পাকিস্তান হোয়াইটওয়াশড

এম. এম. কায়সার, সিলেট থেকে

পাকিস্তান হোয়াইটওয়াশড

ধসে পড়া ব্যাটিং। ভঙ্গুর জুটি। বিশৃঙ্খল বোলিং। এলোমেলো ফিল্ডিং। ভুলে ভরা রিভিউর সিদ্ধান্ত। দিশাহীন নেতৃত্ব। টেস্টে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে আর করুণ সময় পার করছে। দলটি হলো পাকিস্তান।

সাবলীল বোলিং। জুটিতে বড় রান। শক্তিমান বোলিং। পেসে নতুন বিপ্লব। চৌকস ফিল্ডিং। অধিনায়ক নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামনে থেকে। টেস্টে নিজেদের সোনালি সময় যাচ্ছে। বলা হচ্ছে এটাই দেশটির সেরা টেস্ট দল। দলটি বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

ঠিক এমনই বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে এখন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ টেস্ট দল। আর তাই এবারও দুই টেস্ট সিরিজের ফলাফল হয়েছে যথারীতি বাংলাদেশ ২, পাকিস্তান ০। যথারীতি বলা এ কারণে যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এমন সাফল্য বাংলাদেশের এটাই প্রথম নয়। দুবছর আগে পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার নিজ মাটি ঢাকা ও সিলেটে দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশের দুর্দান্ত ক্রিকেটের কাছে পাকিস্তান ধবলধোলাই!

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বাংলাদেশই একমাত্র দল, যারা পাকিস্তানকে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করেছে। হ্যাঁ, আপনি ঠিক পড়ছেন, অস্ট্রেলিয়াও এ কাজটি করতে পারেনি! আর জিম্বাবুয়েকে টানা চার টেস্টে হারানোর পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় কোনো দলের বিরুদ্ধে এমন কৃতিত্বের নজির গড়ল।

সিলেট টেস্টের শেষদিন জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২১ রান। বাংলাদেশের দরকার ছিল তিন উইকেট। মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যাটিং পাকিস্তানের আশা বাঁচিয়ে রেখেছিল। শেষ তিন উইকেটে শেষদিন ১২১ রান তোলা অনেক দূরের পথ। কিন্তু রিজওয়ানের ফর্মে ফেরা ইনিংসে শেষদিনে আরো নাটকীয় কোনোকিছু অপেক্ষা করছে কি নাÑসে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল। পঞ্চম দিন সকালে বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট পর খেলা শুরু হলো। শুরুতেই পাকিস্তান আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট চালায়। শুরুর আধঘণ্টায় পাঁচটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে রিজওয়ান ও সাজিদ খান বাংলাদেশের টেনশন যেন বাড়িয়ে দিলেন। দুই পাশ থেকে নাহিদ রানা ও তাসকিন আহমেদ বেশ দক্ষতার সঙ্গে দুই পাকিস্তানিকে সামাল দিচ্ছিলেন। স্কোরবোর্ডে পাকিস্তানের রান বাড়ছে আর মাঠে বাংলাদেশের ফিল্ডারদের শারীরিক ভাষা ও নড়াচড়ায় দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। তবে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত তার আক্রমণের পরিকল্পনায় স্থির থাকেন। সাজিদ মাঝে নাহিদ রানার বলে একটা ক্যাচ তুলে দেন। ফলো থ্রুতে নাহিদ রানা ও উইকেটকিপার পজিশন থেকে লিটন দাস এবং শর্ট ফাইন লেগে দাঁড়ানো তাইজুল ইসলাম তিনজনই ছুটলেন ক্যাচটা নিতে। আমি না, ও ধরবে... এমন করতে করতে কেউই শেষ পর্যন্ত ক্যাচের নিচে এলেন না। নিশ্চিত ক্যাচ মাটিতে! দূরত্বের বিচারে মূলত ক্যাচটি তাইজুলেরই ধরা উচিত ছিল। সে দুঃখ অবশ্য খানিক বাদে ঘুচিয়ে দিলেন তাইজুল সাজিদ খানকে আউট করে। স্লিপে ক্যাচটি নিলেন শান্ত। পেস বিপ্লবের গান গাওয়া এ দলে স্পিনার তাইজুল ইসলাম সময়-অসময়ে নীরব সাধক হয়ে পুরো দলের সাফল্যে অনন্য ভূমিকা রাখছেন।

সকালে সাজিদ খানের উইকেটের পতনেই মূলত পাকিস্তানের শেষের ধস শুরু। অপর প্রান্ত থেকে পরের ওভারেই শরিফুল পাকিস্তানের কফিনে যেন শেষ পেরেকটি ঠুকলেন। অফস্টাম্পের বাইরে পড়া তার বলে কাট খেলতে গিয়ে মোহাম্মদ রিজওয়ান গালি অঞ্চলে ক্যাচ দেন। মেহেদি হাসান মিরাজ দুহাত পেতে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ক্যাচ তার হাতে জমা হতেই বাংলাদেশ শিবির উল্লাসে ফেটে পড়ে। জয় তখন বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষার প্রহর মাত্র। ১৬৬ বলে ৯৪ রানে আউট হয়েও অনেকক্ষণ অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকেন রিজওয়ান। যেন মাঠ ছাড়তেই মন চাইছিল না! কারণ ভালোই জানা ছিল তার, এ আউটেই যে শেষ পাকিস্তানের টিমটিমে স্বপ্ন। ধীর পায়ে ড্রেসিংরুমে ফেরেন রিজওয়ান। আরেকদিকে বাংলাদেশ জয়ের পথে এগিয়ে চলে যেন রকেটের গতিতে। পরের ওভারেই তাইজুলের বলে খুররাম শাহজাদ ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ তোলেন। ওয়াইড লং অনে তানজিদ হাসান তামিম ক্যাচটি নিতেই মাঠ, গ্যালারি, এমনকি প্রেস বক্সেও আনন্দ-উল্লাসের নহর বয়ে গেল। ২-০-এর মিশন সফল। দুর্দান্ত দাপটে টেস্টে পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে নতুন দিনের পথচলার সুস্পষ্ট বার্তার ঘোষণা দিল।

শেষদিনের সকালে মাত্র এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটে খেলা সাঙ্গ হওয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ এমন। এ সময়ে খেলা হলো মাত্র ১১.২ ওভার। পাকিস্তান যোগ করল ৪২ রান। উইকেট হারাল তিনটি। যে ইনিংসে বোলার হিসেবে কীর্তিমান হয়ে রইলেন তাইজুল ইসলাম। ১২০ রানে শিকার করলেন ছয় উইকেট। টেস্ট ইনিংসে পাঁচ বা তারচেয়ে বেশি উইকেট শিকারের এটি তার ১৮তম কৃতিত্ব।

টানা চার টেস্টে বাংলাদেশের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি পাকিস্তান। দুবছর আগে রাওয়ালপিন্ডির টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ জিতেছিল ১০ এবং ছয় উইকেটে। এবার নিজ মাটিতে জিতল ১০৪ ও ৭৮ রানে। এ চারটি জয়ই বড় ব্যবধানে। চার ম্যাচেই প্রভাব-প্রতিপত্তি, কৌশল-পরিকল্পনা, ব্যাট-বলের লড়াইয়ের সঙ্গে মানসিক যুদ্ধে জেতার পণ; সবকিছুতেই পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে থেকে জিতেছে বাংলাদেশ।

অথচ কয়েক বছর আগেও ঠিক উল্টো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। র‍্যাংকিং, রেটিং পয়েন্টে উন্নতি, গেম রিডিংয়ে দক্ষতা, লড়াকু মানসিকতা, প্রভাবী পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা, একজোট হয়ে খেলার দলীয় সংহতি, খেলোয়াড়দের ওয়ার্ক এথিকস, সর্বোপরি জেতার জেদÑএসব আনুষঙ্গিক বিষয় এক মুঠোয় নিয়ে এখন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত তাই বলতে পারছেনÑ‘এই দলের অধিনায়ক হিসেবে আমি গর্বিত।’

টেস্ট দলকে নিয়ে পুরো বাংলাদেশ এখন তেমনই গর্বিত।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : ২৭৮ ও ৩৯০/১০ (জয় ৫২, লিটন ৬৯, মুশফিক ১৩৭, তাইজুল ২২, খুররাম সাজ্জাদ ৪/৮৬, সাজিদ ৩/১২৬)।

পাকিস্তান : ২৩২ ও ৩৯৮/১০ (৯৭.২ ওভারে, শান মাসুদ ৭১, বাবর আজম ৪৭, সালমান আগা ৭১, রিজওয়ান ৯৪, সাজিদ ২৮, তাইজুল ৬/১২০, নাহিদ রানা ২/৭১, শরিফুল ১/২৯)।

ফল : বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা : লিটন দাস।

সিরিজসেরা : মুশফিকুর রহিম।

সিরিজের ফল : বাংলাদেশ ২, পাকিস্তান ০।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন