বোর্ড পরিচালকের বিরুদ্ধেই ক্রিকেট বিক্রির অভিযোগ

কেলেঙ্কারির বিষে নীল বিপিএল!

কেলেঙ্কারির বিষে নীল বিপিএল!

একদিন এই বিপিএলই ছিল স্বপ্নের নাম। দেশের ক্রিকেটকে নতুন বাজার দেওয়ার কথা ছিল এর। তৈরি হওয়ার কথা ছিল নতুন তারকা, নতুন বিনোদন আর নতুন ক্রিকেট অর্থনীতির। অথচ এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে সেই বিপিএলই এখন ক্রিকেটের গলায় বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে। মাঠে ক্রিকেট থাকার কথা ছিল, সেখানে ঢুকে পড়েছে টাকার খেলা। ক্রিকেট ম্যাচ পরিণত হয়েছে নগদে বেচাকেনার হাট হিসেবে! ফ্র্যাঞ্চাইজির আড়ালে তৈরি হয়েছে নানা অনিয়ম। সেই অন্ধকারে এবার জড়িয়ে পড়েছেন বিসিবির পরিচালকও। যার হাতে ক্রিকেটের পাহারা থাকার কথা, নিরাপদ হওয়ার কথাÑসে তিনিই এখন দাঁড়িয়েছেন অভিযোগের কাঠগড়ায়। স্পট ও ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে এসেছে তার নাম। এ লজ্জা শুধু একজনের নয়, এ লজ্জা দেশের পুরো সিস্টেমের।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিসিবির মিডিয়া বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ পেল সেই অন্ধকারের আরেক অধ্যায়। আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে বিসিবি। বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের তদন্তে অভিযুক্ত হয়েছেন সাবেক পরিচালক মোখলেসুর রহমান শামীম, সাবেক সিকিউরিটি লিয়াজোঁ কর্মকর্তা জাকির হোসেন এবং বগুড়ার সাবেক কাউন্সিলর রকিবুল ইসলাম সানি। তিনজনই ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বিসিবির গত বোর্ডে। শামীম ছিলেন অডিট কমিটির চেয়ারম্যান। অর্থাৎ, ক্রিকেটের হিসাব দেখার দায়িত্বও ছিল তার।

বিজ্ঞাপন

তিনজনকেই আপাতত সব ধরনের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করেছে বিসিবি। অভিযোগপত্র হাতে পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে তাদের। এরপর আইসিসির নিয়ম মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে অ্যালেক্স মার্শালের নেতৃত্বাধীন ইন্টিগ্রিটি ইউনিট। তদন্তের শেষ কথা এখনো আসেনি। তবে অভিযোগের বিস্তারই বলে দিচ্ছে বিপিএলের অসুখটা কেবল মাঠের নয়।

বিসিবির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পরিচালক সরাসরি ফিক্সিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন। মোখলেসুর রহমান শামীম গত অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার নির্বাচনে জিতে পরিচালক হয়েছিলেন। আমিনুল ইসলাম বুলবুল তাকে অডিট কমিটির চেয়ারম্যান করেছিলেন। কিন্তু জানুয়ারিতেই তার বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। তদন্তের স্বার্থে অডিট কমিটির দায়িত্ব ছাড়েন শামীম। পরে ছাড়েন পরিচালকের পদও। যে বোর্ডে তিনি ছিলেন পাহারাদার, সেই বোর্ডে দায়িত্ব পালনের সময়ই উঠেছে এমন গুরুতর অভিযোগ।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গত বিপিএলের কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল। বর্তমান কাঠামোয় বিপিএল চালাতে তিনি রাজি নন বলেও জানিয়েছেন। এবার সে অবস্থানের পেছনে আরো বড় বাস্তবতা সামনে এসেছে। কারণ, বিপিএলের সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং একটির পর একটি ঘটনা একই প্রশ্ন সামনে আনছে।

গত বিপিএলের আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে টুর্নামেন্টকে দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নেয় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড। প্রথমবারের মতো গঠিত হয় স্বাধীন বিসিবি ইন্টিগ্রিটি ইউনিট। দায়িত্ব দেওয়া হয় আইসিসির সাবেক দুর্নীতিবিরোধী প্রধান অ্যালেক্স মার্শালকে। তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিপিএল ড্রাফটের আগে ৯ ক্রিকেটারকে সন্দেহভাজন হিসেবে বাইরে রাখা হয়। এরপর মাঠে গড়ায় বিপিএলের দ্বাদশ আসর।

কিন্তু মাঠের ক্রিকেট শেষ হলেও বিপিএলের অস্বস্তি শেষ হয়নি। যে নির্বাচনের মাধ্যমে আমিনুল ইসলামের বোর্ড বিসিবির ক্ষমতায় এসেছিল, সে নির্বাচনই পরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তদন্ত হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমিনুল ইসলামের বোর্ডের ওপর অনাস্থা আনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এরপর তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন অ্যাডহক কমিটি বিসিবির দায়িত্ব নেয়। পরে নির্বাচনের মাধ্যমে তামিম ইকবাল সভাপতি হন। বোর্ড বদলেছে, চেয়ার বদলেছে; কিন্তু বিপিএলের অন্ধকার যেন একই জায়গায় রয়ে গেছে।

গত মে মাসেও বিপিএলকে নাড়িয়ে দিয়েছিল আরেকটি ঘটনা। বেটিং-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের সঙ্গে যুক্ত ক্রিকেটার সামিনুর রহমানকে আজীবন নিষেধাজ্ঞা দেয় বিসিবি। তার সঙ্গে খেলোয়াড়, দলীয় কর্মকর্তা, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকসহ আরো কয়েকজনকেও সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধির বিভিন্ন ধারা ভঙ্গের অভিযোগও আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, মঙ্গলবারের ঘটনা হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। বিপিএলের চারপাশে দীর্ঘদিন ধরেই জমছিল কালো মেঘ।

মঙ্গলবার তিন অভিযুক্তের নাম প্রকাশের পর সহযোগী মিডিয়ার কাছে বিস্ময় প্রকাশ করেন শামীম। বর্তমানে ইংল্যান্ডে থাকা সাবেক এই পরিচালক দাবি করেন, এসব অভিযোগ নিয়ে বিসিবি তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেনি। তার ভাষ্য, দেড় মাস আগে অ্যালেক্স মার্শাল তাকে ডেকেছিলেন। তখন যা জানতে চাওয়া হয়েছিল, তার সবকিছুতেই তিনি সহযোগিতা করেছেন। এখন অভিযোগের জবাব দেওয়ার পালা তার।

২০১২ সালে শুরু হওয়ার পর থেকেই বিপিএল বিতর্কের বাইরে থাকতে পারেনি। আর্থিক কেলেঙ্কারি থেকে ক্রিকেটারদের পাওনা, ফ্র্যাঞ্চাইজির অনিয়ম থেকে ফিক্সিং, বারবার একই গল্প ফিরে এসেছে। অথচ এ টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের বাণিজ্যিক শক্তির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। হওয়ার কথা ছিল ক্রিকেটার তৈরির বড় মঞ্চ। কিন্তু সুযোগ যত এসেছে, অপব্যবহারের অভিযোগও তত বেড়েছে। ক্রিকেটের স্বার্থ যেখানে সবার আগে থাকার কথা, সেখানে ব্যক্তিস্বার্থই যেন বারবার জিতে গেছে।

একজন বোর্ড পরিচালকের বিরুদ্ধে ফিক্সিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি শুধু অভ্যন্তরীণ তদন্তে আটকে থাকবে কি নাÑসে প্রশ্নও উঠছে। অনেকের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনের আওতায়ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, তৎকালীন বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ভূমিকা নিয়েও। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন বোর্ডের একজন পরিচালকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনিক দায়ের প্রশ্নটিও এড়ানো কঠিন।

আপাতত বিপিএল আয়োজন না করার কথাই ভাবছে বর্তমান বোর্ড। এ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে চলছে আলোচনা। তামিম ইকবাল এখন আইসিসির ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ কমিটিরও চেয়ারম্যান। ফলে তার সামনে চ্যালেঞ্জটি কেবল বাংলাদেশকে ঘিরে নয়। একদিকে নিজের দেশের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগকে কলঙ্কমুক্ত করতে হবে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতাও রক্ষা করতে হবে।

বিপিএল তাই এখন আর শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের আয়না। সে আয়নায় এবার দাগ স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, বিষ ছড়িয়ে পড়ার পর শুধু পাত্র বদলালেই কি ক্রিকেট সুস্থ হবে? নাকি বিষটাই এবার বের করতে হবে শিকড়সহ? কারণ বিপিএল বাঁচানো মানে শুধু একটি লিগ বাঁচানো নয়, বাঁচানো বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিশ্বাস।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন