আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আজাদ মজুমদারের বিশ্লেষণ

কাজটা বিশাল, পরিশ্রম হয়েছে সঙ্গে অনন্য অভিজ্ঞতা পেয়েছি

আজাদ মজুমদার

কাজটা বিশাল, পরিশ্রম হয়েছে সঙ্গে অনন্য অভিজ্ঞতা পেয়েছি

আমরা এর আগে দেখেছি যে সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে তখন মূলত এক, দুইজন বা সর্বোচ্চ পাঁচজন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার জন্য সেটা করা হয়েছে। যেমন একজন নির্বাচন কমিশনার খুঁজে বের করার জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা অল্প কিছু মিটিং করে বা কিছু স্টেকহোল্ডারকে জানিয়ে কাজটা দ্রুততার সঙ্গে শেষ করতে পেরেছেন। কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনে সার্চ কমিটির কাজের ব্যাপকতা ছিল আরো অনেক বেশি। আমাদের ৫০টির বেশি ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশন আছে। প্রত্যেকটাতে যদি আমরা ২০ জন করে কমিটি সদস্য রাখি তাহলেও আমাকে এক হাজারের কাছাকাছি ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে হবে। সেই সঙ্গে এমন লোককে খুঁজে বের করতে হবে যাদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা আছে, স্পোর্টসে আগ্রহ আছে, অতীতে দুর্নীতির অভিযোগ নেই বা যারা ক্রীড়াঙ্গনকে ব্যবহার করে অতীতে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেনি এমন লোকদের খুঁজে বের করা। এটা সত্যিকার অর্থেই কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটা করতে গিয়ে আমাদের যথেষ্ট হিমশিম খেতে হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে যখন নতুন করে সবকিছু ঢেলে সাজানো হয় তখন অনেক সুবিধাভোগী সুবিধা নিতে চায়। নানা ধরনের চেষ্টা-তদবির শুরু হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেকেই হুমকি-ধমকিও দেয়। আমরা এসব বিষয়ে একেক ফেডারেশনের একেক ধরনের সমস্যা দেখেছি। সেটা সমাধানের চেষ্টা করেছি। বৈচিত্র্যময় সমস্যার মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। অনেকগুলো ফেডারেশনে আমরা পেয়েছি যেখানে সত্যিকার অর্থেই যারা সংগঠক এবং খেলোয়াড়রা খুবই আন্তরিক। তাদের সহযোগিতা আবার দু-একটা ফেডারেশনে হিমশিম খেয়েছি। কারণ সংগঠকদের মধ্যে ঐক্য নেই এবং কেউ কাউকে মেনে নিতে আগ্রহী না। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের যে পলিসি ছিল সে পলিসির কারণে আমরা কাউকে কাউকে রাখার ইচ্ছা সত্ত্বেও রাখতে পারিনি বা যে দায়িত্বে দেওয়ার চেষ্টা ছিল সেটা পারিনি শুধু নীতির লঙ্ঘন হবে বলে। সবকিছু মিলিয়ে বিশাল একটা ক্যানভাসের মধ্যে আমাদের কাজটা করতে হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টা যতটা সহজ মনে হয়েছে ততটা সহজ ছিল না।

অনেকে হয়তো জানেন না, প্রথমে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যখন এই সার্চ কমিটি করেছিল যেখানে যে টার্মস অব রেফারেন্স তৈরি ছিল সে অনুযায়ী কিন্তু আসলে সার্চ কমিটি অ্যাডহক কমিটির নাম সুপারিশ করাটা ছিল তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব। টার্মস অব রেফারেন্সে তাদের বিভিন্ন ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র নিয়ে কাজ করতে বলা হয়েছিল। এই সার্চ কমিটি বিভিন্ন ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র নিয়েও কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। ৫৫টার মতো ফেডারেশন এবং অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। মতবিনিময় হয়েছে। একেকটা মতবিনিময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন থেকে চার ঘণ্টাও ধরেও চলেছে। কোনো কোনো ফেডারেশনের সাবেক কর্মকর্তা খেলোয়াড় মিলিয়ে এমন মতবিনিময়ে ১০০ জনের মতো উপস্থিত ছিলেন। গঠনতন্ত্র নিয়ে তাদের পরামর্শ মতামতও আমরা লিখে রেখেছি। ভিডিও রেকর্ডও রাখা হয়েছে। এগুলো সমন্বয় করা একটা কাজ ছিল। আর বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে যেহেতু সরকার বিভিন্ন ফেডারেশনে অ্যাডহক কমিটি করার জন্য বলেছে, সেই কাজ একটু দেরি হলেও আমরা সম্পন্ন করেছি। সোমবার (আজ) দুপুরে বাকি ফেডারেশন এবং অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাডহক কমিটির নামগুলো আমরা ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে হস্তান্তর করব। মনে রাখতে হবে সার্চ কমিটির কাজ কিন্তু চূড়ান্ত না। তারা শুধু সম্ভাব্য অ্যাডহক কমিটির নাম সুপারিশ করতে পারে সরকারের কাছে। কমিটি করে দেওয়ার এখতিয়ার কিন্তু সার্চ কমিটির নেই। প্রজ্ঞাপন জারির কাজটা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বা মন্ত্রণালয়কে করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, সার্চ কমিটি যে কমিটি সুপারিশ করেছে সেই কমিটি মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত অনুমোদন করেনি। এই বিলম্বের জন্য তাদের কাছে নিশ্চয়ই ভ্যালিড কোনো কারণ থাকতে পারে। তবে এই দেরি কেন হয়েছে, তা যথাযথ ব্যাখ্যাটা আসলে তারা দেবে। শুটিং ফেডারেশনের জন্য তিন মাস আগে সার্চ কমিটি থেকে প্রস্তাবিত কমিটির নামগুলো দেওয়া হয়েছে। তিন মাসেও সেটার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আমরা পরে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি কোথায় কোথায় সমস্যা আছে। তারা বলেছে কমিটিতে প্রস্তাবিত যে নামগুলো আছে সেগুলো তারা যাচাই-বাছাই করছে। যেহেতু শুটিং খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয়। কারণ এখানে অস্ত্রের একটা সংযোগ রয়েছে। শুটিংয়ের নামে অতীতে আমরা যা দেখেছি যে, অস্ত্র ব্যবসায়ীরা শুটিংয়ের সঙ্গে জড়িত। জুলাই বিপ্লবেও অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে। আমি যখন সাংবাদিক ছিলাম, শুটিং ফেডারেশনের একজন সাধারণ সম্পাদককে হাজতে গিয়ে ইন্টারভিউ করেছি অস্ত্র সংক্রান্ত দুর্নীতির কারণে। যেহেতু এখানে অস্ত্রের বিষয় আছে তাই এটা খুবই স্পর্শকাতর। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে হয়তো কমিটিটা ঘোষণা করতে তে চাচ্ছে না। তাই হয়তো বিলম্ব হচ্ছে। যদিও আমি মনে করি এতটা বিলম্ব হওয়া উচিত না। দ্রুতগতিতে কাজটা শেষ করতে পারলে ভালো হতো। তো কিছু কিছু ফেডারেশনের ক্ষেত্রে এমন হচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় সার্চ কমিটি থেকে কমিটি দেওয়ার পর নানা জায়গা থেকে তদবির বা চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে। আর্চারি ফেডারেশনের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল, সার্চ কমিটি যে অ্যাডহক কমিটি দিয়েছিল সেটাকে তদবিরের জোরে বদলিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কমিটির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আমাদের ক্রীড়া উপদেষ্টার দৃষ্টিগোচর হওয়াতে তিনি ওই কমিটিকে বাতিল করে সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত কমিটিকে অনুমোদন দিয়েছিলেন। তো এরকম কিছু কিছু জটিলতা বিভিন্ন ফেডারেশনে তৈরি হয়েছে। এসব জটিলতার কারণে এই কমিটিগুলো গঠনে বিলম্ব হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবের বলয় থেমে মুক্ত রাখতে এবং দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেশনকে যারা নিজেদের সম্পদ সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছিলেন তাদের জায়গায় যোগ্য এবং দক্ষ সংগঠকদের খুঁজে বের করার জন্য সার্চ কমিটি তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। আর এটা জানা কথা যে এসব কমিটিতে যারা জায়গা পাননি তারা মনঃক্ষুণ্ণ হবেন। অভিযোগ করবেন। সরকার অ্যাডহক কমিটি গঠনে যে নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছিল আমরা সেটা মেনেই চলার শতভাগ চেষ্টা করেছি। পেছনের এই সাত-আট মাসে এই কাজে আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি, তবে কিছু অনন্য অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি এবং ক্রীড়াঙ্গনের সার্চ কমিটির সদস্য।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন