ফুটবলে কিছু ম্যাচ থাকে, যেখানে ৯০ মিনিট বা শেষ বাঁশির হিসাব-নিকাশ যথেষ্ট নয়, সবকিছু নয়। ম্যাচের ফলাফল সব গল্প বলে না। এমন কিছু ম্যাচ আছে যার প্রতিটি মিনিটে রয়েছে ইতিহাসে ফিরে যাওয়ার আনন্দ-বেদনার কাব্য।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড তেমনই এক ম্যাচ। আটলান্টায় আজ রাতের সেমিফাইনাল কি আরেকটি তেমনই চিরস্মরণীয় ইতিহাসের জন্ম দেবে?
এই ম্যাচ যে নেহাত বিশ্বকাপের আরেকটা সেমিফাইনাল নয়। এটি যেন অসমাপ্ত ফুটবল উপাখ্যানের নতুন অধ্যায়। একদিকে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। অন্যদিকে শতাব্দীর সেরা গোল। একদিকে ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত। অন্যদিকে ছয় দশকের ইংলিশ অহংকার। চার দশক ধরে এই দুই দেশের প্রতিটি বিশ্বকাপ লড়াই যেন শুধু খেলা বা গোলের লড়াই নয়, অতীত ঐতিহ্যের স্মৃতি এবং তর্ক-বিতর্কের স্মারকও বটে!
আজ বুধবার আটলান্টার রাত সেই স্মৃতিকেই আবার জাগিয়ে তুলবে। আর সেই রাতের কেন্দ্রে থাকবেন একজন মানুষ। নাম তার লিওনেল মেসি। বিশ্বফুটবলের প্রায় সব শিখরই ছুঁয়েছেন তিনি। জিতেছেন অসংখ্য ট্রফি। বিশ্বকাপও জেতা হয়ে গেছে তার। এখন একটাই লড়াই বাকি, সেই শিরোপা অক্ষুণ্ণ রাখার জেদে জেতা। খেলেছেন হাজারো যুদ্ধ। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি—বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটাই হবে তার প্রথম ম্যাচ। হয়তো এটাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রতীকী লড়াই। কারণ প্রতিপক্ষ শুধু ইংল্যান্ড নয়, প্রতিপক্ষ ১৯৮৬-এর কিংবদন্তিও।
সেদিন ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই ম্যাচে সৃষ্টি করেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত, আবার সবচেয়ে অলৌকিক গোলও। একটি হাত তাকে ভিলেন বানিয়েছিল, আর মিনিট চারেক পরে বাম পায়ে বল নিয়ে একটি দৌড় তাকে অমর করে দিয়েছিল। সেই এক বিকালেই তিনি কিংবদন্তি থেকে ফুটবলের পৌরাণিক চরিত্রে পরিণত হন।
চার দশক পরে ইতিহাস যেন একই প্রশ্ন আবার ছুড়ে দিচ্ছে। মেসিও কি পারবেন এমন একটি রাত লিখতে, যেটি আগামী ৪০ বছর ধরে ফুটবল পৃথিবী মনে রাখবে? তিনি এখন দুর্দান্ত ছন্দে। আট গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে। এখনো বিশ্বের সেরা ফুটবলার। কিন্তু কিংবদন্তিদের জীবনেও কিছু ম্যাচ থাকে, যেখানে শুধু ভালো খেললেই হয় না—ইতিহাসও লিখতে হয়।
আজ রাতে আটলান্টা হয়তো তার সেই পরীক্ষার মঞ্চ।
১৯৮৬ সালের সেই দুপুরে মেক্সিকো সিটির অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামে ডিয়েগো ম্যারাডোনা যা করেছিলেন, তা আজও ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। প্রথমে হাত দিয়ে বল জালে জড়িয়ে রেফারিকে বোকা বানানো, তারপর মাঝমাঠ থেকে একা বল নিয়ে পাঁচজনকে কাটিয়ে পুরো ইংলিশ রক্ষণ চিরে দেওয়া—এক ম্যাচেই লেখা হয়ে গিয়েছিল ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত আর সবচেয়ে সুন্দর দুটি মুহূর্ত। সেই বিশ্বকাপেই শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা, ম্যারাডোনার কাঁধে চড়ে।
চার দশক পর সেই মঞ্চে আবার আর্জেন্টিনা, আবার একজন কিংবদন্তি সামনে। লিওনেল মেসির বয়স এখন ৩৯, খেলছেন ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। ম্যারাডোনার মতো একক নৈপুণ্যে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার সেই বিস্ফোরক গতি তারও আছে। বল পায়ে এখনো তিনি বিপজ্জনক, এখনো প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম। এই আসরে ইতোমধ্যে আট গোল করে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে মেসি। বিশ্বকাপে এই প্রথমবার মুখোমুখি হচ্ছেন ইংল্যান্ডের। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক-৮৬-এর সেই জাদু কি আরেকবার ফিরিয়ে আনতে পারবেন মেসি, এবার আটলান্টায়?
মেসির ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ ফাইনাল আছে, কোপা আমেরিকার শিরোপা আছে, আটটি ব্যালন ডি’অর আছে, প্রায় সব বড় রেকর্ডই আছে। কিন্তু প্রতিটি কিংবদন্তির জীবনেই এমন একটি প্রতিপক্ষ থাকে, যার বিপক্ষে একটি পারফরম্যান্স সব অর্জনকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ম্যারাডোনার জন্য সেটি ছিল ইংল্যান্ড। মেসির জন্যও কি সেই প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড? যদি আটলান্টার রাতেও তিনি ম্যাচের ভাগ্য নিজের পায়ে লিখে দিতে পারেন, তাহলে হয়তো ১৯৮৬ আর ২০২৬—দুটি বিশ্বকাপকে একই সুতায় গেঁথে দেবে ফুটবল ইতিহাস।
ইংল্যান্ডের গল্পটা অপেক্ষার। ১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে একমাত্র বিশ্বকাপ জেতার পর ছয় দশক ধরে শিরোপার খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে থ্রি লায়ন্স। টমাস টুখেলের অধীনে দলটা এবার সেই খরা কাটানোর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা নিয়ে হাজির। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের পর এটি তাদের চতুর্থ বড় সেমিফাইনাল, অথচ তার আগের পুরো ইতিহাসে এত সেমিফাইনাল খেলেনি ইংল্যান্ড। হ্যারি কেইন আর জুড বেলিংহাম-দুজনেই ছয়টি করে গোল করেছেন, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার একই দেশের দুই ফুটবলার একসঙ্গে এত গোল করলেন এক আসরে। নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জেতা কোয়ার্টার ফাইনালে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানো বেলিংহামের জোড়া গোল যেন বলে দিচ্ছে, এই দলটার মধ্যে জেদ আছে, সাহস আছে।
তবে দুদলের পথ মসৃণ ছিল না। আর্জেন্টিনা রাউন্ড অব থার্টি টুতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ জিতেছে, মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকে ম্যাচ ঘুরিয়েছে, আর সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও জিতেছে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে। প্রতিবারই ফেভারিট হয়েও নড়বড়ে খেলে শেষ মুহূর্তে জ্বলে উঠেছে লিওনেল স্কালোনির দল। এই মুহূর্তে তাদের টানা ছয় জয়ের রেকর্ড, বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা জয়ের ধারা। ইংল্যান্ড কোচ টুখেলও নিজের দলের খেলা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন, নরওয়ে ম্যাচের পর রক্ষণের ভুলত্রুটি নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানিয়েছেন তিনি।
পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলের মধ্যে ব্যবধান কাগজে-কলমে সামান্যই। ওপ্টার সুপার কম্পিউটারের হিসাবে নির্ধারিত সময়ে ইংল্যান্ডের জেতার সম্ভাবনা প্রায় ৩৮ শতাংশ, আর্জেন্টিনার ৩২ থেকে ৩৪ শতাংশের কাছাকাছি, বাকিটা ড্র আর অতিরিক্ত সময়ের সম্ভাবনা। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দুদলই প্রায় সমানে সমান। মুখোমুখি লড়াইয়ে অবশ্য এগিয়ে ইংল্যান্ডই-চৌদ্দ সাক্ষাতে ছয়টি জয় তাদের, আর্জেন্টিনার তিনটি। পাঁচটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চেও ইংল্যান্ড এই লড়াইয়ে এগিয়ে। পাঁচ মোকাবিলায় ইংল্যান্ড জিতেছে তিনটিতে। আর্জেন্টিনার জয় দুটিতে।
আজকের এই ম্যাচ শুধু বিশ্বকাপের যেনতেন কোনো সেমিফাইনাল নয়। এটা দুই দেশের দুই যুগেরও লড়াই। এক পাশে ১৯৮৬-এর সেই ফুটবলের অনন্য রূপ, অন্য পাশে ২০২৬-এর স্বপ্ন। এক পাশে ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার, অন্য পাশে মেসির নিজের কিংবদন্তিকে আরো একবার নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ।
ইংল্যান্ড চাইবে ছয় দশকের অপেক্ষা ভেঙে ফাইনালের দরজা খুলতে। আর্জেন্টিনা চাইবে ইতিহাসকে আবার নিজের রঙে রাঙাতে। হয়তো এই ম্যাচটা নির্ধারণ করবে একটি পাস, একটি শট, একটি গোল কিংবা একটি ভুল।
তবে নিশ্চিত জানুন ফুটবল পৃথিবী আজ অপেক্ষা করছে অন্য কিছুর জন্য। আটলান্টার ম্যাচে নামার আগে আকাশের দিকে তাকিয়ে মেসি আজ অস্ফুট সুরে বলছেন, ‘ডিয়ার ডিয়েগো, এবার তাহলে আমার পালা!’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


