ফুটবল বিধাতা হয়তো সমর্থকদের কাছে একটি ক্ষমা পেতেই পারেন। যে দুটি দলকে টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার ভাবা হচ্ছিল-একদিকে বর্তমান বিশ্বকাপ রানার্সআপ ফ্রান্স, অন্যদিকে বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন-তাদের ফাইনালের মঞ্চে দেখার অপেক্ষায় ছিল বিশ্ববাসী। কিন্তু ভাগ্যচক্রে সে মহাদ্বৈরথটি এক ধাপ আগেই মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে আগামী মঙ্গলবার, ডালাসের ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে। এটি এমন এক ম্যাচ, যা পুরো বিশ্ব দেখার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। অথচ এসেছে টুর্নামেন্টের ঠিক এক ধাপ আগেই।
সাম্প্রতিক ফর্মের দিকে তাকালে সত্যটা স্বীকার করতেই হবে-মাঠের লড়াইয়ে ফ্রান্স অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। দিদিয়ের দেশমের দল এবারের টুর্নামেন্টে নিজেদের এক অভেদ্য ও নিখুঁত মেশিনে রূপান্তরিত করেছে। শেষ ছয় ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতেই তারা পেয়েছে একাধিক গোলের জয়। টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ওঠার অনন্য এক কীর্তি গড়ল তারা, যা এর আগে কেবল জার্মানি ও ব্রাজিল করে দেখাতে পেরেছিল। বোস্টনে মরক্কোর বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়টি ফরাসিদের শক্তির গভীরতা আরেকবার প্রমাণ করেছে।
ওই ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পে ইউরো-২০২০-এর পর নিজের প্রথম পেনাল্টি মিস করেও যেভাবে স্বাভাবিক থেকেছেন, গোল করেছেন এবং ঠিক ছয় মিনিট পর ওসমান দেম্বেলেকে দিয়ে গোল করিয়েছেন-তাতেই বোঝা যায় তিনি কতটা দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। যখন একজন মহাতারকার ভুলগুলোও শেষ পর্যন্ত জাদুকরী পারফরম্যান্সে রূপ নেয়, তখন প্রতিপক্ষের আসলে কিছুই করার থাকে না।
ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর জন্য এমবাপ্পের সামনে এখন এক দারুণ চিত্রনাট্য। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা এখন ২০। লিওনেল মেসির সব মিলিয়ে ২১ গোলের বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করা থেকে মাত্র ১ গোল দূরে এই ফরাসি সুপারস্টার। ফ্রান্সের প্রতিটি নকআউট ম্যাচেই গোল করার রেকর্ড রয়েছে তার। মঙ্গলবার স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালের মঞ্চে গোল করলেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্কোরিং রেকর্ড নিজের করে নিতে পারেন।
অন্যদিকে, সেমিফাইনালের পথটা স্পেনের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। লস অ্যাঞ্জেলেসে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল ৬৮ শতাংশ বল দখলে রেখে ম্যাচে আধিপত্য বজায় রাখলেও জয় পেতে তাদের ৮৮ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। প্রথমার্ধের ঠিক আগে চার্লস ডি কেটেলারের হেড গোলটি ছিল পুরো গ্রীষ্মে স্পেনের জালে জড়ানো প্রথম গোল, যা তাদের রেকর্ড ৬৫০ মিনিটের ক্লিনশিট ভেঙেছে।
থিবো কোর্তোয়ার চোট ও বেলজিয়ামের ব্যাকআপ গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে পর্তুগাল ম্যাচের নায়ক মিকেল মেরিনো আবার স্পেনকে উদ্ধার করেন। লা রোজা শিবির এখন টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ইতালির ৩৭ ম্যাচের বিশ্বরেকর্ড ছোঁয়ার অপেক্ষায়। তবে ফ্যাবিয়ান রুইসের করা উদ্বোধনী গোলটি বাদ দিলে মাঠের দখল ধরে রেখেও সে সুযোগকে গোলে রূপান্তর বা দর্শকদের রোমাঞ্চিত করার ক্ষেত্রে স্প্যানিশ আক্রমণভাগকে কিছুটা ঘাম ঝরাতে হয়েছে।
স্পেনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম তাদের তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল। গত এপ্রিলে সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করার সময় হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ে বার্সেলোনার শিরোপা লড়াই থেকে ছিটকে যান ১৮ বছর বয়সি এই তারকা। সম্পূর্ণ ফিট না হয়েই সময়ের সঙ্গে লড়াই করে বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম লিখিয়েছেন। ইতোমধ্যে ছয়টি ম্যাচ খেলে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সি খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েছেন ইয়ামাল।
শুক্রবার রাতে কোর্তোয়া ও ল্যামেন্সকে বেশ কয়েকবার পরীক্ষায় ফেললেও ইউরো ২০২৪-এ যে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে একাই তছনছ করে দিয়েছিলেন, সেই ইয়ামাল ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। মাঠের লড়াইয়ে কিছু ঝলকই কেবল দেখাতে পেরেছেন এই তরুণ তুর্কি। এটা কি ইনজুরির ধকল, নাকি একজন তরুণের নিজের শরীরকে সামলে নেওয়ার সতর্কতা, তা নিশ্চিত নয়। তবে মঙ্গলবারের মহাযুদ্ধে স্পেন যদি জিততে চায়, তবে ইয়ামালকে তার শতভাগ ফর্মে ফিরতেই হবে।
মঙ্গলবারের ম্যাচের কৌশলগত সমীকরণটি বেশ পরিষ্কার। স্পেন বরাবরের মতোই বল নিজেদের পায়ে রাখবে এবং ফ্রান্স ধৈর্যের সঙ্গে ওতপেতে থাকবে। স্প্যানিশ ডিফেন্সের সামান্যতম ভুলেই এমবাপ্পে এবং দেম্বেলে কাউন্টার অ্যাটাকে ঝড়ের গতিতে ছুটে যাবেন। আর তাদের বল জোগান দিতে প্রস্তুত টুর্নামেন্টের সেরা প্লেমেকার মাইকেল ওলিসে, যিনি ইতোমধ্যে পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে ফেলেছেন।
আগামী ১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস বা বাস্তিল দিবস। নিজের দেশের ঐতিহাসিক দিবসে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামবে ফরাসিরা। দুর্গ আক্রমণ অথবা দুর্গ রক্ষা-কৌশলের এই মহাযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয় হবে কার? উত্তর মিলবে ডালাসের মাঠেই। ফুটবলপ্রেমীরা চোখের পলক ফেলার ভুলটি হয়তো করবেন না!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

