বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক সময় পেস বোলিং ছিল প্রায় বিলুপ্ত শিল্প। টেস্ট জিততে স্পিন আর ধৈর্যের ওপরই নির্ভর করত টাইগাররা। কিন্তু ঢাকা টেস্টে যেন বদলে গেল সেই পুরোনো গল্প। টেস্টের শেষদিনের শেষ সেশনে দেখা গেল আগুনের মতো গতি আর বরফ-শীতল স্পিনের এক দুর্দান্ত মিশেল। পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে বাংলাদেশের পেসার ও স্পিনাররা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন ২০ উইকেট।
ম্যাচের শেষ বিকালে নাহিদ রানার আগুন ঝরানো বোলিং আর বাউন্সারে কাঁপিয়ে দেওয়া পাকিস্তানি ব্যাটারদের শরীরী ভাষা, স্টাম্প ছিটকে যাওয়া—সব মিলিয়ে মিরপুর যেন নতুন এক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। পাঁচ দিনের পুরো টেস্টেই আধিপত্য ছিল পেসারদের। বিশেষ করে পঞ্চম দিনের শেষ সেশনে নাহিদের ৪.৫ ওভারে ১০ রানে চার উইকেট নেওয়ার স্পেল ছিল অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসযজ্ঞের মতো।
তবে এটি কেবল গতির গল্প নয়। এ টেস্টে স্পিনার ও পেসাররা সমান ১০টি করে উইকেট নিয়েছেন। গত এক দশকে বাংলাদেশের কোনো টেস্ট জয়ে এমন ভারসাম্য দেখা যায়নি। এর আগে অনেক জয় এসেছে স্পিননির্ভর হয়ে; আবার কয়েকটি ম্যাচে পেসাররা আধিপত্য দেখিয়েছেন। কিন্তু এবার ছিল দুই ধারার নিখুঁত সমন্বয়।
এক সময় এমন দিনও গেছে, যখন বাংলাদেশের টেস্ট একাদশে কোনো পেসারই থাকত না; কিংবা তারা পুরো ইনিংসে ১০ ওভারেরও কম বল করত। ২০১৯ সালের শেষদিকেও বাংলাদেশের পেস বোলিং প্রায় ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল। সে জায়গা থেকে আজকের এই দৃশ্য যেন এক দীর্ঘ পথচলার ফল।
এই টেস্টে বাংলাদেশের পেসাররা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আঘাত করেছেন। সবচেয়ে আলোচিত ডেলিভারিটি আসে নাহিদ রানার হাত থেকে। মোহাম্মদ রিজওয়ানকে করা তার ইনসুইংটি রিভার্স করে এতটাই ভেতরে ঢুকেছিল যে, বল ছেড়ে দেওয়া রিজওয়ান হতবাক হয়ে যান। রানার শর্ট অব লেংথ ডেলিভারিটি হঠাৎ ভয়ঙ্করভাবে ভেতরে ঢুকে স্টাম্প উড়িয়ে দেয়। সে মুহূর্তে গ্যালারির ছোট্ট দর্শক-সমুদ্র থেকে শুরু করে বোলিং কোচ শন টেইট পর্যন্ত সবার মুখেই ছিল বিস্ময়ের হাসি।
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেন, ‘রানা যে রিভার্স সুইং করাতে পারবে- এটা দেখে আমরা নিজেরাও অবাক হয়েছি। আমি আর লিটন ওই ডেলিভারির পর কথা বলছিলাম, কিন্তু এতটা ভেতরে ঢুকবে ভাবিনি। এটা খুবই ভালো লক্ষণ। তাসকিন, ইবাদত, শরিফুল, খালেদ তো আগেই রিভার্স করতে পারে, এখন রানাও পারছে।’
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করেছিল ৯ উইকেটে ২৪০ রানে। পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য ছিল ২৬৮ রান, হাতে ছিল ৭০ ওভারের কিছু বেশি সময়। অনেকের কাছে এটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত মনে হলেও শান্তদের আত্মবিশ্বাস ছিল নিজেদের বোলিং আক্রমণ নিয়ে।
শান্ত বলেন, ‘আমাদের বোলিং আক্রমণের ওপর বিশ্বাস ছিল বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। পাঁচজন বোলারই দক্ষ এবং সবাই ভালো বোলিং করেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে তাসকিন প্রথম উইকেট এনে গতি তৈরি করে দেয়। এরপর তাইজুল মাঝের ওভারে দুর্দান্ত বোলিং করেছে। তবে তাসকিন ও রানার স্পেল ছিল অসাধারণ।’
বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে সব সময় ‘বোলিং পার্টনারশিপ’ নিয়ে আলোচনা হয় বলেও জানান তিনি। প্রথম ইনিংসে মিরাজ ও তাসকিন, দ্বিতীয় ইনিংসে তাইজুল-তাসকিন-রানা-মিরাজ জুটিতে চাপ তৈরি করেছে পাকিস্তানের ওপর।
প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়া মেহেদী হাসান মিরাজের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন শান্ত। দেশের মাটিতে এটি কেবল দ্বিতীয়বার, যেখানে এক টেস্টে বাংলাদেশের একজন স্পিনার ও একজন পেসার দুজনই পাঁচ উইকেট নিয়েছেন।
স্পিনারদেরও কৃতিত্ব দিতেই হবে। তারা উইকেট নিয়েছে, আবার এক প্রান্ত ধরে রেখেছে। ফলে যখন পেসার আনা হয়েছে, ব্যাটারদের দ্রুত মানসিকতা বদলাতে হয়েছে। এটা সহজ নয়। মিরাজ প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের রান বাংলাদেশের নিচে রেখেছেন।
শেষ বিকালে যখন নাহিদ রানা প্রতিটি বল করতে দৌড়ে আসছিলেন, ছোট্ট গ্যালারিটাও যেন আরো জোরে গর্জে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত শাহিন আফ্রিদিকে বাউন্সারে শর্ট লেগে ক্যাচ বানিয়ে ম্যাচ শেষ করেন তিনি। তখন মাঠ ও মাঠের বাইরে শুরু হয় বাংলাদেশের উদযাপন।
মজার ব্যাপার হলো, শান্ত পরে জানান—বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষে শাহিন আফ্রিদি একটি বাউন্সারে নাহিদ রানাকে আঘাত করেছিলেন। সে ঘটনারই যেন প্রতিশোধ নিলেন তরুণ পেসার।
‘ওরা বুঝে গেছে রানাকে যদি বাউন্সার দাও, তাহলে সে ফিরিয়েও দিতে পারে। আমি হলে রানাকে বাউন্সার করতাম না। আমরা পাল্টা জবাব দিতে পারি; এটা দেখতে ভালো লাগে’-রানার সেই বিস্ময়কর ডেলিভারি নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন অধিনায়ক শান্ত।
মিরপুর টেস্ট তাই কেবল একটি জয় নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের বদলে যাওয়ার গল্প। যেখানে স্পিনের চাতুর্যের পাশে দাঁড়িয়ে গেছে আগুন ঝরানো গতি। যেখানে টাইগাররা শুধু জিততে শেখেনি, প্রতিপক্ষকে জবাব দিতেও শিখেছে।
মোহাম্মদ ইসাম, ক্রিকইনফোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
