খ্রিষ্টানরা ইসরাইলের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ নন

রেভারেন্ড ড. ফারেস আব্রাহাম

খ্রিষ্টানরা ইসরাইলের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ নন
ছবি: সংগৃহীত

ওয়াশিংটনে ‘ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরাইল’-এর (সিইউএফআই) তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলন শেষ হয়েছে ৭ জুলাই। এটি আমেরিকার ইসরাইলপন্থি খ্রিষ্টান লবিং বা তদবিরকারী অন্যতম গোষ্ঠী। এই সম্মেলনে আলোচনা ও বক্তৃতার মূল বিষয় ছিল ইসরাইলের প্রতি খ্রিষ্টানদের শর্তহীন সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং এর পক্ষে যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, ‘ঈশ্বরের মনোনীতদের আশীর্বাদ করার বাইবেলসম্মত নির্দেশ’ পালনের বিষয়টিকে।

সিইউএফআই এবং জায়নবাদী অন্যান্য খ্রিষ্টান সংগঠন ইসরাইলের প্রতি সমর্থন জানানোকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিষয় হিসেবে না দেখে ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা বা মাপকাঠি হিসেবে দাঁড় করায়। কিন্তু অধিকৃত পশ্চিমতীরে জন্মগ্রহণকারী একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান খ্রিষ্টান হিসেবে আমি মনে করি, এই দাবিটি শুধু রাজনৈতিকভাবেই বিপজ্জনক নয়, বরং এটি ধর্মতাত্ত্বিকভাবে বিকৃত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন।

বিজ্ঞাপন

কোনো রাজনৈতিক অবস্থানকে যখন ঐশ্বরিক নির্দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন সাধারণ নৈতিক বিচার-বিশ্লেষণও সন্দেহের মুখে পড়ে। সামরিক সহায়তা, বসতি সম্প্রসারণ, গাজায় গণহত্যা কিংবা ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণের মতো বিষয়গুলো তখন আর নীতিগত বিতর্ক হিসেবে দেখা হয় না। সিইউএফআইয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে এগুলোর বিরোধিতা করা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করারই নামান্তর।

এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার, সিইউএফআই সব খ্রিষ্টানের প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং বিভিন্ন ধারার অনেক খ্রিষ্টানই এই সংগঠনটির চরমপন্থি অবস্থানের বিরোধিতা করেন। ইহুদি জনগণের প্রতি খ্রিষ্টানদের ভালোবাসা থাকা উচিত কি না, সেটি অবান্তর প্রশ্ন। কারণ, সব মানুষকে ভালোবাসার নির্দেশই খ্রিষ্টানদের দেওয়া হয়েছে বাইবেলে। কিন্তু ইহুদি জনগণের প্রতি ভালোবাসার অর্থ কোনোভাবেই আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়। কোনো সরকারের যেসব নীতিতে ফিলিস্তিনিরা গণহত্যা ও উচ্ছেদের শিকার হয়েছে, চলাচলের স্বাধীনতা হারিয়েছে এবং খ্রিষ্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জীবন ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে, সেই নীতি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং এর সঙ্গে ইহুদিদের প্রতি ভালোবাসারও কোনো সম্পর্ক নেই।

সিইউএফআইয়ের বক্তব্যের মূল ত্রুটি হলো, তারা ইহুদি জনগোষ্ঠী, বাইবেলের ইসরাইল, আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্র এবং বর্তমান ইসরাইল সরকারকে একটি অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে গণ্য করে। অথচ বাস্তবে এগুলো এক নয়। ইহুদিরা একটি জাতি। আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্রটি হলো ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্র যার নিজস্ব সীমানা, নির্বাচন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল ও সামরিক শক্তি আছে। এর সরকার হলো একটি সাময়িক রাজনৈতিক জোট, যার গৃহীত নীতিমালার বিচারবিশ্লেষণ করা সম্ভব এবং তা অবশ্যই করতে হবে।

এসব বিষয়কে বাইবেল নির্দেশিত আনুগত্য হিসেবে গণ্য করা আসলে কোনো আনুগত্যই নয়, এটি মূলত রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব। এমনকি খ্রিষ্টানরা যদি বিশ্বাসও করেন, ঈশ্বরের পরিকল্পনায় ইহুদি জনগণের একটি অনন্য স্থান আছে, তবু সেই বিশ্বাসের কারণে কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা সামরিক অভিযান নৈতিক বিচার-বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের গণ্ডির বাইরের পাঠকদের কাছে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে যে, প্রাচীন বাইবেলীয় ধর্মগ্রন্থগুলো ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের প্রতি আমেরিকার নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।

তবে খ্রিষ্টান জায়নবাদী ধর্মতত্ত্বে আব্রাহাম ও ইসরাইলের প্রতি ঈশ্বরের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্রকে সমর্থন করার একটি চলমান নির্দেশ হিসেবে দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রায়ই আদিপুস্তক (জেনেসিস) ১২-এর সেই বাণীটি উদ্ধৃত করা হয়—‘যারা তোমাকে আশীর্বাদ করবে, আমি তাদের আশীর্বাদ করব।’

তবে বাইবেলের বর্ণনায় আব্রাহামের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি কখনোই কোনো রাষ্ট্রের দায়মুক্তি বা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকার ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এটি নিশ্চিত করা যে, ‘পৃথিবীর সব পরিবার’ আশীর্বাদপ্রাপ্ত হবে। নবীরা অবিচারকে উপেক্ষা করে ইসরাইলকে আশীর্বাদ করেননি, বরং তারা দেশটির মন্দ শাসকদের মুখোমুখি হয়ে অসহায়দের রক্ষা করেছেন এবং সহিংসতা, ঔদ্ধত্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।

যিশু তার অনুসারীদের কোনো নির্দিষ্ট জাতিকে পবিত্র বা প্রশ্নাতীত মনে করার শিক্ষা দেননি। বরং এর বিপরীতে তিনি তাদের প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে, শত্রুদের আশীর্বাদ করতে এবং শান্তির দূত হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের খ্রিষ্টানরা এখন ‘ক্রিশ্চিয়ান জায়োনিস্ট’ (খ্রিষ্টান জায়নবাদী) ধর্মতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক আখ্যানের ত্রুটিপূর্ণ যুক্তিগুলো বুঝতে শুরু করেছেন।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান ইসরাইলের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী খ্রিষ্টানদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ৬১ শতাংশ ক্যাথলিক জানিয়েছেন, ইসরাইল সম্পর্কে তাদের মতামত নেতিবাচক।

যদিও শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যালরা এখনো ইসরাইলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সমর্থক হলেও তাদের মধ্যেও জনমতের এই ধারাটি পরিবর্তিত হচ্ছে। পিউ রিসার্চের একই জরিপে দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, যা ২০২৫ সালে ছিল ২৬ শতাংশ।

অনেক ইভানজেলিক্যাল যাজক ও নেতা আমাকে জানিয়েছেন, বেথলেহেম, বেইত সাহুর, জেরুসালেম, তাইবেহ এবং গাজার খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জীবনে দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ, সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যদিনের লাঞ্ছনা কী অর্থ বহন করে তা কোনো ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানের মুখে তারা আগে কখনো শোনেননি।

ফিনিক্সে আয়োজিত খ্রিষ্টান তরুণদের সম্মেলন ‘আরবানা ২৫’-এ আমি ভিন্ন এক আশার আলো দেখেছি, যেখানে সাত হাজার শিক্ষার্থী ও নেতা সমবেত হয়েছিলেন। সেখানে আমি ‘জুইস ফর জিসাস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যারন আব্রামসনের সঙ্গে একই মঞ্চে কথা বলেছি। সেখানে আমরা বলেছি, খ্রিষ্টানদের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের প্রতিযোগিতায় নামার প্রয়োজন নেই, বরং আমরা পরস্পরের বেদনাকে স্বীকার করে নিতে পারি এবং যৌথভাবে অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারি। এরপর ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য শিক্ষার্থীরা আমাকে ধন্যবাদ জানাল। তারা কোনো নতুন শত্রুর সন্ধানে ছিল না, বরং তারা সত্য প্রকাশের আরো বিশ্বস্ত একটি পথ খুঁজছিল।

ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টানদের নতুন প্রজন্ম ইহুদিদের নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনিদের মর্যাদার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার মিথ্যা ও সংকীর্ণ পথকে প্রত্যাখ্যান করে। খ্রিষ্টানরা মুসলিম-বিদ্বেষকে প্রশ্রয় না দিয়েই ইহুদি-বিদ্বেষের (অ্যান্টিসেমিটিজম) তীব্র বিরোধিতা করতে পারে। গাজার ধ্বংসযজ্ঞকে যৌক্তিক প্রমাণ না করেও তারা ৭ অক্টোবরের ভয়াবহতা নিয়ে শোক প্রকাশ করতে পারে।

ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ ৭ অক্টোবর থেকেই শুরু হয়েছিল, এমন ভ্রান্ত ধারণা পোষণ না করেও তারা সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। আবার ফিলিস্তিনিদের চিরস্থায়ী উচ্ছেদ বা অধিকারচ্যুতির বিষয়টিকে সমর্থন না করেও তারা ইসরাইলের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে পারে। এতে বিতর্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই। বিষয়টি তখনই বিতর্কিত হয়ে ওঠে যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বার্থে ধর্মতত্ত্বকে বিকৃত করা হয়।

গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানদের হত্যা করেছে এবং গির্জায় বোমা হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সেখানের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়গুলো বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং স্বজন হারানোর শোকে তারা মুহ্যমান হয়ে পড়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে গির্জার নেতারা বসতি স্থাপনকারীদের (সেটলার) ক্রমবর্ধমান হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এদিকে, ‘রসিং সেন্টার’ (Rossing Center) নামের একটি সংস্থা পবিত্র ভূমিতে খ্রিষ্টান ও তাদের সম্পত্তির ওপর ১৫৫টি হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে।

এ কারণেই আমার পরিচিত অনেক ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান এমন ধর্মতত্ত্ব নিয়ে ক্রমেই অস্বস্তি বোধ করছেন, যা ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে ধর্মগ্রন্থের দোহাই দেয়। তারা তাদের বিশ্বাসকে এমন সব নীতিকে বৈধতা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে দিতে রাজি নন, যে নীতিগুলো তাদের প্রতিবেশীদের ক্ষতি করে এবং খ্রিষ্ট ধর্মের জন্মভূমিতেই গির্জার কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেয়।

বাইবেলের প্রকৃত নির্দেশ কোনো পতাকা বা সামরিক বাহিনীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং সত্য বলা, দয়া প্রদর্শন এবং শান্তি স্থাপনই এর মূল কথা। এর অর্থ হলো পক্ষপাতহীন ভালোবাসা এবং ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতির বিশ্বস্ততার সঙ্গে মানুষের দায়মুক্তির (শাস্তি না পাওয়ার) বিষয়টিকে গুলিয়ে না ফেলা। খ্রিষ্টানরা যদি পবিত্র ভূমির মানুষের কল্যাণ চায়, তবে তাদের সব ধরনের অবিচারের বিরোধিতা করা উচিত।

আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন