আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এই হার কোনো দুর্ঘটনা নয়, অবশ্যম্ভাবী ছিল

ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজ

এই হার কোনো দুর্ঘটনা নয়, অবশ্যম্ভাবী ছিল
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল । ছবি: বিসিবি

১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ (ওডিআই) খেলেছিল, তখন ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ আজকের মতো ছিল না। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ হারে বড় ব্যবধানে। ক্রিকেট ভক্ত হিসেবে সে সময়ের এমন পরাজয়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় খুব বেশি কষ্ট পাওয়া যেত না।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ৪০ বছর পর এখন একটি সচ্ছল ক্রিকেট বোর্ড হয়েছে আমাদের। ঘরোয়া ক্রিকেট হচ্ছে নিয়মিত। যদিও তার মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় দলের জন্য রয়েছে দক্ষ কোচিং স্টাফ। আছে বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী। সেই সঙ্গে জাতীয় দলের জন্য পাওয়া যায় চড়া মূল্যের স্পন্সরশিপ। কিন্তু কাঠামোগত কিংবা আর্থিক উন্নতির ছাপ মাঠের ক্রিকেটে দেখা যায় না। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখনো চার যুগ আগের মতোই প্রায় অস্তিত্বহীন, হাড্ডিসার অবস্থা!

অনেকেই প্রায় সময় খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থা এবং কমিটমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সত্য বলতে, বাংলাদেশ ক্রিকেট কিছুটা মর্যাদার অবস্থানে ছিল মাত্র কয়েক বছরের জন্য। মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে ওয়ানডে ক্রিকেটে সে সময় বেশ দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ এমন পর্যায়ে ছিল যে, মাঠে নামার আগেই তারা নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা দিতে পারার মতো আত্মবিশ্বাসী ছিল। তবে ২০১৯ বিশ্বকাপের পর সেই অবস্থান ধাক্কা খায়।

২০১৯ বিশ্বকাপ শেষ হয় শোকের সঙ্গেই। তবে প্রাপ্তি ছিল সাকিব আল হাসানের নবাবীয় পারফরম্যান্স। সেই টুর্নামেন্টে ব্যাটে-বলে ঝলক দেখান বাংলাদেশের পোস্টার বয়। সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হলো, সেই আসরে মাঠের খেলার চাইতে অফ-ফিল্ডের আলোচনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কখনো কখনো বোর্ডের সদস্যরা অযৌক্তিক মন্তব্য করেছেন, আবার কখনো খেলোয়াড়দের নিজেদের মধ্যে বিরোধ বাঁধে (যেমন ২০২৩ বিশ্বকাপের ঠিক আগে তামিম এবং সাকিবের বিতর্ক) প্রকাশ পায়।

যদি ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট ভক্তদের জন্য অত্যন্ত খারাপ সময় হয়, তাহলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটা ভক্তদের জন্য কতটা কঠিন হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে এসে ধরা দেয় ২০০৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের কাছে হার। ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি সিরিজে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হার। ২০২৫ সালে এসে সেই একই ফরম্যাটে আরব আমিরাতের কাছে হার। টানা তিন বছরে এই তিনটি ব্যর্থতা বাংলাদেশের ক্রিকেটে তিনটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশকে হারানো আইসিসি সহযোগী দেশের সদস্যরা ক্রিকেটকে কখনো চূড়ান্ত পেশা হিসেবে নিতে পারে না। তাদের জীবিকার জন্য অন্য চাকরি করতে হয়। সেদিক থেকে আমাদের দেশীয় ক্রিকেটাররা ভাগ্যবান। যারা বিশ্বমানের সুবিধা পেয়ে থাকেন। স্পন্সর থেকে শুরু করে সব সুযোগ-সুবিধা এবং পারিশ্রমিকে এগিয়ে থাকার পরও সহযোগী দেশের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স তলানিতে!

দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ, পক্ষপাতিত্ব আম্পায়ারিং, মানহীন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ক্রিকেট দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের উন্নতি হতে পারে কিন্তু সার্বিকভাবে দেশের ক্রিকেট তাতে ‘খুন’ হচ্ছে। যখন আমরা দেখি ১২ বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া এনামুল হক বিজয়, সৌম্য সরকার এবং সাব্বির রহমান এখনো জাতীয় দলে ফেরার লড়াইয়ে রয়েছেন এবং উদীয়মান প্রতিভা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, তখন এটি আমাদের পাইপলাইনের খেলোয়াড়দের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন তোলে। প্রতিভা তৈরি হওয়া নিয়েও অসংগতির আঁচ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সমর্থকরা এবং প্রশাসকরা এখনো দোষারোপের খেলা খেলছেন। অনেকেই তাও টিকে আছেন তাদের নিজেদের পদে।

যে সময় আমাদের ফ্যাব-ফাইভ (তামিম, সাকিব, মাশরাফি, রিয়াদ, মুশফিক) বিশ্ব ক্রিকেটে উঠে এসেছিল এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছিল, তখন দেশের ক্রিকেট প্রশাসকরা কেবল দলের জয়ে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতে ব্যস্ত ছিল, ভবিষ্যতের কথা ভাবেনি। বোল্ড কোনো ডিসিশন নিতে পারেনি। তার ফলস্বরূপ, আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি হতাশার গর্তে ক্রমশ ডুবছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সিস্টেমে বড় সমস্যা রয়েছে। আর তারই সর্বশেষ প্রমাণ আরব আমিরাতের কাছে বাংলাদেশের হার! যে কায়দায় বাংলাদেশ এই সিরিজে হেরেছে তাতে এই হারে কোনো মতেই কোনো অজুহাত তোলার উপায় নেই। এই হার কোনো দুর্ঘটনা নয়, অবশ্যম্ভাবী একটা বিষয় ছিল!

বর্তমান ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালকরা এখন মূলত ব্যস্ত পরবর্তী বোর্ড কেমন হবে তা নিয়ে। সেদিকেই তাদের মনোযোগ বেশি। বিসিবিতে নিজেদের চেয়ার ঠিক রাখতেই তাদের দৌড়ঝাঁপ বেশি। আমিরাতের কাছে ২-১ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজের হার আরেকবার পরিষ্কার বার্তা দিল, বাংলাদেশের ক্রিকেটে সঠিক পথে নেই।

পারিশ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কিত প্লেয়ারদের পারফরম্যান্স মেট্রিক্স, বোর্ডের সকল স্তর ও প্লেয়ারদের দায়িত্বশীলতা এবং কিছু জায়গায় পূর্ণ সংস্কার যদি না করা হয় তাহলে সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন বাংলাদেশকে বিশ্ব ইভেন্টের জন্য বাছাইপর্ব খেলতে হবে। যদি সবকিছু এভাবেই চলতে থাকে তবে সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন বাংলাদেশে ক্রিকেট তার সব প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন রহস্যময় অবস্থানে পৌঁছেছে। এটা এখন যুদ্ধ, ভালোবাসা, হতাশা এবং ঘৃণার সম্মিলন!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন