সকালবেলার কাঁচা রোদ সমুদ্রের লোনা পানিতে প্রতিফলিত হয়ে যখন চিকমিক করে ওঠে, তখন কক্সবাজার, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী-আনোয়ারা, খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় মাঠে এক অদ্ভুত নীরবতা খেলা করে। মাঠজুড়ে সারি সারি শ্বেতশুভ্র লবণের স্তূপ—যেন মাটির বুকে বিছিয়ে রাখা কোনো রুপালি চাদর। এই শ্বেতশুভ্র লবণ, যাকে এ দেশের মানুষ প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অতি সাধারণ এক অনুষঙ্গ মনে করে, তা আসলে উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস এই খাতটি এখন এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়, অন্যদিকে নীতিগত দুর্বলতা আর আমদানির চোরাবালিতে পড়ে কাঁদছে দেশের এই সম্ভাবনাময় লবণশিল্প।
দেশীয় উৎপাদনের সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্তের দিকে তাকালে এই শিল্পের একটি মিশ্র চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে ৪০ হাজার ১৫০ জনেরও বেশি চাষি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত আছেন। একরপ্রতি গড় উৎপাদন প্রায় ২৮ দশমিক ৭০ টন বা ৭১৮ মণ। বিগত ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশীয় চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে লবণের রেকর্ড উৎপাদন হয়েছিল, যা আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু অতি সম্প্রতি, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ উৎপাদন মৌসুমে জলবায়ুর পরিবর্তন এই অগ্রযাত্রায় বড় একটি ধাক্কা দিয়েছে।
চলতি মৌসুমে যেখানে অভ্যন্তরীণ লবণের বার্ষিক চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৭ দশমিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন, সেখানে প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৯ দশমিক ৪৫ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, প্রায় ৭ দশমিক ৭ লাখ মেট্রিক টনের একটি বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই ঘাটতি কি চাষিদের অলসতার কারণে? মোটেও না। এর পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ প্রকৃতির এক বৈরী আচরণ। পুরো মৌসুম জুড়ে ঘন কুয়াশা, দীর্ঘস্থায়ী মেঘলা আকাশ এবং মে মাসের শুরুতেই অসময়ের আগাম বৃষ্টির কারণে চাষিরা প্রায় ৩৬টি দিন মাঠেই নামতে পারেননি। লবণ উৎপাদন সম্পূর্ণ রোদ ও শুষ্ক আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। রোদের আলোর তীব্রতা যখন হ্রাস পায়, তখন চাষির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট ও অর্থনৈতিক কিছু নির্মম বাস্তবতার সংকট। মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিলে জানা যায়, সমুদ্রের লোনা পানি জমিতে তুলতে চাষিদের শ্যালো ইঞ্জিন ও জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে গেছে। অথচ মাঠপর্যায়ে চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। মৌসুমের শুরুতে যখন লবণের দাম প্রতি মণ ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় নেমে আসে, তখন চাষির উৎপাদন খরচই ওঠে না। এই সুযোগে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য
উপকূলের অধিকাংশ লবণচাষি অত্যন্ত প্রান্তিক। মৌসুমের শুরুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) জমি ইজারা নেওয়া, পলিথিন কেনা এবং শ্রমিক খাটানোর জন্য তাদের এককালীন মোটা অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন হয়। ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের জটিলতার কারণে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ চাষি স্থানীয় মহাজন, ফড়িয়া বা গুদামজাতকারীদের কাছ থেকে চড়া সুদে অগ্রিম টাকা বা ‘দাদন’ নিতে বাধ্য হন। এই দাদনের শর্তই থাকে—মৌসুম শেষে উৎপাদিত লবণ বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে (অনেক সময় অর্ধেক দামে) ওই দাদনদাতার কাছেই বিক্রি করতে হবে। ফলে চাষি স্বাধীনভাবে পণ্য বিক্রির অধিকার শুরুতেই হারিয়ে ফেলেন।
লবণের মাঠ থেকে সাধারণ ভোক্তার পাত বা মিল গেট পর্যন্ত পৌঁছাতে দামের যে তারতম্য হয়, তা সিন্ডিকেটের মুনাফার পাহাড়কে স্পষ্ট করে। ভরা মৌসুমে বা চাষির জরুরি প্রয়োজনে ফড়িয়ারা মাঠ থেকে অপরিশোধিত লবণ প্রতি মণ মাত্র ১৮০ থেকে ২২০ টাকা দরে কিনে নেয়। অথচ এই লবণ উৎপাদনে চাষির প্রতি মণে খরচই হয়ে যায় প্রায় ২০০ থেকে ২১০ টাকা। অর্থাৎ চাষি লাভহীন বা লোকসানে লবণ ছাড়তে বাধ্য হন।
ফড়িয়ারা এই লবণ কিনে মাঠের কাছাকাছি নিজস্ব অস্থায়ী শেড বা গুদামে স্তূপ করে রাখে। মে-জুন মাসে যখন বর্ষা শুরু হয় এবং মাঠের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তখন তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। অফ-সিজনে (বর্ষাকালে) এই সিন্ডিকেট একই লবণ প্রতি মণ ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা বা তারও বেশি দরে বড় বড় মিল মালিকদের কাছে বিক্রি করে। মাঠ থেকে মিল পর্যন্ত লবণ পৌঁছাতে সাধারণত তিন থেকে চারটি স্তর পার হতে হয়। প্রকৃত উৎপাদক যেখানে নিঃস্ব হচ্ছে, সেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা হচ্ছে আঙুল ফুলে কলাগাছ।
পাশাপাশি রয়েছে জমির তীব্র সংকট। কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ, সোনাদিয়া বা মাতারবাড়ীর মতো মেগা প্রকল্প এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে লবণ চাষের উপযোগী জমির পরিমাণ প্রতি বছর আশঙ্কাজনক হারে কমছে। তার ওপর রয়েছে লিজ বা ইজারার অসময়। মে মাসের শেষের দিকে অনেক জমিতেই চিংড়ি চাষের ইজারা শুরু হয়ে যায়, ফলে লবণ চাষ শেষ হওয়ার আগেই চাষিদের মাঠ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়।
এসব সংকটের মাঝে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি আজ সচেতন মহলকে তাড়িত করছে, তা হলো—দেশে যখন লাখ লাখ টন লবণ মজুত থাকে, কিংবা মাঠের চাষি যখন দাম না পেয়ে হাহাকার করে, তখন কেন বিদেশ থেকে অপরিশোধিত লবণ আমদানি করা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বাণিজ্যনীতি ও কিছু অসাধু ব্যবসায়িক চাতুরীর মধ্যে। প্রথমত, ভোজ্য লবণ এবং শিল্পে ব্যবহৃত লবণের মধ্যে গুণগত মানের একটি বড় ফারাক রয়েছে। টেক্সটাইল ডাইং, কস্টিক সোডা প্ল্যান্ট, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ওষুধশিল্পের জন্য ৯৯ শতাংশের বেশি বিশুদ্ধ ও আর্দ্রতাহীন উচ্চ গ্রেডের লবণের প্রয়োজন হয়। দেশীয় সনাতন ও পলিথিন পদ্ধতিতে উৎপাদিত লবণে আর্দ্রতা ও খনিজ ময়লা থাকায় তা সরাসরি এই শিল্পগুলোতে ব্যবহার করা যায় না। আর দেশে আধুনিক ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেশন প্রযুক্তিসম্পন্ন রিফাইনারির অভাব থাকায় এই বিশেষায়িত লবণ আমদানি করতেই হয়, যার পরিমাণ বছরে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ মেট্রিক টন।
কিন্তু সংকটের মূল জায়গাটি অন্যখানে। কিছু অসাধু আমদানিকারক টেক্সটাইল শিল্পের কাঁচামাল ‘সোডিয়াম সালফেট’ বা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট’ আমদানির লাইসেন্স নিয়ে, কম শুল্কের সুযোগ ব্যবহার করে সাধারণ ভোজ্য অপরিশোধিত লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) দেশে নিয়ে আসে। এই শুল্ক ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে আসা বিদেশি লবণ যখন দেশের বাজারে ঢোকে, তখন তা দেশীয় চাষিদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দেয়। আবার অনেক সময় বড় বড় মিল মালিকরা কৃত্রিম সংকটের ধুয়া তুলে সরকারের ওপর আমদানির চাপ সৃষ্টি করে, যাতে দেশীয় চাষিদের কাছ থেকে কম দামে লবণ কেনা যায়। বিসিক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং মিল মালিকদের তথ্যের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এই কুৎসিত খেলাটিকে আরো সহজ করে তোলে।
তাহলে এই বৃত্ত থেকে উত্তরণের পথ কী? বাংলাদেশের লবণশিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকে সুদূরপ্রসারী এবং সমন্বিত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, মাঠপর্যায়ের চাষিদের বাঁচাতে সরকারের পক্ষ থেকে লবণের ‘সর্বনিম্ন সমর্থন মূল্য’ বা ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দিতে হবে। ধান বা চালের মতো বিসিক বা সরকারি কোনো সংস্থার মাধ্যমে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে লবণ কিনে একটি রাষ্ট্রীয় ‘বাফার স্টক’ বা আপৎকালীন মজুত গড়ে তুলতে হবে। এতে বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমবে এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। চাষিদের জন্য সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে বিশেষ লবণ ঋণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয়ত, আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর শুল্ক প্রাচীর এবং নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার করে বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণের নামে যেন কোনোভাবেই সাধারণ ভোজ্য লবণ দেশে না ঢুকতে পারে, তার জন্য কাস্টমস এবং বন্দরগুলোয় কঠোর ল্যাবরেটরি টেস্টের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন একান্ত দরকার। কেবল সনাতন পলিথিন প্রযুক্তিতে আটকে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ লবণ গবেষণা ইনস্টিটিউটকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে কীভাবে কম সময়ে এবং কম রোদে বেশি স্ফটিকীকরণ (Crystallization) করা যায়, সেই ধরনের জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে একটি সুনির্দিষ্ট লবণ শিল্প পার্ক বা জোন প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেশন প্রযুক্তির মিল স্থাপনে উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে, যাতে দেশেই উচ্চমানের শিল্প লবণ উৎপাদন সম্ভব হয়। এতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
লবণ কোনো বিলাসী পণ্য নয়, এটি একটি কৌশলগত এবং অতি জরুরি জাতীয় সম্পদ। ভোজ্য লবণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের যে গৌরব বাংলাদেশের আছে, তাকে টেকসই করতে হলে চাষিদের পিঠের ওপর থেকে অবিচারের বোঝা নামাতে হবে। আবহাওয়ার পরিবর্তনকে হয়তো শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, কিন্তু সিন্ডিকেটের কালো হাতকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সরকার, বিসিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা যদি এখনই লবণশিল্পকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সংবেদনশীল ভারী শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি না করে, তবে উপকূলের এই লবণশিল্প একদিন স্রেফ কান্নায় পরিণত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার
drkhalid09@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




