১৯ বছরের গল্পে দুই ‘তারকা-মহাতারকা’

১৯ বছরের গল্পে দুই ‘তারকা-মহাতারকা’

ফুটবল কখনো কখনো এমন সব গল্প লেখে, যা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। ২০০৭ সালে বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুর ড্রেসিংরুমে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ফটোশুটে ২০ বছর বয়সি এক তরুণ ফুটবলার কোলে তুলে নিয়েছিলেন ছয় মাসের এক শিশুকে। শিশুটিকে ছোট্ট একটি বাথটাবে গোসলও করিয়েছিলেন তিনি। ১৯ বছর পর সেই দুই মানুষই এখন বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে আলোচিত দুই নাম। একজন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি, অন্যজন স্পেনের তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল।

দুজনের এই ছবি আরো আগেই ভাইরাল হলেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিশ্বকাপের ফাইনাল উপলক্ষে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ওঠা ছবিগুলো নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এগুলো কি সত্যি? উত্তরটা দিয়েছে স্বয়ং ইউনিসেফ ও ছবির ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ত। যারা নিশ্চিত করেছেন সর্বকালের সেরা ফুটবল মহাতারকা ও একালের আলোকবর্তিকার মিলনবিন্দু সঠিকই ছিল।

বিজ্ঞাপন

একটি ক্যালেন্ডারের জন্য শুরু হয়েছিল গল্প। ২০০৭ সালে কাতালান দৈনিক ‘দিয়ারি স্পোর্ত’ এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডার প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। বার্সেলোনার মাতারো এলাকার কয়েকটি পরিবার লটারির মাধ্যমে ওই ফটোশুটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। ভাগ্যক্রমে নির্বাচিত হয়েছিল লামিন ইয়ামালের পরিবারও। সেদিন মাত্র ছয় মাস বয়সি ইয়ামালকে কোলে নেন তখনকার ২০ বছর বয়সি লিওনেল মেসি। ক্যাম্প ন্যুর ড্রেসিংরুমে একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের বাথটাবে শিশুটিকে গোসল করানোর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ত। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি, সেই শিশুই একদিন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে মেসির প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন।

বহু বছর অজানাই ছিল ছবির গল্প। ফটোশুটের ছবিগুলো প্রকাশিত হলেও তা খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। প্রায় ১৭ বছর ধরে ঘটনাটি বিস্মৃতই ছিল। ২০২৪ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে লামিন ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই পুরোনো ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি ক্যাপশন দেন ‘দুই কিংবদন্তির শুরু’। এরপরই ছবিগুলো বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়।

ফটোগ্রাফারের চোখে এ এক ‘অলৌকিক’ ছবি। ছবিগুলোর আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত সম্প্রতি স্প্যানিশ গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি কখনো ভাবেননি একটি সাধারণ দাতব্য ফটোশুটের ছবি একদিন বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রতীক হয়ে উঠবে। তার ভাষায়, ‘এটা যেন এক অলৌকিক ঘটনা।’ মনফোর্ত জানান, শিশুর ছবি তোলা সহজ নয়। মেসিও তখন বেশ অস্বস্তিতে ছিলেন। তাই পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে একটি রাবারের খেলনা হাঁস পর্যন্ত ব্যবহার করতে হয়েছিল।

বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াইকে অনেকেই দেখছেন মশাল হস্তান্তরের প্রতীক হিসেবে। একদিকে ৩৯ বছর বয়সি লিওনেল মেসি, যার ক্যারিয়ারের সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। অন্যদিকে ১৯ বছর বয়সি লামিন ইয়ামাল, যাকে অনেকেই বিশ্ব ফুটবলের আগামী মহাতারকা হিসেবে দেখছেন। এই গল্পকে ফুটবলের ‘অতীত ও ভবিষ্যতের মিলন’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মেসি ও ইয়ামালের সম্পর্ক শুধু সেই ছবিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দুজনই এখন ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ ভবিষ্যতের পক্ষে কাজ করছেন। ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে তারা বিশ্বের শিশুদের জন্য সচেতনতা তৈরির দায়িত্বও পালন করছেন।

আগামীকাল নিউ ইয়র্কের ফাইনালে একজন হয়তো ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে চাইবেন, আর অন্যজন নিজের প্রথম বিশ্বজয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে নামবেন। কিন্তু ফল যাই হোক, ফুটবল ইতোমধ্যেই একটি অসাধারণ গল্প লিখে ফেলেছে, যেখানে একদিন একজন কিংবদন্তি কোলে নিয়েছিলেন ভবিষ্যতের আরেক সুপারস্টারকে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন