মেসি-ইয়ামালের দ্বৈরথে চ্যাম্পিয়ন ‘লা মাসিয়া’

মেসি-ইয়ামালের দ্বৈরথে চ্যাম্পিয়ন ‘লা মাসিয়া’

ফুটবলের কিছু গল্প কোনো ক্লাব, দেশ কিংবা ট্রফির সীমানায় আটকে থাকে না। সেগুলো সময়কে ছাপিয়ে যায়। সময়ের ক্রমে রূপ নেয় কিংবদন্তিতে। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালও ঠিক তেমনই একটি গল্প লিখতে চলেছে। এক পাশে ৩৯ বছর বয়সি লিওনেল মেসি, একটি যুগের শেষ আলোকবর্তিকা। অন্য পাশে ১৯ বছর বয়সি তরুণ লামিন ইয়ামাল, নতুন এক যুগের সূর্যোদয়। দুজন দুই দেশের জার্সিতে। একজন আর্জেন্টিনার, অন্যজন স্পেনের। কিন্তু গল্পের উপসংহারে এসে দুজন মিলিত হলেন শৈশবের ঠিকানা ‘লা মাসিয়ায়’। কীভাবে? উত্তরও উপসংহারেই।

ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম প্রতিষ্ঠানই আছে, যাদের পরিচয় শুধু একটি একাডেমি নয়, একটি দর্শন। ১৯৭৯ সালে কাতালুনিয়ার পুরোনো কৃষকবাড়ি ‘লা মাসিয়া দে ক্যান প্লানেস’-কে যুব একাডেমিতে রূপ দেয় বার্সেলোনা। সেই ছোট্ট পাথরের বাড়িটিই পরে হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবল শিক্ষালয়। এখানে শুধু ফুটবল শেখানো হয় না; শেখানো হয় বলকে ভালোবাসতে, জায়গা তৈরি করতে, ছোট পাসে খেলা গড়তে এবং দলকে নিজের চেয়ে বড় ভাবতে।

বিজ্ঞাপন

ইয়োহান ক্রুইফের ফুটবল দর্শন সেই একাডেমির শিরায়-শিরায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে পেপ গার্দিওলা সেই দর্শনকে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফুটবলে রূপ দেন। আধুনিক ফুটবলে যে টিকিটাকার চোখধাঁধানো বিস্ময়তা, সেটার শুরু এই লা মাসিয়া থেকেই। বার্সেলোনা-লা মাসিয়া বলতে অনেকেই লিওনেল মেসিকে জানলেও স্প্যানিশ রূপকথার অনেক নায়কও এখান থেকেই উড়েছেন মৌমাছি হয়ে, ঘুরে ঘুরে ছড়িয়েছে নন্দনকাননের সুবাস।

এই একাডেমি উপহার দিয়েছে জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কার্লোস পুয়োল, সার্জিও বুসকেতস, জেরার্ড পিকে, ভিক্টর ভালদেস, সেস্ক ফ্যাব্রেগাস, থিয়াগো আলকানতারা, গাভি, আলেসান্দ্রো বালদে, পাও কুবার্সি, ফারমিন লোপেজের মতো তারকাদের। শেষ নামটি অবশ্য নেওয়া হয়নি, লামিন ইয়ামাল; স্প্যানিশ ফুটবলের আলোকবর্তিকা যার হাতে। তাদের অনেকেই শুধু বার্সেলোনাকে নয়, বিশ্ব ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন।

২০০৯ থেকে ২০১১—এই তিন বছরে বার্সেলোনাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাব দলে পরিণত করেছিল যে ফুটবল, তার প্রাণ ছিলেন মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেতস ও পুয়োল। পাঁচজনই লা মাসিয়ার ঘাসের বুক আগলে বেড়ে উঠেছেন। ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে স্পেনকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেওয়া গোলটি করেছিলেন ইনিয়েস্তা। সেই আক্রমণেও ছিল লা মাসিয়ার ছাপ। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চেও কাতালুনিয়ার সেই ছোট্ট একাডেমি নিজের স্বাক্ষর রেখেছিল। ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনাল। আবারও আলোচনার কেন্দ্রে লা মাসিয়া।

তবে এবার গল্পটা আরো কাব্যিক।

এই গল্পের একজন সেই ছেলেটি, যাকে ১৩ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা থেকে বার্সেলোনায় এনে চিকিৎসা করিয়েছিল ক্লাবটি। গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভোগা ক্ষুদে ছেলেটির জন্য ন্যাপকিন কাগজে লেখা হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত চুক্তি। সেই ছেলেটিই হয়ে উঠলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। মেসির কথা যে বলছি সেটা বিখ্যাত ন্যাপকিনে চুক্তিতেই বুঝে যাওয়ার কথা। আরেকজন সেই শিশুটি, যার নাম লামিন ইয়ামাল। তার জন্ম হয়েছিল স্পেনের মাতারো শহরে। মাত্র ৭ বছর বয়সে লা মাসিয়ার দরজায় কড়া নাড়ে সে। বয়সভিত্তিক প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে এমন গতিতে উঠে আসে, যা বার্সেলোনার ইতিহাসেও বিরল। ১৬ বছর বয়সে অভিষেক, ১৭ বছরেই ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন, আর ১৯ বছরেই বিশ্বকাপের ফাইনাল।

এ যেন একই বইয়ের দুই অধ্যায়। একটি শেষ হওয়ার আগে আরেকটি শুরু।

বিশ্বকাপের আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এই লড়াইকে দেখছে দুই প্রজন্মের প্রতীকী সংঘর্ষ হিসেবে। বিবিসি লিখেছে, মেসি এখনো শেষ কথা বলে যেতে চান। আলজাজিরা বলছে, স্পেনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ইয়ামাল, আর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা এখনো মেসি। দ্য অ্যাথলেটিকের বিশ্লেষণে এই ফাইনালকে বলা হয়েছে ‘ফুটবলের অতীত ও ভবিষ্যতের সাক্ষাৎ’।

কিন্তু বার্সেলোনার চোখে এই ম্যাচের আরেকটি পরিচয় আছে। একজন সাবেক নম্বর ১০। অন্যজন সেই জার্সির নতুন উত্তরাধিকারী। মেসির বিদায়ের পর বহু বছর ধরে যে প্রশ্নটি বার্সেলোনাকে তাড়া করেছে, পরবর্তী মেসি কে? ইয়ামাল সেই প্রশ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হয়ে উঠেছেন।

ফাইনালে জিতবে হয় আর্জেন্টিনা, নয় স্পেন। মেসি নিজের শেষ বিশ্বকাপটিকে রূপকথা বানাতে চাইবেন। ইয়ামাল চাইবেন নতুন এক সাম্রাজ্যের সূচনা করতে। কিন্তু ট্রফি যেদিকেই যাক, শেষ পর্যন্ত জয়টা হবে ভিন্ন কিছুর। সেটি কোনো ফুটবলার নয়। কোনো কোচও নয়। কাতালুনিয়ার সেই পাথরের পুরোনো বাড়ি ‘লা মাসিয়া’।

বিশ্বকাপের ট্রফির সোনালি আলোয় ভরে উঠবে নিউ ইয়র্কের আকাশ। বিজয়ীর গানে গলা মেলাবেন মেসি কিংবা ইয়ামাল আর তার সুরতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে কাতালুনিয়ার ছোট্ট উঠোনে; যেখান থেকে বারবার বদলে গেছে ফুটবলের ইতিহাস আর বেজে উঠেছে স্প্যানিশ সুর, ‘বার্সেলোনা, মোর দ্যান এ ক্লাব’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন