের পেছনে ভারপ্রাপ্ত দলনেতা স্টিভেন স্মিথকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। নিয়মিত অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ছিটকে যাওয়ার পর পুরো দলকে সুনিপুণ কায়দায় গুছিয়ে সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন স্মিথ। অ্যাডিলেডে কামিন্স ফিরে এলেও পরের দুই ম্যাচে স্মিথের কাঁধেই ভার বর্তায়। তাতে শেষটাও ভালোয় শেষ করলেন অজি তারকা। পুরো সিরিজে নেতৃত্বের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও রান করেছেন স্মিথ। এক ফিফটি ও সেঞ্চুরিতে করেন ২৮৬ রান।
ব্যর্থতার মাঝেও আলোয় রুট
পুরো সিরিজে অস্ট্রেলিয়ানদের জয়জয়কারের মধ্যেও আলো ছড়িয়েছেন ইংল্যান্ডের জো রুট। ইংলিশদের ব্যাটিং ব্যর্থতার সিরিজে প্রাপ্তি বলতে রুটের ফর্ম। সিরিজে দুই সেঞ্চুরিতে ৪০০ রান করেছেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। সিডনিতে দুর্দান্ত ১৬০ রানের ইনিংস খেলে অজিদের সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিংকে ছুঁয়েছেন রুট। টেস্টে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিয়ানের তালিকায় যৌথভাবে তালিকার তৃতীয় স্থানে উঠে এলেন তিনি। ২০০ ম্যাচে ৫১ শতক নিয়ে শীর্ষে শচিন টেন্ডুলকার। ১৬৬ ম্যাচে ৪৫ সেঞ্চুরি নিয়ে দুইয়ে জ্যাক ক্যালিস। তিনে থাকা রুট ১৬৩ ম্যাচে ৪১ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন আর পন্টিং ১৬৮ ম্যাচে। একইসঙ্গে এই সেঞ্চুরিতে ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমের পর অ্যাওয়ে অ্যাশেজে একাধিক সেঞ্চুরি করা ইংল্যান্ডের চতুর্থ ক্রিকেটার হলেন তিনি। আগের তিনজন-মাইকেল ভন (তিনটি), অ্যালিস্টার কুক (তিনটি) এবং জোনাথান ট্রট (দুটি)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

