আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিপিএল বদনাম!

এম. এম. কায়সার

বিপিএল বদনাম!

বিপিএল শুরুর দিনেই হল্লা হলো। হট্টগোল হলো। আয়োজনে ত্রুটি, টিকিট কেলেঙ্কারি নিয়ে বিসিবি সভাপতির দিকে আস্তিন গুটিয়ে প্রশাসনের তথাকথিত ‘ক্ষমতাবানদের’ তেড়ে যাওয়ার ‘ইনিংসের’ দেখাও মিলল!

যা দুঃখজনক। লজ্জাকর। একইসঙ্গে হতাশারও। ঢাকায় প্রথম পর্বে মাঠের চমৎকার ক্রিকেট এবং মিরপুরের ব্যাটিংসহায়ক উইকেট, মূলত এই দুটো বিষয় মাঠের বাইরের বাকি ‘দুর্ঘটনাকে’ ঢেকে দিল। মাঠের ক্রিকেটই বেশি আলোচনায় রইল।

বিজ্ঞাপন

সিলেটপর্ব শুরু হলো বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ ও পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফাহিমের মধ্যকার ‘কথার যুদ্ধে’! জানা গেল, দুজনে একইসঙ্গে একই দিনে বিসিবিতে পরিচালক হিসেবে যোগ দিলেও, পাশাপাশি বসে বৈঠক করলেও হৃদয়, মেজাজ, মানসিকতা এবং ভাবে তাদের দুজনের মধ্যে দূরত্বের মাত্রা অনেক অনেক দূরের!

সেই সংকট মেটাতে সিলেটে সাদা পতাকা তুলে ফারুক আহমেদ জানিয়ে দিলেন, সমস্যা মিটেছে। মাঠের বাইরের বিতর্ক বাদ দিয়ে আসুন আমরা সবাই একজোট হয়ে মাঠের ক্রিকেটেই আনন্দ খুঁজি। সংকট শেষ। অল কোয়াইট অন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট।

শান্তির এই বার্তা নিয়ে বিপিএলের সব দল চট্টগ্রামে গেল। আর এই পর্বেই এবারের বিপিএল আরেকবার যে ‘ট্রফি’ পেল, তার নাম- বদনাম! চট্টগ্রাম পর্বের প্রথম দিন থেকেই নতুন উৎপাতের কবলে পড়ল বিপিএল। জানা গেল, দুর্বার রাজশাহীর বেশিরভাগ ক্রিকেটার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এক টাকাও পাননি! কিছু অংশের টাকা কয়েকজন পেয়েছেন। সে তালিকায় বিদেশি ক্রিকেটারদের সংখ্যাই বেশি। স্থানীয় ক্রিকেটাররা যেন অচ্ছুত! ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকের এমন আচরণকে ক্রিকেটাররা এক অর্থে জোচ্চুরি বলে শোরগোল তোলেন। দল চট্টগ্রামে আর অধিনায়ক তখনো ঢাকায়। টাকা না পেলে কোনো ক্রিকেট নয়- এই দাবি তুলে দুর্বার রাজশাহীর ক্রিকেটাররা অনুশীলন বর্জন করলেন। চুক্তির টাকা না পেলে ম্যাচেও না খেলার হুমকি দিলেন তারা। মাঠের ক্রিকেটের আলোচনা আরেকবার শিকেয় উঠল। মাঠের বাইরে রাজশাহীর ফ্র্যাঞ্চাইজির এমনসব দেউলিয়াপনার খবরই ক্রিকেটের শিরোনাম হলো! এই সংকট মেটাতেও বিসিবি সভাপতি তড়িঘড়ি করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গেলেন। দুর্বার রাজশাহীর ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিককে নিয়ে বৈঠক করলেন। সেখানেই ফয়সালায় পৌঁছানোর উপায় খোঁজা হলো। তাৎক্ষণিকভাবে সে সমস্যার পুরো সমাধান হলো না। আংশিক সেই সমাধানে রাজশাহীর ক্রিকেটাররা অনুশীলনে ফিরলেন। ম্যাচও খেললেন।

তবে জটিলতা যে মিটল না। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো টাকা দিতে পারলেন না। চেক বাউন্স হলো। এই পারিশ্রমিক না পাওয়ার তালিকায় থাকা বিদেশি ক্রিকেটাররাও বিসিবির কাছে অভিযোগ করলেন। ফের বৈঠক। ফের প্রতিশ্রুতি। এই জটিলতায় যোগ হলো বিপিএলের বহু পুরোনো আরেকটি রোগ- ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং।

বোলার বল করলেন। সেই বল গিয়ে পড়ল পাশের পিচে। তাও আবার লেগ সাইডে! চতুর্থ স্লিপের সেই অংশ দিয়ে বল বাউন্ডারির দড়ি স্পর্শ করল। এক বলেই হয়ে গেল ৫ রান! একজন বোলার টানা তিনটি ওয়াইড দিলেন। একজন স্পিনার পপিং ক্রিজের এক ফুট বাইরে পা নিয়ে নো বল করলেন। ভাব দেখে মনে হলো এই বলটা যেন নিশ্চিতভাবেই নো বল হয়, অনেক পরিশ্রম নিয়ে সেই কাজটাই সফলভাবে করেছেন তিনি! তামিম ইকবাল মাঠের ফিল্ডার সাব্বির রহমানকে ‘ভরে দেওয়ার’ ইঙ্গিত দিয়ে যে গালিটা দিলেন, সেটা পুরো দুনিয়া শুনল- দেখল; কিন্তু ম্যাচ রেফারি সেটা এড়িয়ে গেলেন। শাস্তি তো দূরের কথা, তামিমকে তিনি শুনানিতেই ডাকলেন না।

কেন? নামটা তামিম ইকবাল বলেই কী!

মাঠ ও মাঠের বাইরের এমনসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত এবারের বিপিএল নিয়ে নতুন এক ট্যাগলাইন আপনি অনায়াসেই দিতে পারেন-বদনামের বিপিএল! অনেক নতুনের স্লোগান দিয়ে শুরু হওয়া এই বিপিএলের আবহ সংগীত বদলে গেছে যেন! বলিউড সিনেমার সেই গানে মুন্নি বদনাম হয়েছিল ডার্লিংয়ের জন্য। আর এবারের বিপিএল বদনাম হলো ফ্র্যাঞ্চাইজি স্যারদের ছ্যাবলামো, অপেশাদারিত্ব, ফুটানি ও দেউলিয়াপনার জন্য!

এই ফ্র্যাঞ্চাইজি স্যাররা খেলা চলাকালে মাঠের পাশে মোটা গদিওয়ালা সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে জমিদারগিরি দেখিয়ে জানান দেন, ওই যে মাঠে যারা খেলছে আমিই তাদের মালিক বা মালকিন! বিদেশি মেন্টরকে তারা টাকা ঠিকই দেন। তাদের খরুচে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরও মাঠে-অনুশীলনে-ভিডিওতে কারণে-অকারণে প্রজাপতি হয়ে পাখনা মেলেন। তারা পাঁচতারকা হোটেলে থাকেন। তাদের খরচ মেটাতে ফ্র্যাঞ্চাইজি স্যারদের কার্পণ্য নেই। অথচ এই খেলার আসল স্টেকহোল্ডার যারা, সেই ক্রিকেটারদের ন্যায্য ও প্রাপ্য টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গ এলেই ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা আকস্মিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যান। ব্যাংকে তাদের চেক বাউন্স হওয়া শুরু করে।

এমন ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ে এই বিপিএল কি করবে? একটাই কাজ- বদনাম কামানো!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন