বিসিবি সভাপতির চেয়ার থেকে আমিনুল ইসলাম বুলবুল আউট, আর তামিম ইকবাল খান ইন- বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে এমন ঘটনা কি নতুন কোনো কিছু?
উত্তরটা কিন্তু সবার জানা। মোটেও এটা নতুন কিছু নয়। এর আগে এমন ঘটনার শিকার হয়েছিলেন ফারুক আহমেদ। আর কী অবাক করার বিষয়, সেদিন ফারুকের চেয়ারে বসেছিলেন এখন চেয়ার হারানো আমিনুল ইসলাম!
কর্মফল তাহলে ঠিকই ঘুরেফিরে আসে।
আমার প্রশ্ন হলো, বিসিবিতে এগুলো যারা করছেন, তারা তো বাইরের কেউ নন। যারা এগুলো করছেন, তারাই জানেন কেন এরকম করছেন? কেন এই অস্থিরতা তৈরি করেছেন?
আমার শঙ্কার জায়গা হলো, এ পর্যন্ত বিসিবি সভাপতির চেয়ারে বসা বেশ কজন জাতীয় দলের অধিনায়ককে আমরা বিতর্কিত করে ফেললাম এসব ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে। এভাবে বিতর্কিত হওয়ার জন্য তারাই কি শুধু দায়ী, নাকি যারা তাদের বিভিন্নভাবে পরিচালনা করেছেন, যারা বিভিন্নভাবে আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করেছেন, সেই সূত্রে হিসাব মেলালে এসব ঘটনাপ্রবাহের জন্য অনেকেই কিন্তু এর জন্য দায়ী। এই অস্থিরতা তৈরি করাতে কার কী লাভ হচ্ছে জানি না, তবে এই জটিলতার গর্তে পড়ে ক্রিকেটের অনেক ক্ষতি হয়েছে।
ফারুক আহমেদ যখন এবং যে কায়দায় বোর্ডে এসেছিলেন, তখনো কিন্তু সে সময়ের সরকার বিসিবির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেছিল; কিন্তু তখন কেউ তা নিয়ে আলোচনা করেননি। ফারুক আহমেদকে এনএসসির কাউন্সিলর হিসেবে আনা হয়েছিল কার পরিবর্তে? সাজ্জাদুল আলম ববির পরিবর্তে এবং আরেকজন ছিলেন আমাদের জালাল ইউনুস। এ দুজনের মধ্যে জালাল ইউনুস কাউন্সিলর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু সাজ্জাদুল ইসলাম ববি রেজিগনেশন দেননি। তার মানে হচ্ছে আপনার ভ্যাকেন্সি দুটি, সেই শূন্যপদে একজনকে নিতে পারছেন। কিন্তু সাজ্জাদুল ইসলাম পদত্যাগ না করায় তার কাউন্সিলর পদ কিন্তু শূন্য হয়নি। অথচ সে সময় ক্রীড়া প্রশাসন জালাল ইউনুসের সঙ্গে সাজ্জাদুল ইসলামের পদটাও শূন্য দেখিয়ে সেই দুই পদে নতুন কাউন্সিলর হিসেবে নাজমুল আবেদিন ফাহিম ও আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নাম ঘোষণা করে, যা ছিল পুরো মাত্রায় গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী। এরপর মাত্র ৯ মাসের মাথায় ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে তাকে বিসিবির সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
বিসিবির গঠনতন্ত্রের কোথাও কিন্তু লেখা নেই যে, সভাপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে তাকে সরানো যাবে। ফারুক আহমেদকে সরাতে সেই অনিয়ম করল সে সময়ের ক্রীড়া প্রশাসন তথা সরকার। ফারুক কিন্তু পদত্যাগও করেননি, তাকে এক অর্থে জোর করে সরকার সরিয়ে দিয়েছে। ঠিক তখনই বিসিবির মসনদে বসতে মঞ্চে এলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সে সময় পুরো বিষয়টি যে মহাঅনিয়মের মধ্যে হলো-তা নিয়ে কোনো হেলদেল তখন দেখলাম না। কেউ বললেনও না যে, এটা আইনগত সিদ্ধ নয়।
আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ডের সমস্যার শুরুটাই হয়েছিল জন্মের সঙ্গে সঙ্গে। যে প্রক্রিয়ায় তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ও তার বোর্ড নির্বাচিত হয়েছিল, সেটা ছিল চরম বিতর্কিত বিশেষ করে ই-ভোটিংয়ের ক্ষেত্রে যে জালিয়াতি ও ছক সাজানো হয়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন অন্যায়।
লোকদেখানো সে নির্বাচনে আমিনুল ইসলাম বিসিবিতে এলেন তার সভাসদ নিয়ে। কিন্তু মর্যাদাই যে পেলেন না! সরকার এখন সিস্টেমের মধ্যে ফেলে সেই বোর্ডকে বাতিল করেছে এবং এটা এক অর্থে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যে ইলেকশন আছে, আমরা আশঙ্কা করছি সরকার এখানে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করে কি না। যদি করে, হয়তোবা আরো কিছুদিন পর একই ফলাফল আবার আমরা পাব।
আমিনুলদের নির্বাচনের সময়ে যিনি ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন, সেই তিনি এখন দেখছি অনেক ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বিভিন্ন মিডিয়াতে। বলছেন, তিনি তখন সে নির্বাচনে কোনো প্রভাব বিস্তার করেননি। অথচ তার সময়ে বিসিবির নির্বাচনের চাক্ষুষ প্রমাণ আমি নিজে। কারণ, আমি নিজেই সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু সার্বিক অনিয়ম এবং স্বেচ্ছাচারিতা ও ই-ভোটিংয়ের জালিয়াতি টের পেয়ে আমিও নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলাম।
দেখুন, যখন কাউকে বিদায় করা হয় এবং নতুন কাউকে আনা হয়, তখন সে পরিক্রমায় হয়তোবা কেউ ভিকটিম এবং হয়তো কেউ বেনিফিশিয়ারি হন। যিনি ভিকটিম হন, তিনি তখন মনে করেন আমি অন্যায়ের শিকার হয়েছি। আর যিনি সুবিধাপ্রাপ্ত হন, তিনি ভাবেন তার অবস্থানটাই সঠিক। আমাদের ক্রিকেট এখন সে দোটানা পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে। আশা করব সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের ভালোবাসার ক্রিকেট যেন সঠিক জায়গায় থাকে, ক্রিকেট ভালোভাবে চলুক। এটা নিয়ে যেন আর কোনোরকমের কাদা ছোড়াছুড়ি না হয়। একটা জায়গায় সমঝোতা অবশ্যই প্রয়োজন।
ফারুক আহমেদ ও আমিনুল ইসলাম বুলবুল খেলোয়াড়ি জীবনে ভালো ব্যাটসম্যান ছিলেন। তবে আমার মনে হয় ক্রিকেট বোর্ডে তাদের দুজনকে নিয়েই কেউ একজন ‘খেলেছে’, যিনি এখন নিজেকে খুব সাধুভাবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে আমি নিশ্চিত, এই ‘খেলাটা’ তিনিই খেলে দিয়েছেন। যাদের খেলা দেখে আমরা হাততালি দিয়েছি- এমন দুজন সাবেক অধিনায়কের বিসিবির সর্বোচ্চ পদ থেকে অসম্মানজনক বিদায়টা সত্যিকার অর্থে দুঃখ বাড়ায়।
লেখক : ক্রিকেট বিশ্লেষক, সহসভাপতি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

