শান্তিচুক্তির পরও থামেনি টাইগ্রের লড়াই, পুরোনো শত্রুদের নতুন জোট

শান্তিচুক্তির পরও থামেনি টাইগ্রের লড়াই, পুরোনো শত্রুদের নতুন জোট
ছবি: এএফপি

২০২২ সালের নভেম্বরে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) মধ্যে প্রিটোরিয়া চুক্তি সই হয়েছিল। দুই বছর ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটানোই ছিল এর লক্ষ্য। চুক্তিতে স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধ, টাইগ্রের যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃএকীভূত করা, রাজনৈতিক সংলাপ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় টিপিএলএফের যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃএকীভূত করার প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়। ৭ নম্বর ধারায় নতুন করে যোদ্ধা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, মোতায়েন বা সামরিক শক্তি সংগঠিত করা নিষিদ্ধ করা হয়। নতুন করে সংঘাতের প্রস্তুতিও নিষিদ্ধ ছিল।

প্রায় চার বছর পর বড় আকারের যুদ্ধ থেমে আছে। কিন্তু যে বিরোধগুলো যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলোর অনেকটাই এখনো মেটেনি; বরং ২০২৪ সালের পর টিপিএলএফ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে নিজেদের অবস্থান নতুন করে শক্ত করেছে। একই সঙ্গে তাদের সামরিক প্রভাবও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

এই সময়ে ইরিত্রিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে টিপিএলএফের যোগাযোগের খবর এসেছে। দুবাই ও জালামবেসায় বৈঠকের কথাও জানা গেছে। টাইগ্রের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টিপিএলএফের ভেতরে বিরোধ বেড়েছে। যোদ্ধা নিয়োগ ও সামরিক সমাবেশের খবর এসেছে। নতুন করে সংঘর্ষও হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধী কয়েকটি গোষ্ঠীকে নিয়ে সিমডো নামে একটি আলগা সমন্বয় গড়ে উঠেছে।

এসব পরিবর্তন প্রিটোরিয়া চুক্তির ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। চুক্তিটি কি শুধু যুদ্ধ থামিয়েছিল, নাকি টিপিএলএফকে নিজেদের পুনর্গঠন ও নতুন রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির সুযোগও দিয়েছিল?

টিপিএলএফ শুরু থেকেই চুক্তিকে কৌশলগত বিরতি হিসেবে ব্যবহার করেছিল—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে ২০২৪ সালের পরের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, চুক্তির মাধ্যমে কমিয়ে আনার কথা থাকা সংগঠনটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ভূমিকা পুরোপুরি শেষ হয়নি।

নিরস্ত্রীকরণ কতটা হয়েছে

প্রিটোরিয়া চুক্তির পর টাইগ্রের বাহিনী ভারী অস্ত্র হস্তান্তর করে। হাজারো সাবেক যোদ্ধা নিরস্ত্রীকরণ কর্মসূচিতেও যুক্ত হন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় অঞ্চলটির সামরিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

২০২৬ সালে টাইগ্রেতে নতুন করে যোদ্ধা নিয়োগ ও জোর করে লোকজনকে সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার খবর আসে। এসব তথ্য সত্য হলে তা চুক্তির নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার অসম্পূর্ণতা প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে চুক্তির ৭ নম্বর ধারারও সরাসরি লঙ্ঘন হবে।

তবে সংগঠিত সামরিক সমাবেশের সঙ্গে টাইগ্রের সাধারণ মানুষের অবস্থানকে এক করে দেখা ঠিক নয়। টাইগ্রের মানুষ আবার যুদ্ধ চায়—এমন কোনো ভিত্তি নেই। আগের যুদ্ধের ক্ষতি এখনো তাদের জীবনে রয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইগ্রের এক বেসামরিক ব্যক্তি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘টাইগ্রের মানুষ শান্তি চায়; আমরা দ্বিতীয় কোনো যুদ্ধ চাই না।’

নতুন করে যোদ্ধা নিয়োগের খবর তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে। যে যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে তারা মনে করেছিলেন, আবারও তাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

টিপিএলএফের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস

যুদ্ধের পর টিপিএলএফের ভেতরে রাজনৈতিক বিরোধও বাড়ে। ২০২৪ সাল থেকে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ লড়াই শুরু হয়। পরে তা টাইগ্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে।

২০২৫ সালে গেতাচেউ রেদাকে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল তাদেসে ওয়ারেদে।

২০২৬ সালের মে মাসে টাইগ্রের আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্বহাল করা হয়। পরিষদ দেব্রেতসিয়ন গেব্রেমিকেলকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। এতে তার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর অবস্থান আরো শক্ত হয়।

এতে স্পষ্ট হয়, টাইগ্রের রাজনীতিতে টিপিএলএফ এখনো শক্তিশালী। যুদ্ধের পর স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার বদলে আবারও ক্ষমতার লড়াই সামনে এসেছে। নিরাপত্তার প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে গেছে।

রাজনীতির সঙ্গে আবার সামরিক সংঘাত

২০২৬ সালের শুরুতে রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে সামরিক তৎপরতাও বাড়ে।

জানুয়ারিতে টিডিএফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোদ্ধারা টেকেজে নদী পেরিয়ে বিরোধপূর্ণ তসেলেমত জেলায় প্রবেশ করেন। সেখানে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।

পরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর একটি কমান্ড পোস্ট সরে গেলে টিডিএফ–সংশ্লিষ্ট যোদ্ধারা আলামাতা ও কোরেমের নিয়ন্ত্রণ নেন।

আগস্টে সুদানের সীমান্তের কাছে পশ্চিম টাইগ্রেতেও আবার লড়াই শুরু হয়। এটিও প্রিটোরিয়া চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন।

সংঘাতের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ও টিপিএলএফ পরস্পরকে দায়ী করেছে। তবে প্রথম সংঘর্ষ কে শুরু করেছিল, তা নিয়ে বিরোধ রয়েছে।

তবে সংঘর্ষগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—টাইগ্রেতে সংগঠিত সশস্ত্র বাহিনী এখনো দ্রুত সমাবেশ ঘটিয়ে কোনো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই করতে সক্ষম।

ইরিত্রিয়া ও অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন যোগাযোগ

টিপিএলএফের নতুন সমীকরণ টাইগ্রের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইরিত্রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ।

১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইরিত্রিয়া ও টিপিএলএফের মধ্যে ভয়াবহ সীমান্তযুদ্ধ হয়েছিল। পরে ২০২০ থেকে ২০২২ সালের টাইগ্রে যুদ্ধে ইরিত্রিয়ার বাহিনী ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে টিপিএলএফের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

কিন্তু প্রিটোরিয়া চুক্তির পর ইরিত্রিয়া ও টিপিএলএফের কিছু অংশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের খবর পাওয়া গেছে।

ইথিওপিয়া অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া টিপিএলএফকে সহায়তা করছে এবং তাদের প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরিত্রিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নিয়ে সিমডোর উত্থান ঘটেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে টিপিএলএফ, ফানো, ওরোমো লিবারেশন আর্মি (ওএলএ) এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।

ফানোর নেতা জেমেনে কাসি এই জোটের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, ইরিত্রিয়া বর্তমানে এর অংশ নয়।

সিমডোর গুরুত্ব হলো, একসময় পরস্পরের বিরোধী থাকা গোষ্ঠীগুলো এখন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে সহযোগিতার পথ খুঁজছে।

তাদের বিরোধ অবশ্য শেষ হয়নি। ওয়েলকাইতসহ বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনো ফিরতে পারেননি। টাইগ্রে ও আমহারার পক্ষগুলোর মধ্যে ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধও রয়ে গেছে।

তারপরও অভিন্ন স্বার্থে এসব গোষ্ঠী কিছু মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে রাখছে।

শান্তি ফিরলেও মূল বিরোধ রয়ে গেছে

টাইগ্রে যুদ্ধে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। তাদের অনেকে এখনো বাড়িতে ফিরতে পারেননি। বিশেষ করে ওয়েলকাইত, তসেগেদে, হুমেরা ও রায়ার মতো বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রত্যাবর্তন এখনো বড় সমস্যা।

ভূখণ্ডের বিরোধ বাস্তুচ্যুত টাইগ্রেবাসীর ফিরে যাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একই সঙ্গে টাইগ্রে ও কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সম্পর্কও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।

যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সরকারও ব্যর্থ হয়েছে। তবে এতে প্রিটোরিয়া চুক্তির অধীনে টিপিএলএফের অঙ্গীকারগুলো বাতিল হয়ে যায় না।

চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃএকীভূত করার কথা ছিল। ৭ নম্বর ধারায় যোদ্ধা নিয়োগ, সামরিক সমাবেশ এবং নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের পরের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে না যে টিপিএলএফ ইচ্ছাকৃতভাবে সময় কেনার জন্য প্রিটোরিয়া চুক্তি করেছিল। তবে এগুলো দেখায়, সংগঠনটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছে। তারা টাইগ্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছে। সশস্ত্র কাঠামোর সঙ্গে যোগাযোগও ধরে রেখেছে। পাশাপাশি নতুন সম্ভাব্য অংশীদার তৈরি করেছে।

প্রিটোরিয়া চুক্তি বড় আকারের যুদ্ধ থামিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা, ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিয়ে মূল বিরোধের সমাধান করতে পারেনি।

আর এই অসম্পূর্ণ শান্তির সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অনেক টাইগ্রেবাসী এখনো বাস্তুচ্যুত। নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভয়ও তাদের তাড়া করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইগ্রের এক তরুণ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার ভয়েই অনেক তরুণ আশা হারাচ্ছে।’

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন