আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ক্রীড়ায় রমজান

ইসলাম পগবার জীবনের সবকিছু

নজরুল ইসলাম

ইসলাম পগবার জীবনের সবকিছু
পল পগবা

মা ছিলেন মুসলিম। কিন্তু মুসলিম ছিলেন না পল পগবা। কেননা, তিন ছেলেকে সেভাবে গড়ে তোলেননি তার মা। ১৯৯৩ সালে জন্ম নিলেও ফ্রান্সের এ তারকা ফুটবলার ইসলামের ছায়াতলে নিজেকে নিবেদন করেন ২০১৯ সালে এসে। সতীর্থ ও বন্ধুদের সঙ্গে মিশে বনে যান ধর্মপ্রাণ মুসলিম। ব্যক্তিগত জীবনের দুঃসময় কাটাতে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনে ইসলামি অনুশাসন পালনে যত্নবান হয়ে ওঠেন। মাঠের বাইরের সেই পুরোনো সুখস্মৃতি রোমন্থন করে পগবা খুলে দেন মনের ঝাঁপি, ‘মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করিনি। যদিও আমার মা মুসলিম ছিলেন। তবে বড় হয়েছি সবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। আমার অনেক মুসলিম বন্ধুবান্ধব রয়েছে। আমরা সব সময় কথা বলতাম। নিজের কাছেও প্রশ্ন ছুঁড়তাম। বন্ধুদের সঙ্গে একবার নামাজ পড়তে যাই। তারপরই বুঝতে পারি অন্যরকম লাগছে। আমার খুব ভালো লেগেছিল। তারপর থেকে নামাজ আদায় শুরু করি। নামাজ ইসলামের মূল স্তম্ভ। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করি আর তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।’

বিজ্ঞাপন

মুসলমান হয়েই খুশির খবরটা ভক্ত-সমর্থকদের দেন পগবা। কিন্তু কেন শান্তির ধর্মকে গ্রহণ করেছেন? ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন তিনি ঠিক এভাবেই- ‘আরো ভালো মানুষ হওয়ার জন্য আমি মুসলিম হয়েছি।’ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক এ ফুটবলার আরো যোগ করেন, ‘ইসলাম আমার চোখ খুলে দিয়েছে। আমাকে ভালো মানুষে পরিণত করেছে। ইসলাম মানবতাকে শ্রদ্ধা করে।’

ইসলামকে পগবা কীভাবে দেখেন? শোনা যাক তার কণ্ঠেই, ‘ইসলাম জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে দিয়েছে। ইসলাম ধর্ম জীবনের সবকিছু। এই ধর্ম আমাকে পরিবর্তন করেছে, জীবনের অনেক কিছু আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমার ধারণা, এটা আমার ভেতরে আরো বেশি শান্তি এনে দিয়েছে। আমার জীবনে একটা ভালো পরিবর্তন এনেছে।’

মুসলিম বলতে কী বোঝায়? ব্রিটিশ জাতীয় দৈনিক দ্য টাইমসকে ফরাসি ফুটবলের মাঝ মাঠের এই তারকা বলেন, ‘ইসলামকে প্রত্যেকে যেভাবে দেখে; সন্ত্রাস আর ইসলাম এক নয়। এর সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নেই। গণমাধ্যমে আমরা যা শুনি, সেটা ভিন্ন বিষয়। এটা খুব সুন্দর একটি ধর্ম। এ বিষয়ে আপনাকে জানতে হবে। ইসলামের অনেক সৌন্দর্য রয়েছে। আপনি তা যাচাই করতে পারেন। যে-ই অনুসন্ধান করবে, সে-ই ইসলামের প্রতি মুগ্ধ হবে। আমি নিজেকে পরিবর্তন করেছি। আমি জীবনের নানা দিক নিয়ে ভেবেছি। আমার মনে হয়েছে, ইসলাম আমার হৃদয়কে প্রশান্ত করেছে।’

আখিরাত নিয়েও তার ভাবনার শেষ নেই। এ জন্যই তো পগবা সন্ধি করেছেন ইসলামের সঙ্গে। নিজেকে সমর্পণ করেছেন আল্লাহতায়ালার দরবারে, ‘ইসলাম আমার হৃদয়ের বন্ধ কপাটগুলো খুলে দিয়েছে। আমাকে মানুষ ও মানবতার প্রতি সম্মান দেখাতে শিখিয়েছে। ইসলাম মানুষ মাত্রই সম্মানদানের কথা বলে, সে যে ধর্মকেই অনুসরণ করুক না কেন। আমার বিশ্বাস, ইসলাম আমাকে একজন ভালো মানুষে পরিণত করবে। আপনি মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের কথা যত ভাববেন, জীবনের তত বেশি স্বাদ খুঁজে পাবেন।’

২০২০ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যে তোলপাড় শুরু হয়েছিল মুসলিম বিশ্বে। বইয়ে গিয়েছিল সমালোচনার ঝড়। মুসলমানদের তুমুল প্রতিবাদের মাঝে খবর রটে যায়! প্রতিবাদস্বরূপ ফ্রান্সের জার্সিতে আর দেখা যাবে না পগবাকে। এই উড়ো খবর নিয়ে সারা বিশ্বে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভুয়া সংবাদ বলে পগবা উড়িয়ে দেন পুরো ব্যাপারটা। তাকে নিয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রচারের জন্য ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড দ্য সানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও হুমকি দেন অন্তঃপ্রান্ত এই মুসলিম ফুটবলার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে ভুয়া খবরের প্রতিক্রিয়ায় পগবা লেখেন, ‘খবরটি শুনে আমি স্তম্ভিত, ক্ষুব্ধ ও ধাক্কা খেয়েছি। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম ফরাসি জাতীয় দল ও আমার ধর্ম একসঙ্গে মিশিয়ে ভুয়া খবর তৈরি করেছে। আমি সব ধরনের সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে। আমার ধর্ম শান্তি ও ভালোবাসার এবং এই ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে হবে।’

রমজানেও দাপুটে পারফরম্যান্স দিয়ে যান পগবা। খেলার মাঠে ঝলক দেখান তিনি রোজা রেখেই। সিয়াম সাধনার সঙ্গে নিজেকে ঝালাই করে নেন মাঠের অনুশীলনেও। ৩১ বছরের এই তারকা প্লেমেকার রোজা ভাঙেননি কখনো। এ জন্য অবশ্য কোনোরকম অসুস্থতায়ও পড়েননি। রমজান নিয়ে পগবা বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরেই রমজানে আমি এমনটা করে আসছি। আমার একজন পেশাদার পুষ্টিবিদ রয়েছেন, যিনি আমাকে সহায়তা করেন। আমাকে বলে দেন, কখন কী খেতে হবে এবং কখন অনুশীলন করতে হবে। পুষ্টিকর খাবার আমার কাছে পাঠিয়ে দেন। যে কারণে আমার খুব বেশি সমস্যা হয় না এবং বেশ ভালোই থাকি।’

নিয়মিত সালাত আদায় করেন পগবা। রোজা রাখেন। হজব্রত পালন করেছেন। বিয়ার, মদ বা অ্যালকোহল থেকে নিজেকে রাখেন দূরে। ইসলামি রীতিনীতির শিক্ষা মেনে করেন দানও। দারিদ্র্য বিমোচনে যুক্তরাজ্যে চালু করেন নিজস্ব তহবিল। দাঁড়ান অসহায় মানুষদের পাশে। মাঠের বাইরের পগবা আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছেন দানবীর। মানবহিতৈষী কাজে সময় দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ পগবা ভালোভাবেই টের পেয়েছেন, ফুটবল মাঠের ৯০ মিনিটের চেয়ে জীবনের লড়াই আরো কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। ফ্রান্সের জার্সিতে বিশ্বকাপজয়ী এ স্টার ফুটবলার বেড়ে উঠেছেন রোইসির মতো অপরাধপ্রবণ এলাকায়। দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাতে একসময় ফুডব্যাংকের সামনে মায়ের সঙ্গে লাইনে দাঁড়াতেন। সেই স্মৃতি এখনো ভোলেননি।

রাশিয়া বিশ্বকাপ জয় অনেক সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে ফ্রান্সে। দেশটিতে অহেতুক মুসলিমভীতি হ্রাস পেয়েছে। দেশপ্রেমের প্রশ্নে অভিবাসী মুসলিমরা উত্তীর্ণ। এখানে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন পগবা। তাইতো হৃদয়ে গর্ব নিয়ে পল পগবা বলে দিয়েছেন, ‘আজকের ফ্রান্স নানা রঙে রাঙানো। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক অবস্থান করছে। তারা সবাই মিলে ফ্রান্সকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। আমরা সবাই ফ্রান্সকে অনুভব করি, হৃদয় দিয়ে ধারণ করি। আমরা খুব খুশি এবং গর্বিত জাতীয় দলের এই টি-শার্টটি পরতে পেরে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন