লিটন খেললেন এবং অনেক কিছু শেখালেন

এম. এম. কায়সার, সিলেট থেকে

লিটন খেললেন এবং অনেক কিছু শেখালেন

সেঞ্চুরি অনেকেই করেন। কিন্তু নিজের রান করা। উইকেট বাঁচানো। প্রতিটি রান এবং প্রতিটি বল খেলার সময় অন্য প্রান্তে থাকা ব্যাটারকে রক্ষা করাও যখন বাড়তি কাজ হয়ে দাঁড়ায়, তখন দায়িত্বের বোঝা অনেক ভারী।

লিটনের ১২৬ রানের সেঞ্চুরি সেই ভারবহন করল গতকাল সিলেটে। টেস্টে ছয় নম্বর পজিশনে ব্যাট করেন লিটন। এ সময়টায় ভাগ্য সহায়ক হলে জেনুইন দুই ব্যাটারের সঙ্গে তাকে ইনিংস গড়ার বা উদ্ধারকাজ করতে হয়। তবে বেশিরভাগ সময় তাকে লেজের সারির ব্যাটারদের নিয়ে এ লড়াইয়ে নামতে হয়। যেমন নামলেন গতকালের সিলেট টেস্টে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর উইকেট পড়তেই লিটন দাস ব্যাটিংয়ে এলেন। ক্রিজে তখন তার সঙ্গী মুশফিকুর রহিম। কিন্তু গড়ে ওঠার আগেই এ জুটি ভেঙে গেল। উইকেটে যোগ দিলেন মেহেদি হাসান মিরাজ। এ জুটিও টিকল না। লিটনের সঙ্গে জুটিতে মাত্র ছয় রান যোগ হলো আর প্রথমে মুশফিক এবং খানিক বাদে মেহেদি মিরাজ ফিরে গেলেন। লিটনের সঙ্গে তখন সপ্তম উইকেট জুটিতে এসে যোগ দিলেন তাইজুল ইসলাম। একটু জানিয়ে দিই, সে সময় লিটনের রান ১৩ বলে ২। দলের স্কোর ১১৬ রান। সেই লিটন যখন আউট হলেন, তখন তার ব্যাটে ১২৬ রানের সেঞ্চুরির ঝিলিক। দলের স্কোর তখন ২৭৮। শেষ পর্যন্ত সেই ২৭৮ রানেই সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থামল। দলের মোট রানের প্রায় ৫০ শতাংশের মতো লিটনের একারই!

বিজ্ঞাপন

এ পরিসংখ্যানে লিটনের সেঞ্চুরির গুরুত্ব বোঝানো যাবে না। কিন্তু যখন আপনি দেখবেন লিটন তার ১২৬ রানের এই সেঞ্চুরি করার সময় অপর প্রান্তে সঙ্গী হিসেবে কোনো ব্যাটারদের পেয়েছিলেন তখন আপনি বুঝবেন, এই সেঞ্চুরির মূল্যায়ন কেমন হওয়া উচিত।

লিটন তার ১২৬ রানের মধ্যে ১২৪ রান করেন যে সঙ্গীদের নিয়ে, তারা হলেন- তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম। তিনজনই কিন্তু দলের মূল বোলার। ব্যাটিং তাদের মূল কাজ নয়। ব্যাটিংয়ে তেমন দক্ষও নন তারা। অথচ এই তিনজনকে সঙ্গী করে পুরো ৩৮ ওভার ব্যাটিং করলেন লিটন। এ সময়ে দলের স্কোরে জমা হয় ১৬২ রান। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ইনিংসের শুরুর ৩৮.২ ওভারে বাংলাদেশ হারায় ৬ উইকেট, যেখানে দলের জমা ১১৬ রান।

-কী বুঝলেন?

দলের শীর্ষ ছয় ব্যাটার মিলে জমা করলেন ১১৬ রান যে ওভারে, সেই পরিমাণ ওভার খেলে লেজের সারির তিন ব্যাটারকে নিয়ে লিটন দাস জুড়লেন ১৬২ রান, যেখানে তার একার সংগ্রহ ১২৪!

ওভারের প্রতি বল গুনে খেলতে হয়েছে তাকে। বারবার সিঙ্গেল রান এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু সিঙ্গেল রান নিলেই অন্য প্রান্তের লেজের ব্যাটার স্ট্রাইকে আসবেন। তখন তাকে আউট করার সহজ সুযোগ পাবেন পাকিস্তানের বোলাররা। ওভারের শেষ বলে সিঙ্গেল নিয়ে প্রান্ত বদলে ফের স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখার বাড়তি দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে লিটনকে পুরো ইনিংসে। লিটনের এ কৌশল দেখে পাকিস্তান তার ব্যাটিংয়ের সময় ফিল্ড বিস্তৃত করে, যাতে ডাবল বা বাউন্ডারি সহজে না পাওয়া যায়। নিজের ও দলের ইনিংস বাড়ানো এবং একই সময়ে সঙ্গী ব্যাটারদের রক্ষার দায়িত্ব দারুণ দক্ষতার সঙ্গে পালন করলেন লিটন দাস।

নিজের এই বাড়তি দায়িত্ব প্রসঙ্গে দিনের খেলা শেষে লিটন বলছিলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের সময় আমার রোলটা একটু ভিন্ন ধরনের। দলের জেনুইন ব্যাটারদের সঙ্গে যখন ব্যাট করি, তখন মাইন্ডসেট আলাদা থাকে। তখন সিঙ্গেল বা ডাবল নিয়ে বাড়তি কোনো পরিকল্পনা করতে হয় না। কিন্তু টেলএন্ডারদের সঙ্গে ব্যাটিংয়ের সময় এগুলো মাথায় রেখেই সামনে বাড়তে হয়। আমি মেনে নিই যে, টেলএন্ডাররা আমাকে অন্য প্রান্তে থেকে সহায়তা দেবেন। কিন্তু ব্যাটসম্যান হিসেবে রান তো আমাকেই করতে হবে। ওই দায়িত্ব তো আমারই। তবে এই ইনিংসে টেলএন্ডাররা হয়তো রান তেমন করেননি কিন্তু উইকেটে তারা ছিলেন লম্বা সময় ধরে। ওরা অনেকগুলো বল খেলেছেন। তাই দলের স্কোরও বড় হয়েছে।’

সব কৃতিত্ব শুধু নিজে নিতে হয় না। আনন্দ বিলিয়ে দেওয়ায় যে অনন্য সুখ আছে, লিটনের সেঞ্চুরি সে সত্যই জানাচ্ছে। ১৫৯ বলে ১৬ বাউন্ডারি ও ২ ছক্কায় ১২৬ রানের লিটন দাসের এই সেঞ্চুরি শুধু নেহাত আরেকটি সেঞ্চুরি নয়; এখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়:
এলাকার খবর
Loading...