জাতীয় স্টেডিয়াম চত্বর

অপরিচ্ছন্ন, মাদকের স্বর্গ, ক্রীড়াবান্ধবহীন পরিবেশ

অপরিচ্ছন্ন, মাদকের স্বর্গ, ক্রীড়াবান্ধবহীন পরিবেশ

জাতীয় স্টেডিয়াম দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সূতিকাগার। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই স্টেডিয়াম এলাকার পরিবেশ ক্রীড়াবান্ধব নয়। দীর্ঘমেয়াদি সফল কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো সুরক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এখনো জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকায় ক্রীড়ার পরিবেশ তৈরি করা যায়নি। সরেজমিনে দেখা যায় স্টেডিয়াম এলাকার ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র। স্টেডিয়ামের এক নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে, ভেতরে গাড়ি, রিকশা-ভ্যানের জট, জনজট আর হকারদের দৌরাত্ম্য। স্থানে স্থানে পান-সিগারেটের দোকান, চায়ের দোকান, ফুচকার দোকান, কী নেই সেখানে! পুরো স্টেডিয়াম এলাকা ঘুরলে বেশকিছু জায়গায় নাকে পচা দুর্গন্ধ আসবে। বিশেষ করে ফ্লাডলাইটের টাওয়ারগুলোর নিচে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। স্টেডিয়ামের দোকানগুলোর সামনে স্থানে স্থানে জমে থাকা বর্জ্য দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বেশকিছু জায়গায় মনুষ্য বর্জ্যও পরিবেশ ভারী করে তুলছে। শুধু তা-ই নয়, মাদক সেবনের নিরাপদ জায়গাও স্টেডিয়াম এলাকা। আউটার স্টেডিয়ামে দিনদুপুরে দেখা যায় মাদক সেবনের দৃশ্য। আর রাতে ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয় স্টেডিয়ামের বারান্দা। যে জাতীয় স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে দেশের অধিকাংশ ক্রীড়া ফেডারেশন ও সংস্থা গড়ে উঠেছে, যে স্টেডিয়ামে বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড় লিওনেল মেসি, জিনেদিন জিদানের পা পড়েছে, যে স্টেডিয়ামকে ঘিরে অনেক স্মৃতি ও গর্বের বিষয় রয়েছে- অযত্ন-অবহেলায় সেই ক্রীড়া স্থাপনাটির পরিবেশের এমন দুরবস্থা- সত্যিই ক্রীড়ামোদীদের জন্য মন খারাপ করার মতো বিষয়।

স্টেডিয়ামের বৈরী পরিবেশের জন্য সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে দায় এড়াতে পারে না জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। জাতীয় স্টেডিয়ামের গুলিস্তানমুখী গেট থেকে দিলকুশামুখী গেটের রাস্তাটি বাইপাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতি বছর ইজারা দিয়ে প্রচুর আয় করে ক্রীড়া পরিষদ। এক নম্বর গেটে ক্রীড়া পরিষদের লোগো সংবলিত একটি ব্যানারও টাঙানো আছে। টিকিটের মূল্য (১০, ২০ ও ১০০ টাকা)। ইজারাদারের নাম দিয়ে নিচে লেখা হয়েছে ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত, ইজারাদার দায়ী নয়।’ অর্থাৎ স্টেডিয়ামকে ‘বাইপাস’ বানিয়ে সৌন্দর্যহানি করে প্রতি বছর ইজারা দিয়ে আয় করে ক্রীড়া পরিষদ।

বিজ্ঞাপন

সংস্কারের ফলে জাতীয় স্টেডিয়ামের ভেতরের অংশ নবরূপে সেজেছে। কিন্তু স্টেডিয়ামের বাইরের পরিবেশ ক্রীড়াবান্ধব নয়। এ প্রসঙ্গে জাতীয় স্টেডিয়ামের প্রশাসক কামরুল ইসলাম কিরণ আমার দেশকে বলেন, ‘আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। যেহেতু আমরা সংস্কারের মধ্যে আছি, রাস্তার কার্পেটিং তো হলো কয়েকদিন ধরে। রোডের কাজগুলো মাত্র শেষ হলো। হকারদের দৌরাত্ম্য আছে। তাদের উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। এই উঠাই, আবার এসে বসে। এছাড়া আমাদের স্টেডিয়ামটি অনেক অরক্ষিত। যে কেউই ঢুকতে পারে। চারটি গেট, যেহেতু গাড়ি ঢোকার অনুমিত আছে। মূল কথা হলো মার্কেট আছে। এটা থাকার কারণেই সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার দিতে হবে। মানুষ কেন ঢুকছে, সেটি তো আর বোঝা যায় না। এখানে বাধ্যবাধকতা দিয়েও লাভ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়টিকে আমাদের আরো জোরদার করতে হবে। এ নিয়ে অফিস (এনএসসি) চিন্তাভাবনা করছে। আমাদের নিরাপত্তাকর্মীর খুবই সংকট। যে কারণে আমরা পেরে উঠতে পারছি না। আমাদের ভেন্যুতে ১০ জন নিরাপত্তাকর্মী আছেন। তাদের দিয়ে আমাদের তিন শিফটে কাজ করতে হচ্ছে। এটি নিয়ে অফিস কাজ করছে। আশা করি, আমরা খুব অল্প সময়েই ভালো কিছু করতে পারব।’ পুরো জাতীয় স্টেডিয়ামের জন্য ক্লিনার মাত্র ৩ জন। জনবল সংকটের কথা জানান কিরণ।

স্টেডিয়ামের পরিবেশ প্রসঙ্গে ক্রীড়া পরিষদের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মো. আজমুল হক আমার দেশকে বলেন, ‘এখানে দোকানপাট স্টেডিয়ামের শুরু থেকে আছে। আমি এখানে চাকরি করছি তিন বছর হলো। বলেন তো কী করব? পরামর্শ কী বলেন? আপনি একজন ভদ্রলোক মানুষ, ক্রীড়ামোদীরা টিকিট কেটে খেলা দেখতে যাবেন। ঢুকবেন কোন দিক দিয়ে? প্রশ্নটা ওই জায়গায় না? গেটগুলোয় পর্যন্ত দোকানপাট দিয়ে বসে আছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে, ভাই এগুলো সরাও। আমরা ওখানে কাজ করব। গেটগুলো মেরামত করতে হবে। তারা আবার উল্টো আবেদন দেয়, ওখানে মাদক চলে, নোংরা হয়, তাই আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছি।’ পরিবেশ সুন্দর করার জন্য স্টেডিয়ামের প্রশাসককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান আজমুল হক। তিনি বলেন, ‘প্রশাসককে বলা হয়েছিল- যারা অস্থায়ীভাবে অবস্থান নিচ্ছে, যারা বৈধ নয়, তাদের সরে যাওয়ার জন্য আলটিমেটাম দিয়েছি। আমাদের প্রশাসক জনে জনে গিয়ে জানিয়েছেন। তারা বলেছে আমরা সরে যাব। দোকানদারকে বলেছি, আপনার যেটুকু জায়গা লিজ নিয়েছেন, যতটুকু দোকান ভাড়া আছে, সেই জায়গার মধ্যে চলে যান। বাইরে যেটুকু দখল করেছেন, সে জায়গা ছেড়ে দেন।’ দীর্ঘদিন ধরে স্টেডিয়ামে যে বৈরী পরিবেশ তৈরি হয়েছে- এর দায় কী এড়াতে পারে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ? আজমুল হক বলেন, ‘এনএসসির দায় হচ্ছে, এনএসসির তো আর অফিস শেষে কন্ট্রোল থাকে না। ধরেন আমার অফিসের সামনে ফুটপাত ধরে দোকান। এখানে কতজন নেতা ছিল আগে? সেরনিয়াবাদ, খলিল- এরা নাকি এগুলো সব সমন্বয় করতো। এখন যদি আমাকে এগুলো সরাতে হয়, উচ্ছেদ করতে হয়, তাহলে সিটি করপোরেশন লাগবে, ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে, পুলিশ লাগবে। সবগুলো নিয়ে আমাদের মুভ করতে হবে। আমরা এগুলো নিয়ে অফিসিয়ালি কাজ করছি। খুব তাড়াতাড়ি হয়তো আমরা এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যে চলে যেতে পারব।’

এদিকে স্টেডিয়ামে পরিবেশ ঠিক করার জন্য ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে দোকান মালিক সমিতি সহযোগিতা করে না বলে অভিযোগ করে। এ প্রসঙ্গে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএম আব্বাস আমার দেশকে বলেন, ‘ক্রীড়া পরিষদ আমাদের সহযোগিতা করে না। কন্টাক্টরের মালামাল রাখায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাতে দোকানে কাস্টমার আসে না। আমরা চাই সুন্দর পরিবেশ।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন