একসময় শিক্ষার আলো ছিল সীমিত, ছিল নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা। সেই সময়ে একজন মানুষ উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজকে বদলাতে হলে আগে মানুষকে শিক্ষিত করতে হবে। সেই উপলব্ধি থেকেই মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.) সীতাকুণ্ডে শিক্ষা বিস্তারের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, প্রায় ১৪০ বছর পরও তার আলো জ্বলছে। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা সীতাকুণ্ড কামিল (এম.এ.) মাদ্রাসা ও সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
১৮৫৬ সালে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড এলাকায় জন্ম নেওয়া মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.) ছিলেন আলেম, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। অজ্ঞতা ও পশ্চাৎপদতা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, এ বিশ্বাস থেকেই তিনি শিক্ষা বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ ও আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন।
১৮৮৬ সালে তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় সীতাকুণ্ড কামিল (এম.এ.) মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠানটির সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নিরলস শ্রম, মেধা ও ত্যাগে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি কামিল পর্যায়ে উন্নীত হয়। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অসংখ্য আলেম, শিক্ষক, ইমাম, খতিব, গবেষক ও সমাজসেবক দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৪ সালে সীতাকুণ্ড কামিল (এম.এ.) মাদ্রাসা জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মান অর্জন করে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা ক্রেস্ট ও সনদ গ্রহণ করেন।
মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.) শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেননি, তিনি এ অঞ্চলে শিক্ষা-জাগরণের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে গেছেন। তাঁর শিক্ষা-দর্শনকে ধারণ করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানী, দক্ষ, সৎ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
শুধু দ্বীনি শিক্ষার বিস্তারেই থেমে থাকেননি মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ.)। সাধারণ শিক্ষার প্রসারেও তিনি উদ্যোগী হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১৩ সালে তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় সীতাকুণ্ড হাই স্কুল, যা বর্তমানে সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষার নতুন দ্বার খুলে যায়।

সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও গবেষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নামও জড়িয়ে রয়েছে। জানা যায়, ১৯১৪ সালে তিনি এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির শতবর্ষী ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ.) শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়েও ভূমিকা রাখেন। ওবায়দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও ঈদগাহসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার অবদানের কথা স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়। তার কর্মকাণ্ডে শিক্ষা, নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনকল্যাণ ছিল পরস্পর সম্পর্কিত।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ড কামিল (এম.এ.) মাদ্রাসা এবং সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এখন শুধু দুটি পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো সীতাকুণ্ডের শিক্ষা-জাগরণ ও সামাজিক পরিবর্তনের জীবন্ত ইতিহাস। শতবর্ষের বেশি সময় ধরে এসব প্রতিষ্ঠান অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষিত করেছে। তাদের অনেকে শিক্ষা, প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, আইন, গবেষণা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
তারা মনে করেন, মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.) এর জীবন, কর্ম ও শিক্ষা-দর্শন নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর পুরোনো দলিল, নথিপত্র, স্মৃতিচিহ্ন ও ইতিহাস সংরক্ষণ করা জরুরি। এ জন্য একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ ও গবেষণাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা গেলে সীতাকুণ্ডের শিক্ষা-জাগরণের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
প্রায় ১৪০ বছর আগে যে স্বপ্ন নিয়ে মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক (রহ.) শিক্ষা বিস্তারের পথে নেমেছিলেন, সময়ের স্রোতে সেই স্বপ্ন আজ একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তাঁর হাতে জ্বালানো শিক্ষার প্রদীপ আজও জ্বলছে দুই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের আঙিনায়। প্রতিদিনের শিক্ষার্থীদের পদচারণা যেন বলে দেয়, একজন মানুষ চলে যেতে পারেন, কিন্তু সমাজকে আলোকিত করার জন্য রেখে যাওয়া জ্ঞানের আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তেই থাকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


