স্পেনের হাতে বিশ্বকাপ, আনন্দের ঢেউ ফিলিস্তিনে

স্পেনের হাতে বিশ্বকাপ, আনন্দের ঢেউ ফিলিস্তিনে
বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরেছে স্প্যানিশ ফুটবল টিম। বিমানবন্দরে ক্যামেরাবন্দি হাস্যোজ্জ্বল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। এএফপি

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ের ১০৫ মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, সেভিয়া কিংবা ভ্যালেন্সিয়ার রাস্তায় উৎসব হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিজয়োৎসবটি দেখা গেল হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজায়।

যেখানে প্রতিদিন মানুষের ঘুম ভাঙে বোমার শব্দে, যেখানে বিদ্যুৎবিলাসিতা, খাবারের অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় যুদ্ধ— সেই গাজার মানুষও স্পেনের বিশ্বজয় উদযাপন করেছে। কেউ ছোট্ট মোবাইলের পর্দায়, কেউ জেনারেটরের সীমিত বিদ্যুতে টেলিভিশন চালিয়ে, কেউবা স্থানীয় আয়োজনে একসঙ্গে খেলা দেখে বিজয়ের মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের আনন্দ ছিল না। এটি ছিল কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। ছিল রাজনৈতিক বার্তা। ছিল মানবিক সংহতির প্রতিদান। এ কারণেই স্পেনের বিশ্বকাপ জয়কে গাজার মানুষ নিজেদের বিজয়ের মতো দেখেছে। সেই আনন্দের ঢেউয়ে ভেসেছে।

বিশ্বরাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় স্পেন কেবল একটি ইউরোপীয় ফুটবল শক্তি নয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম সারির ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বারবার গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক চাপ, কূটনৈতিক বিরোধ ও সমালোচনা সত্ত্বেও মাদ্রিদ সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের কাছে এই অবস্থান শুধু কূটনীতি নয়; এটি ছিল সংকটের সময় পাশে দাঁড়ানোর প্রতীক।

ফুটবলের ভাষায় স্পেন একটি দল। কিন্তু গাজার মানুষের কাছে স্পেন হয়ে উঠেছে একটি অবস্থানের নাম। এ কারণেই ফাইনালের আগে থেকে গাজার বহু মানুষ প্রকাশ্যে স্পেনকে সমর্থন জানিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ আল-বোজম বলছিলেন, আমরা চাই স্পেন জিতুক, কারণ তারা আমাদের কথা বলেছে।

গাজার অ্যাম্পিউটি ফুটবল দলের কোচ হাতেম আল-মাগরিবিও একই কথা বলেছেন অন্য ভাষায়— যারা কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ায়, তাদের সাফল্যে আনন্দ করা কৃতজ্ঞতারই অংশ।

সেই আবেগের সঙ্গে মিশে ছিল আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতা।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিজেকে বিশ্বের অন্যতম দৃঢ় জায়নবাদী নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং বহুবার ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের কথা বলেছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও আর্জেন্টিনার প্রতি নিজের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। ফলে গাজার মানুষের কাছে ফাইনালটি শুধু স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ছিল না; এটি ছিল দুই ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীকী সংঘর্ষও।

অবশ্য গাজার মানুষের এই সমর্থনের অর্থ কখনোই আর্জেন্টিনার প্রতি বিদ্বেষ নয়। বরং তারা স্পষ্ট করেই বলেছে, আর্জেন্টিনা বিশ্বফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দল আর এই দলের সুপারস্টার লিওনেল মেসি কিংবদন্তি। কিন্তু সংকটের সময় যে দেশ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, সমর্থনটা তার প্রতিই।

ফুটবল খুব কমই এমন রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল ঠিক সেটিই হয়ে উঠেছিল।

শুধু সরকার নয়, স্পেনের ক্রীড়াঙ্গনের তারকারাও গাজার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল লা লিগা জয়ের শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনের পতাকা প্রদর্শন করেন। কিংবদন্তি কোচ পেপ গার্দিওলাও গাজার মানবিক সংকট নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এসব দৃশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। সমর্থন ও ভালোবাসা বাড়িয়েছে।

ফাইনালে মাঠের লড়াইয়েও স্পেন ছিল স্পষ্টতই শ্রেষ্ঠ দল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোল না এলেও বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের গতি ও পজিশনাল ফুটবলে স্পেন পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখেছিল। লিওনেল মেসিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন রদ্রি, পাউ কুবারসি ও লোপের্তে। তাই বল পেলেও তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি। ষষ্ঠ বিশ্বকাপের শেষ স্বপ্নের রাতে মেসি একাদশে ছিলেন, কিন্তু মাঠের খেলায় ছিলেন কই?

অন্যদিকে স্কালোনির দল পুরো ম্যাচজুড়ে কমপ্যাক্ট লো-ব্লকে দাঁড়িয়ে স্পেনকে মাঝমাঠ দিয়ে ঢুকতে দেয়নি। ফলে লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসকে বারবার উইং ব্যবহার করতে হয়েছে। আক্রমণের সংখ্যা বাড়লেও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল কম। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের ১০৫ মিনিটে সেই অচলাবস্থা ভাঙেন ফেরান তোরেস।

পেদ্রো পোরোর ক্রস, নিকো উইলিয়ামসের হেডে নামানো বল আর এক স্পর্শে তোরেসের দুর্দান্ত সমাপ্তি— ইতিহাস কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি হাসে সেই মানুষটির দিকেই, যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি উপহাস করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ফিনিশিং নিয়ে সমালোচিত তোরেসই হয়ে গেলেন বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক।

এর আগে নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল আক্রমণ বিল্ডআপের সময় ফাউলের জন্য বাতিল হয়। অফসাইডের কারণে ফেরান তোরেসের একটি গোলও শেষের দিকে বাতিল করেন রেফারি।

ম্যাচের শেষদিকে এনজো ফের্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড অর্থাৎ লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে দশজনের আর্জেন্টিনার সামনে আর প্রত্যাবর্তনের শক্তি ছিল না। পুরো ফাইনাল দেখে মনে হয়েছে এই ম্যাচ জয়ের জন্য মাঠে নেমেছিল একটা দলই, দলটা স্পেন। হ্যাঁ, আর্জেন্টিনাও ছিল ম্যাচে, তবে কেবলই দৌড়াদৌড়িতে! সত্যিকার অর্থেই সেরা দল হয়ে স্পেন বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে আনন্দে ভাসল। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটা গোল হজমÑ এই তথ্যই জানান দিচ্ছে স্পেনের রক্ষণভাগ কেমন মজুবত। সেই শক্তি, নিজস্ব সিস্টেম, ছক, পাসিং, প্রেসিং ও কাউন্টার প্রেসিং-এর জয়গান গেয়ে বিশ্বকাপ জিতে বাড়ি ফিরেছে স্পেন।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেন যখন বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে আনন্দে আত্মহারা, তখন গাজার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র, শরণার্থী শিবির ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কষ্টে থাকা ফিলিস্তিনিরাও সেই উল্লাসের সঙ্গী। ফুটবল শুধু কয়েক ঘণ্টার বিনোদন নয়; বেঁচে থাকার মানসিক শক্তিও বটে।

এ দৃশ্যই হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে শক্তিশালী ছবি। সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা। একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের ট্রফি, অন্যদিকে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে মানুষের হাসি।

বাংলাদেশের জন্যও এই গল্প অপরিচিত নয়। স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে স্পষ্ট। ফলে স্পেনের জয়ে গাজার মানুষের এই আবেগ বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছেও সহজেই অনুরণিত হয়েছে।

ফাইনালের ফল জানাচ্ছে— স্পেন ১, আর্জেন্টিনা ০।

কিন্তু ইতিহাস হয়তো এই ফাইনালকে অন্যভাবেও মনে রাখবে। এমন একটি রাত হিসেবে, যখন একটি দেশের বিশ্বজয় আরেকটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির কাছে হয়ে উঠেছিল আশা, কৃতজ্ঞতা ও মানবিক সংহতির প্রতীক।

স্পেন বিশ্বকাপ জিতেছে নিউ জার্সিতে। কিন্তু সেই জয়ের সবচেয়ে গভীর প্রতিধ্বনি শোনা গেছে গাজার আকাশে। সেখানে ট্রফি ছিল না, আতশবাজিও ছিল না। ছিল শুধু বিশ্বাস— পৃথিবীতে এখনো এমন কিছু দেশ আছে, যারা শক্তি নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখায়। আর সে কারণেই, এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগঘন বিজয়োৎসব হয়তো মাদ্রিদে নয়, হয়েছিল গাজায়, যুদ্ধপীড়িত মানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাতের পাঞ্জায়!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন