মগ্নতা, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, অধ্যবসায়, রোলমডেল।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমনসব শব্দ যদি কোনো একজন ক্রিকেটারের নামের পাশে বসাতে চান, তবে তিনি কে?
সম্ভবত ক্রিকেটের সবচেয়ে সহজ কুইজ হবে এটি। হাত তুলে সবাই একটি নামই উচ্চারণ করবেন-‘মুশফিকুর রহিম’। এই টেস্ট দলের সবচেয়ে সিনিয়র ক্রিকেটার মুশফিক। কিন্তু এখনো প্রতিটি টেস্ট ম্যাচে যে তাড়না আর ভালো পারফরম্যান্সের ইচ্ছে নিয়ে মাঠে নামেন- সেটাই তাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিচ্ছে।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টেস্ট সিরিজে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের পর চলতি সিরিজে তার ব্যাটের দিকেই অনেকের নজর ছিল। ঢাকায় সেঞ্চুরির সুযোগ ছিল; কিন্তু হাফ সেঞ্চুরি নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। সিলেটে প্রথম ইনিংসে ২৩ রানে এলবিডব্লু হয়ে অনেক সময় নিয়ে মাঠ ছাড়েন। সুযোগ ছিল বড় কিছু করার- এমন দুঃখ নিয়েই সে ইনিংস শেষ হয় তার। কাল তৃতীয় দিনের সকালের প্রথম বলটি তাকেই মোকাবিলা করতে হয়। প্রথম বল থেকে তার ব্যাটে রুখে দাঁড়ানোর যে প্রতিজ্ঞা ঝরছিল, তাতেই স্পষ্ট প্রথম ইনিংসের দুঃখ ভোলার সময় এসেছে আজ। হাফ সেঞ্চুরির আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের ঝুঁকি নেননি তিনি। যথাসম্ভব নির্ভুল ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেন। সঙ্গী হিসেবে খানিক বাদে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে হারানোর পর আরো যেন সুদৃঢ় হয় তার ব্যাটিং ডিফেন্স। তার এই নিখুঁত ব্যাটিং পাকিস্তানি বোলারদের ক্লান্তি যেন আরো বাড়িয়ে দেয়। দেখা গেল তার পরে ব্যাটিংয়ে নেমেও লিটন দাস রানে তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। মুশফিকও সেটাই চেয়েছিলেন। এক প্রান্ত থেকে রান আসুক। অন্য প্রান্তে দৃঢ় ডিফেন্স, প্রতিরোধ।
এক ছক্কা ও তিন বাউন্ডারিতে ১০৩ বলে হাফ সেঞ্চুরির আনন্দে ব্যাট তুললেন। ভালোই জানতেন, পাকিস্তানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে মিডল অর্ডার থেকে বড় রানের প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনীয়তার বড় একটা পূরণ করল মুশফিক-লিটন জুটি। ১৮৮ বলে এ দুজনে যোগ করলেন ১২৩ রান। লিটন ৬৯ রানে ফিরতেই ভাঙে এই জুটি। সিলেট টেস্টের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন মুশফিক। সেদিনই জানিয়েছিলেন, ‘সিনিয়র হিসেবে আমি পুরো দলের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। আমার একটাই চেষ্টা থাকে, টিমের কাজে লাগতে পারে- এমন অবদান যাতে রাখতে পারি।’
সিলেট টেস্টে সে অবদানই রাখলেন মুশফিকুর রহিম ব্যাট হাতে। হাফ সেঞ্চুরির পর নতুন করে গার্ড নিলেন। আরো সতর্ক ভঙ্গিতে সামনে বাড়লেন। লিটন দাসের সঙ্গে তার লম্বা জুটি ভাঙার পর উইকেটে এলেন মেহেদি হাসান মিরাজ। চলতি সিরিজে ব্যাট হাতে পেছনের চার ইনিংসের কোনোটিতেই মেহেদি মিরাজ ‘বড় কিছু’ করতে পারলেন না। সিলেটেও সে ব্যর্থতা নিয়ে ফিরলেন বোল্ড হয়ে। মুশফিক জানলেন, বাকি সময়টুকু তাকে লড়তে হবে টেইলএন্ডারদের নিয়ে। সে দায়িত্ব দারুণভাবে পালন করলেন মুশফিক। নিজে খেললেন। অপর প্রান্তে থাকা ব্যাটারকে প্রতিটি ডেলিভারির ফাঁকে পরামর্শ দিলেন। সাহস জোগালেন। তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম ও নাহিদ রানা- এ চার টেলএন্ডারকে নিয়ে দলের স্কোরে যোগ করলেন ১১২ রান। যেখানে মুশফিকের একার জোগাড় ৭২ রান। এ সময়ের ব্যাটিংয়ে তাকে রক্ষণের সঙ্গে আক্রমণের তেজও দেখাতে হয়েছে। মুশফিকের সঙ্গে জুটিতে ব্যাটিং প্রসঙ্গে দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে তাইজুল বলছিলেন, ‘যখন ব্যাটিংয়ের সময় অন্য প্রান্তে কোনো সিনিয়র থাকেন, তখন কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়, খেলাটা সহজ হয়ে যায়, অনেক কিছু বুঝতে পারাটা সহজ হয়ে যায় আর অনেক তথ্যও পাওয়া যায়।’
মুশফিক এ ইনিংসে নিজের ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি টেলএন্ডারদের কাজও তেমন সহজ করে দিয়েছিলেন।
চা-বিরতির পর ৯১ রানে মুশফিক কিছু টেনশনে পড়েন। এলবিডব্লুর আবেদন উঠল। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নট আউট। পাকিস্তান রিভিউ নিল। কিন্তু সেই রিভিউও টিকল না। পরের সময়টায় পাকিস্তানকে আর কোনো সুযোগ দিলেন না মুশফিক। বাউন্ডারি হাঁকিয়ে সেঞ্চুরির উল্লাসে ভাসলেন। দুই হাতে ব্যাট ওপরে তুলে আদুরে ভঙ্গিতে আনন্দ ছড়ালেন। মাঠেই সিজদা দিলেন। এই সেঞ্চুরি মুশফিককে বাংলাদেশের টেস্ট রেকর্ডে পৌঁছে দিল নতুন উচ্চতায়। টেস্টে এতদিন সবচেয়ে বেশি ১৩ সেঞ্চুরি করে মুশফিক ও মুমিনুল সমান অবস্থানে ছিলেন। সে তালিকায় ১৪ সেঞ্চুরি নিয়ে মুশফিক এখন শীর্ষে।
বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ১০২টি টেস্ট। টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান। সবচেয়ে বেশি সময় (২১ বছর) ধরে টেস্টে খেলা। এখন সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরিও হলো তার। তবে এখানেই শেষ হয়। সামনের সময়ে আরো ম্যাজিক দেখানো বাকি রয়েছে মুশফিকের।
আস্থা রাখুন। ঠকবেন না।
বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরি
ব্যাটার সেঞ্চুরি
মুশফিকুর রহিম ১৪
মুমিনুল হক ১৩
তামিম ইকবাল ১০
নাজমুল হোসেন শান্ত ৯
লিটন দাস ৬
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

