জয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান তাকিয়ে আকাশের দিকে

এম. এম. কায়সার, সিলেট থেকে

জয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান তাকিয়ে আকাশের দিকে

তৃতীয় দিনের সকালে বাংলাদেশ তখন সবে ব্যাটিং শুরু করেছে। এমন সময়ে লাহোর থেকে পাকিস্তানের এক সাংবাদিকের কৌতূহলী প্রশ্ন- ‘বৃষ্টির কি খবর, আসবে?’

পাকিস্তানের এই দলের মতো সেদেশের সাংবাদিকরাও জেনে গেছেন, সিলেট টেস্ট এখন তাদের কেবল বাঁচাতে পারে বৃষ্টি। গোটা দলের যে ন্যূব্জ ও ভাঙ্গাচোরা ব্যাটিং, তাতে বাংলাদেশের দেওয়া ৪৩৭ রানের বিশাল টার্গেট ছাড়িয়ে সিলেট টেস্ট পাকিস্তান জিতে সিরিজে সমতা আনবে- সেই বিশ্বাস বা আস্থা খোদ পাকিস্তান দলের ড্রেসিংরুমে থাকা খেলোয়াড়দেরও নেই!

বিজ্ঞাপন

সিলেট টেস্টে জয়ের জন্য পাকিস্তানের সামনে বাংলাদেশ যে বিশাল পাহাড় সমান টার্গেট দাঁড় করিয়েছে, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে পাকিস্তানকে বিশ্বরেকর্ড গড়তে হবে। শেষ ইনিংসে ৪৩৭ রানের টার্গেট টেস্ট ক্রিকেটে আজ পর্যন্ত কেউ টপকাতে পারেনি। আর এই পাকিস্তান দল চলতি সিরিজে যে কোমর ভাঙ্গা ও নুয়ে পড়া ব্যাটিংয়ের নমুনা দেখিয়েছে তাতে সিলেটে তারা চমকপ্রদ কিছু করে ফেলবে এমন কিছুর সম্ভাবনা বহুত দুরস্ত! সিলেটে বৃষ্টি বাধা না হলে টেস্ট সিরিজ যে বাংলাদেশ ২-০ তে জিততে চলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং সেটা হতে পারে আজ চতুর্থ দিনেই। তৃতীয় দিন শেষবেলায় ২ ওভার ব্যাটিং করে কোনো রান করতে পারেনি পাকিস্তান। আজ তাদের দৌড় কতদূর?

আপাতত এই টেস্টকে নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ যে পরিকল্পনা করছিল তাতে পুরোপুরি সফল। আর তৃতীয় দিনের নায়ক মুশফিকুর রহিম। ক্যারিয়ারের ১৪তম সেঞ্চুরির আনন্দে ভাসলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের মিস্টার ডিপেন্ডেবল। টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির রেকর্ড এখন তার। ১৩ সেঞ্চুরি নিয়ে এতদিন মুশফিক ও মুমিনুল সমান অবস্থানে ছিলেন।

পাকিস্তানকে একটা বিশাল টার্গেট এবং তাদের গুটিয়ে দেওয়ার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় রাখা ম্যাচের তৃতীয় দিনের দুটো ইচ্ছাই বাংলাদেশের পূর্ণ হয়েছে। দুদিন সময় এবং টার্গেট ৪৩৭ রানের। একটু জানিয়ে দেই, এই সিরিজে পেছনের তিন ইনিংসে পাকিস্তানের রান ৩৮৬, ১৬৩ ও ২৩২। পুরো দলের হতশ্রী ব্যাটিং দেখে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে- এই দলটাই পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল দল কি না? সেই দল বাংলাদেশের তেজি পেস বোলিংয়ের বিরুদ্ধে সামনের দুদিনে ৪৩৭ রানের বিশ্বরের্কড গড়ে ম্যাচ জিতে নিবে এমন আশার আগে অনেক দশমিক এবং শূন্য বসাতে হবে!

বরং সিলেট টেস্ট আজ চতুর্থ দিনেই শেষ হচ্ছে বাংলাদেশের আরেকটি জয়ের এমন সম্ভাবনা দেখে ঢাকায় ফেরার টিকিট একদিন এগিয়ে আনার পরিকল্পনা কষছেন অনেকে। আর উপায়হীন পাকিস্তান তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে, বৃষ্টির কৃপায়। এই টেস্টে পাকিস্তানের হার এখন বাঁচাতে পারে কেবল আগাম বর্ষার বৃষ্টি!

তৃতীয় দিনের পুরোটা ব্যাটিংয়ের কথা আগেই জানিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যও সফলভাবে সম্পন্ন হলো। সকালের সেশন নাজমুল হোসেন শান্তকে ফিরিয়ে পাকিস্তানের উল্লাস দিয়ে শুরু হলেও মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাসের ১২৩ রানের জুটি বাংলাদেশকে সঠিক পথেই রাখে। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির পর এই দফায়ও লিটন দাস খেলছিলেন দারুণ দাপুটে ভঙ্গিতে। ৩৮ রানে নিশ্চিত রান আউট থেকে রক্ষা পাওয়ার পর হাফ সেঞ্চুরির হাসি ছড়ায় তার ব্যাট। যেভাবে খেলছিলেন তাতে উভয় ইনিংসে সেঞ্চুরির স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছিল। কিন্তু ৬৯ রানে হাসান আলীর তৈরি করা ফাঁদে পড়ে থার্ডম্যানে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন লিটন। প্রথম ইনিংসে ১২৬ রানের পিঠে ৬৯ রান করে ব্যাট হাতে সিলেট টেস্টকে স্মরণীয় করে রাখলেন লিটন। একই টেস্টে সেঞ্চুরির সঙ্গে হাফ সেঞ্চুরি করার তালিকায় নিজের নামটা তৃতীয়বারের মতো লিখলেন লিটন দাস।

এদিন লিটনের সেঞ্চুরি মিসের সব দুঃখ পুষিয়ে দিল মুশফিক রহিমের ব্যাটিং। পুরোটা সময় মুশফিক যে কায়দায় ব্যাটিং করে গেলেন সেখানে ছিল তার অভিজ্ঞতার ছাপ। ব্যাট হাতে পাকিস্তানের বোলারদের শাসন করলেন এবং সেঞ্চুরির উল্লাসে ভাসলেন দিনের শেষ সেশনে। লেজের সারির ব্যাটারদের নিয়েও যে লড়াই করা যায়, প্রথম ইনিংসে লিটনের পরে দ্বিতীয় ইনিংসে সেই ভূমিকায় নামলেন মুশফিক। দলের শেষ জেনুইন ব্যাটার হিসেবে মেহেদি হাসান মিরাজ যখন ফিরলেন তখন দলের স্কোর ২৭২, মুশফিকের রান ৬৫। সেই মুশফিক টেলএন্ডারদের নিয়ে এরচেয়ে বেশি রান করলেন বাকিটা সময়, ৭২ রান! মুশফিক-তাইজুলের জুটিতে যোগ হয় ১২৮ বলে ৭৭ রান। দলের শেষ ব্যাটার হিসেবে মুশফিক যখন ফিরলেন তখন তার ব্যাট ১৩৭ রানের আলো ছড়াচ্ছে। তবে আরো অনেক রানের ক্ষিদে যে তার ছিল সেটা বোঝা গেল ড্রেসিংরুমে ফেরার সময়। হাতে থাকা হেলমেট পা দিয়ে জোরে এক শটে উড়িয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরলেন। নিজের ১৩৭ রানকে আরো বড় করতে চেয়েছিলেন তিনি। তার এই আচরণ ম্যাচ রেফারির চোখে পড়লে শাস্তি নিশ্চিত।

সেঞ্চুরির দিনে মুশফিকের ভুল বলতে গেলে শুধু এটুকুই।

সংক্ষিপ্ত স্কোর : বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৭৮ ও ৩৯০/১০ (জয় ৫২, লিটন ৬৯, মুশফিক ১৩৭, তাইজুল ২২, খুররাম সাজ্জাদ ৪/৮৬, সাজিদ ৩/১২৬)। পাকিস্তান: ২৩২ ও ০/০। *তৃতীয় দিন শেষে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন