টানা পাঁচদিনের ভারী বর্ষণ, ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় বান্দরবান জেলা ও এর আশপাশের উপজেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
গতকাল শনিবার ভোর থেকে জেলা শহরের নিম্নাঞ্চলে পানি হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। শহরের অলিগলি ও প্রধান সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে একদিকে যেমন পানিবন্দি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন, অন্যদিকে বান্দরবান শহরের কসাইপাড়া এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নতুন করে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের কেরানীহাট এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এবং অভ্যন্তরীণ সড়কে পাহাড়ধসের ফলে সারা দেশের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বান্দরবানের প্রধান নদী সাঙ্গুর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়া থামেনি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, লামা মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার নিচে এবং বাঁকখালী নদীর পানি ৩ দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি কিছু এলাকায় কমলেও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়া অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, অঞ্চলটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্র ও ভবনগুলোর নিচতলা প্লাবিত
পানিবন্দি এলাকার প্রায় প্রতিটি ভবনের একতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যারা বহুতল ভবনগুলোর উপরের তলায় অবস্থান করছেন, তারা নিচে নামতে বা বের হতে না পেরে চরম খাদ্য ও পানিসংকটে রয়েছেন। অন্যদিকে ঘরবাড়ি ছেড়ে যারা বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন, তারা কাজ ও উপার্জন হারিয়ে অসহায় ও মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
কলার ভেলায় সংসদ সদস্য
দুর্যোগের এ কঠিন মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বান্দরবান-৩০০ আসনের সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী এবং জেলা প্রশাসক সামিউল ফেরদৌসসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সরেজমিন মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।
উপজেলাগুলোর মধ্যে আলীকদমের নিম্নাঞ্চল মাতামুহুরীর পানিতে ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে। সেখানে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় চরম যাতায়াত সমস্যার মধ্যেই সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী কোনো বাধা না মেনে কলার ভেলায় চড়ে প্রত্যন্ত দুর্গত এলাকায় যান। তিনি বন্যার্তদের খোঁজখবর নেন এবং তাদের আশ্বস্ত করেন।
পরিদর্শন শেষে তিনি আলীকদম উপজেলা পরিষদে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় নেতাদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে দুর্গতদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো, চিকিৎসাসেবা এবং বন্যাপরবর্তী পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনা হয়।
সংসদ সদস্য জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক হাজার ৩৩০টি পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে এবং প্রতিটি পরিবারের কাছে খাবার ও ওষুধ না পৌঁছানো পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।
মানবিক সহায়তায় বিজিবি
বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে বাস্তুহারা হয়ে পড়া অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। প্রতিকূল আবহাওয়া ও তীব্র স্রোত উপেক্ষা করে বিজিবি বান্দরবান সেক্টর কমান্ডার কর্নেল রুবায়াত জামিলের নেতৃত্বে গতকাল রাত থেকে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
বিজিবি সদস্যরা জেলা সদরের পার্শ্ববর্তী ক্রাইক্ষ্যংপাড়া এলাকা থেকে ১২২টি পরিবারকে নিরাপদে উদ্ধার করেন। উদ্ধারদের ‘শহীদ মোশাররফ বিজিবি স্কুল’ ও ‘ক্রাইক্ষ্যংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ আশ্রয়কেন্দ্রে দেওয়া হয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ওষুধ ও অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও অসুস্থদের অগ্রাধিকার দিয়ে সার্বিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দেশের যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় তাদের এ মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

